×

প্রথম পাতা

পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হলো কী বেলুচিস্তান- উত্তাপ বাড়ল কেন?

Icon

মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হলো কী বেলুচিস্তান- উত্তাপ বাড়ল কেন?

পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তান আবারো বড় ধরনের সহিংসতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। প্রাকৃতিক সম্পদের মালিকানা, রাজনৈতিক বৈষম্য ও স্বাধীনতার দাবির জেরে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) মতো সশস্ত্র দলগুলো সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর বড় ধরনের হামলা চালিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর ওপর একের পর এক হামলা, নিরাপত্তা সদস্যদের অপহরণ ও হত্যা এবং পাল্টা সামরিক অভিযানে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে সেনা অভিযান চালাচ্ছে পাকিস্তান। এই অভিযানে অন্তত ৭৫ জন বিচ্ছিন্নতাকামী নিহত হয়েছেন।

এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে স¤প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তানের’ একটি বিবৃতি ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দাবি করা হয়- বেলুচিস্তান নিজেদের স্বাধীন বলে ঘোষণা করেছে এবং নিজেদের জাতীয় সংগীত ‘মা চুকাইন বেলুচানি’ ও জাতীয় পতাকা গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে তারা ‘বেলুচি ফালুস’ নামে নিজস্ব মুদ্রা চালু করেছে এবং বেলুচিস্তানের ৮৫ শতাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের হাতে। নতুন প্রশাসন ওই অঞ্চলের খনিজ সম্পদ, গ্যাসক্ষেত্র এবং কয়লাখনিগুলোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে।’

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘এই অগ্রগতি বেলুচিস্তানকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির যোগ্য করে তুলেছে। আমরা এখন এই প্রজাতন্ত্রের সোনা ও তামার খনি, ১৫০টিরও বেশি সক্রিয় গ্যাসক্ষেত্র এবং ১ হাজার ২০০টিরও বেশি সচল কয়লাখনি নিয়ন্ত্রণ করছি। পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্য পদত্যাগ করে বেলুচ পক্ষে যোগ দিয়েছেন। আজ আমরা আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর মাধ্যমে বেলুচিস্তান রাষ্ট্র পরিচালনা করছি। আমাদের হয়তো যুদ্ধবিমান, অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র বা ভারী কামান নেই, কিন্তু আমরা আমাদের ভূমি নিয়ন্ত্রণ করি। বেলুচিস্তানের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসন নিয়ে গঠিত ৫ লাখ সদস্যের একটি বাহিনী পাকিস্তানের দখলদার বাহিনীকে হটিয়ে দিতে প্রস্তুত।’

এমন একটি বিবৃতি ভাইরাল হওয়ার পরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে- সত্যি কি স্বাধীন হয়েছে বেলুচিস্তান? ফের অঞ্চল হারিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে কি পাকিস্তান? ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বিশেষ করে নিউজ১৮ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’ নামে একটি সংগঠনের প্রকাশিত বিবৃতিতে বেলুচিস্তানের জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত, নতুন মুদ্রা ও স্বাধীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানানো হয়েছে। যদিও এর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিকভাবে বা কোনো রাষ্ট্র এটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। এটি মূলত বালুচ অ্যাক্টিভিস্ট ও স্বাধীনতা স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবির একটি নতুন বহিঃপ্রকাশ, যা পাকিস্তানের ভেতরে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে বেলুচিস্তান যে উত্তপ্ত, সেখানে স্বাধীন হওয়ার জন্য বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আন্দোলন তীব্র হচ্ছে, এ কথা সত্য।

এমন আবহে বেলুচিস্তানের জন্ম কীভাবে? কেনই বা সেখানে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলছে? এ প্রশ্নগুলো সামনে আসছে। সময়টা ১১শ’ থেকে ১৬শ’ শতাব্দী। এই সময়ের মধ্যে বেলুচ এবং ব্রাহুই উপজাতিরা বর্তমান ইরান ও আশপাশের অঞ্চল থেকে পূর্ব দিকে স্থানান্তরিত হয়ে রুক্ষ ও পাহাড়ি অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। তাদের নামানুসারেই অঞ্চলটির নাম ‘বেলুচিস্তান’ বা বেলুচদের ভূমি।

১৭শ শতাব্দীতে (১৬৬৬ সালে) মীর আহমদ খান কুম্বারানি বর্তমান পাকিস্তানের কেন্দ্রস্থলে ‘কালাত খানাত’ নামে একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই পরবর্তীতে বেলুচিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ১৯শ শতাব্দীতে ব্রিটিশরা এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। ১৮৩৯ সালে চুক্তির মাধ্যমে কালাত খানাত তাদের স্বায়ত্তশাসন হারায়। ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ কর্মকর্তা স্যার মর্টিমার ডুরান্ড এবং আফগানিস্তানের আমিরের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে ‘ডুরান্ড লাইন’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আধুনিক আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার সীমানা নির্ধারণ করে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর, কালাত রাজ্য প্রথমে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কিন্তু পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে কালাতের খান মীর আহমদ ইয়ার খান পাকিস্তানের সঙ্গে সংযুক্তির চুক্তি করেন। বর্তমানে বেলুচিস্তান অঞ্চলটি বিভক্ত। এর সিংহভাগ (বৃহৎ বেলুচিস্তান প্রদেশ) পাকিস্তানে রয়েছে, বাকি অংশ ইরানের সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশ এবং আফগানিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত।

তবে আয়তনের দিক দিয়ে পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ প্রদেশ বেলুচিস্তান, জনসংখ্যা ১ কোটি ৫০ লাখ। সেখানে পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা ২৪ কোটি (২০২৩ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী)। বেলুচিস্তান প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ। সেখানে তেল, কয়লা, সোনা, তামা ও গ্যাসের খনি রয়েছে। এর পরেও এখানকার মানুষ চরম দরিদ্র।

এদিকে পাকিস্তান সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি বড় উৎস বেলুচিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ। অথচ বেলুচিস্তানের বাসিন্দাদের কঠোর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দিন যাপন করতে হয়। পাকিস্তানের একমাত্র গভীর সমুদ্রবন্দরও বেলুচিস্তানে, গোয়াদার সমুদ্রবন্দর। ছয় হাজার কোটি মার্কিন ডলারের চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর (সিপিইসি) প্রকল্প মূলত এই সমুদ্রবন্দর ঘিরেই গড়ে উঠেছে। স্থানীয় বেলুচদের দাবি, তারা এই উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত এবং এর ফলে তারা নিজভূমিতেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়ছেন। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য থেকেই মূলত পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হতে চায় বেলুচিস্তানের বাসিন্দারা।

মূলত বেলুচরা আগে থেকেই গোঁয়াড় জাতি হিসেবে পরিচিত। ব্রিটিশরা পর্যন্ত তাদের কাছে নাকানি-চুবানি খেয়েছে। ‘পাঞ্জাবিদের শাসন করো, সিন্ধিদের ভয় দেখাও, পশতুদের টাকা দিয়ে কিনে নাও, আর বেলুচদের সম্মান করো’ নীতিতে এই ভারতবর্ষ শাসন করেছে ব্রিটিশরা।

ভাইরাল হওয়া বার্তার বিষয়ে বেলুচ গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, এই ঘটনা আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের কাছে একটি বার্তা যে বেলুচিস্তান এখন থেকে একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তারা প্রতিবেশী দেশগুলোকে আশ্বস্ত করে বলেছে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী বা বিমানবাহিনীকে বেলুচিস্তানের ভূমি, আকাশসীমা বা উপকূলরেখা ব্যবহার করে এ অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করতে দেয়া হবে না। পাশাপাশি তারা আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের প্রতি বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের দাবি, এই স্বীকৃতি এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে।

পাকিস্তান বলছে, বেলুচিস্তানের বাসিন্দাদের মধ্যে (সরকার দ্বারা) প্রতারিত হওয়ার অনুভূতি গড়ে উঠেছে এবং তাদের সমর্থন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভারত উসকানি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করে আসছে পাকিস্তান। এতে একমত চীন ও যুক্তরাষ্ট্রও। প্রকাশ্যে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, বেলুচিস্তানে অশান্তি সৃষ্টি করছে ভারত।

পাকিস্তান সরকারের দাবি, এই বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো আফগানিস্তান ও ইরানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে অস্ত্র, অর্থ ও অন্যান্য রসদ পেয়ে থাকে। তবে ভারত বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। বিএলএ-কে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং পাকিস্তান নিজে একটি ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

‘দ্য বেলুচিস্তান কননড্রাম’ নামে একটি গবেষণাধর্মী বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ‘বেলুচিস্তানে এই অস্থিরতার সূচনা ১৯৪৮ সাল থেকেই শুরু। কারণ বেশির ভাগ বেলুচ মনে করেছিলেন, যেভাবে জোর করে তাদের পাকিস্তানের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছিল তা বেআইনি ছিল।’

এই বইতে আরো বলা হয়, ‘দেশভাগের সময় ব্রিটিশরা কিন্তু বেলুচিস্তানকে স্বাধীনতা প্রান্ত হিসেবেই ঘোষণা করেছিল। পাকিস্তানও তা প্রথমে মেনে নিয়েছিল, কিন্তু সাতচল্লিশের অক্টোবরে মহম্মদ আলি জিন্নাহ বেলুচিস্তানকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করতে উঠেপড়ে লাগেন। তখন বেলুচ শাসক খান মীর আহমদ ইয়ার খানের ওপর নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করা শুরু হয়। তারপরও কিন্তু বেলুচিস্তানের নিজস্ব পার্লামেন্টের দুটি সভাই পাকিস্তানের সঙ্গে সংযুক্তির প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। এরপর পাকিস্তানের সেনাবাহিনী পাঠিয়ে আহমদ ইয়ার খানকে বেলুচিস্তান থেকে অপহরণ করে করাচী নিয়ে আসা হয়, সেখানে তাকে দিয়ে জোর করে অ্যাকসেসন বা সংযুক্তিকরণের দলিলে সই করানো হয়।’

তবে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সব মাপকাঠিতেই বেলুচিস্তান আজও পাকিস্তানের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা প্রদেশই রয়ে গিয়েছে। তাই বেলুচিস্তানে এবারের সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরে বিএলএ ও অন্য বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো হামলার পরিধি বাড়িয়েছে। তারা সামরিক ঘাঁটি, পুলিশ স্টেশন, মহাসড়ক, রেলপথ, সরকারি স্থাপনা এবং চীনা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্পকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। পাকিস্তান যতোই শক্তি প্রয়োগ করুক না কেন, ইসলামাবাদ থেকে স্বাধীন হওয়া এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন বেলুচিস্তানের বাসিন্দারা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

বিমার টাকা হাতাতে স্বামীকে বিষধর সাপ দিয়ে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্য

বিমার টাকা হাতাতে স্বামীকে বিষধর সাপ দিয়ে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্য

সিরিজ জিততে ১৪৪ রানের লক্ষ‍্য পেল বাংলাদেশ

সিরিজ জিততে ১৪৪ রানের লক্ষ‍্য পেল বাংলাদেশ

জুলাইয়ের বীরদের ভিলেন বানানোর চেষ্টা চলছে

সাদিক কায়েম জুলাইয়ের বীরদের ভিলেন বানানোর চেষ্টা চলছে

জমিতে পড়ে ছিল বিদ্যুতের ছেঁড়া তার, প্রাণ গেল দুই শ্রমিকের

জমিতে পড়ে ছিল বিদ্যুতের ছেঁড়া তার, প্রাণ গেল দুই শ্রমিকের

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App