হাজার কোটি টাকা জলে, জলাবদ্ধতার নিরসন নেই
হরলাল রায় সাগর
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
টানা এক ঘণ্টা ভারী বৃষ্টি হলেই ডুবে যায় ঢাকা মহানগরীর প্রধান সড়কসহ অনেক এলাকা। টানা কিছুক্ষণ ভারী বৃষ্টি হলে ঢাকার কোনো না কোনো এলাকা ডুববেই- এটি যেন নিয়ম হয়ে গেছে। গত ১২ ও ১৩ জুলাই টানা দুই দিনের ভারী বর্ষণের ফলে সড়কে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে। সমুদ্রের মতো ভাসছিল রাজধানী ঢাকা শহর। সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় অচল হয়ে পড়েছিল নগরী। অনেক এলাকার সড়কে বিকল হয়ে পড়েছিল যানবাহন। যারা ঘর থেকে বেরিয়েছেন, তাদের সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। বহু মানুষের ঘরেও পানি ঢুকেছে। কোথাও পানিবন্দি হয়ে পড়েন অনেক বাসিন্দা। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে, বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে পরীক্ষা স্থগিত ও ক্লাস বাতিল করে ছুটি দিতে বাধ্য হয়। এবার দুর্যোগে স্মরণকালের বিড়ম্বনায় পড়েও পরীক্ষা দিয়েছে এইচসসি পরীক্ষার্থীরা। তবে ২০২৪ সালেও ভারী বৃষ্টিতে এমন দৃশ্যের শিকার হয়েছে নগরবাসী।
জলাবদ্ধতার অন্যতম বড় কারণ বৃষ্টির পানির স্বাভাবিক প্রবাহপথ হারিয়ে যাওয়া। অথচ জলাবদ্ধতা নিরসনে গত এক দশকে দুই হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। বলা হয়েছিল- ১৫ মিনিটেই পানি নেমে যাবে; জলাবদ্ধতা হবে না। কিন্তু পুরনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটছে নগরজুড়ে। অবশ্য আগের তুলনায় সমস্যার অনেকটা উন্নতি হয়েছে। আগে প্রায় পুরো ঢাকা ডুবে যেত, জলাবদ্ধ থাকত কয়েক দিন। এখন জলাবদ্ধ হলেও দ্রুত নেমে যাচ্ছে পানি। তবে বছরের পর বছর যায়, মন্ত্রী-মেয়র-সরকারের পরিবর্তন হয়, কিন্তু বৃষ্টির মৌসুমে ঢাকার জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি পুরোপুরি উন্নতি হয় না।
রাজধানী ঢাকার চারপাশে বয়ে চলছে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদী। এর মাঝখানে ভূমিতে জালের মতো বিছিয়ে ছিল আঁকাবাঁকা খাল, বিল, ঝিল। তাই বৃষ্টি হলে পানি খাল-ঝিল হয়ে বেরিয়ে গিয়ে পাশের নদীতে পড়ত। পানির সঙ্গে ময়লা-আবর্জনা ধুয়ে গিয়ে পরিষ্কার হয়ে যেত শহর। কিন্তু গত দুই যুগে রাজধানীর এসব নদী, খাল ও জলাভূমির অধিকাংশ দখল হয়ে গেছে। এসব খাল-নদী কিছু প্রভাবশালীর পেটে থাকায় অভিযান চালিয়েও উদ্ধার করতে পারছে না সরকার। আর এ কারণে এখন সামান্য বৃষ্টিতে ডুবে যাচ্ছে ঢাকার রাস্তাঘাট। কিছু কিছু এলাকায় দিনের পর দিন জমে থাকছে পানি।
জলাবদ্ধতার দুটি কারণ : সাম্প্রতিক এই বৃষ্টির পানি ঢাকার কিছু এলাকায় দ্রুত নেমেছে। আবার অনেক এলাকায় দীর্ঘ সময় আটকে ছিল। অর্থাৎ জলাবদ্ধতাই বড় সমস্যা। নগর-পরিকল্পনাবিদরা এই সমস্যার দুটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, পানি নেমে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট পথ নেই। দ্বিতীয়ত, খালগুলো অনেকাংশে বেদখল, ভরাট ও আবর্জনায় ভরা। যে ড্রেন বা নালা দিয়ে পানি নেমে যাবে, সেগুলোও বালু ও আবর্জনায় ভরে গেছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) দুই প্রশাসক বলেছেন, নগর ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতার অভাবে দীর্ঘদিন এ সমস্যার সমাধান হয়নি। করপোরেশনের সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণে দখলমুক্ত হয়নি নগরের খাল-জলাশয়। অথচ, অন্তত খাল-জলাশয় পুনরুদ্ধার ও সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুললে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব; সে লক্ষ্যে কাজ করছেন তারা।
রাজধানীর এক হোটেলে গত ৬ জুন ‘ঢাকা দক্ষিণের জলাবদ্ধতা : বাস্তবতা ও করণীয়’ শিরোনামে এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ডিএসসিসি আয়োজিত ওই সেমিনারে নগরীর জলাবদ্ধতা সমস্যার কারণ, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং সমাধানে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা জানায় ডিএসসিসি। কিন্তু সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেন-নালা ও ম্যানহলের মুখ পরিষ্কার ছাড়া সিটি করপোরেশনের তেমন কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি।
নগর পরিকল্পনাবিদেরা জানান, একসময় রাজধানীর অসংখ্য খাল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক নালা দিয়ে বৃষ্টির পানি দ্রুত নদীতে নেমে যেত। কিন্তু বছরের পর বছর দখল, ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং কার্যকর ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক গড়ে না ওঠায় সেই পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বৃষ্টির পানি কোন পথে নদী-খালে যাবে, সে পথটিই যেন হারিয়ে গেছে! ফলে অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানি আটকে থেকে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।
জলাবদ্ধতা নিরসনে খরচ : ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ এক দশকে নালা নির্মাণ ও সংস্কার, খাল পরিষ্কার এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের অন্যান্য কাজে অন্তত ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা খরচ করেছে ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশন। কিন্তু এর সুফল কতটা মিলেছে তা দুই দিনের বৃষ্টি দেখিয়ে দিয়েছে।
পয়ঃনিষ্কাশন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৪ ও ২০২৫ সালে কত টাকা খরচ হয়েছে, সে হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে দায়িত্ব পালন করা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ২০২৫ সালের এপ্রিলে বলেছিলেন, চিহ্নিত ১৯টি স্থানের মধ্যে ৭টিতে জলাবদ্ধতা হতে পারে এবং পানি তিন ঘণ্টার মধ্যে নেমে যাবে। একই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি ‘রাইট পারসন, রাইট টাইমে, রাইট জায়গায়’ থাকার কারণে বড় জলাবদ্ধতা হয়নি বলে দাবি করেন। অথচ জুলাই-আগস্টেও কয়েক দফায় ভারী বৃষ্টিতে ডুবে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছিল ঢাকা নগরীতে।
আওয়ামী লীগ আমলে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ডিএসসিসির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসও নগরবাসীকে শুনিয়েছিলেন, ঢাকায় অতিবৃষ্টি হলেও ১৫ মিনিটের মধ্যে পানি নেমে যাবে, আর জলাবদ্ধতা দেখা যাবে না।
জলজট ও জলাবদ্ধতা এক নয় : ঢাকায় জলাবদ্ধতার চিত্র দায়িত্বশীলদের এসব দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। নগর-পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঢাকায় এত বেশি বৃষ্টির কারণে জলজট হতে পারে। কিন্তু জলাবদ্ধতা হলে বুঝতে হবে, সেটা ব্যর্থতা।
সাধারণত অল্প সময় পানি জমে থাকাকে সাময়িক জলজট বলেন সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা। নগর-পরিকল্পনার সাধারণ ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে নালার তাৎক্ষণিক ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যে পানি জমে এবং বৃষ্টি কমার পর দ্রুত নেমে যায়, সেটিই জলজট। অন্যদিকে নালা, খাল, কালভার্ট বা আউটলেট বন্ধ, সরু কিংবা বিচ্ছিন্ন থাকায় পানি দীর্ঘ সময় আটকে থাকা এবং একই এলাকায় বারবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়াই জলাবদ্ধতা।
২৬ খাল পুনরুদ্ধারের উদ্যোগে প্রতিবন্ধকতা : ঢাকা জেলা প্রশাসনের হিসাবে ঢাকায় খালের সংখ্যা ৫৮টি। এরমধ্যে জলাবদ্ধতা নিরসনে ৮০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ২৬টি খালের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসাকে দেয় সরকার ১৯৮৮ সালে। তারপরও নগরের খালগুলো ক্রমেই বেদখল হয়ে যায়। আরো কয়েকটি খাল দেয়া হয় সিটি করপোরেশনকে। কিন্তু অনেক খাল ভরাট করে গড়ে ওঠে বহুতল ভবন। এছাড়া প্রায় ৩৮৫ কিলোমিটার বড় আকারের নালা ও চারটি পাম্প স্টেশন পরিচালনা করত ওয়াসা। পরিস্থিতির বেগতিক দেখে ২০২০ সালে খাল ও নালাগুলো সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে ওয়াসা। এছাড়া দুই সিটি করপোরেশন দেখভাল করে আরো প্রায় ২ হাজার ২১১ কিলোমিটার নালা।
খালের দায়িত্ব পেয়ে সিটি জরিপ অনুসারে দ্রুত খালের সীমানা চিহ্নিত করার ঘোষণা দেন তৎকালীন উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম। এছাড়া খালের দুই পাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, পুনঃখনন করে পানি ধারণের ক্ষমতা বৃদ্ধি, পাড় বাঁধাই করে সবুজায়ন, ওয়াকওয়ে (হাঁটার পথ) ও সাইকেল লেন তৈরি করার কথা বলেন তিনি। ওই দিন খাল নিয়ে আশার কথা শুনিয়েছিলেন ডিএসসিসির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসও। তিনি বলেন, ?ঢাকার জিরানী, মান্ডাসহ তিনটি খাল ও দুটি বক্স কালভার্ট (পান্থপথ ও সেগুনবাগিচা) পরিষ্কার করার কাজ শুরু করা হবে। আগামী তিন মাসে এ কাজ করা হবে। কালুনগর খাল আংশিক পরিষ্কার করা হয়েছে। এরপর ধোলাই খাল ও বুড়িগঙ্গা আদি চ্যানেল নিয়ে কাজ করা হবে। খালের দায়িত্ব পাওয়ার পরপর দুই মেয়র জোর দিয়ে কাজ শুরু করেন। তবে শুরুর দিকে পরিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল তাদের কাজ। পুরো সীমানাও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
ডিএনসিসির তালিকাভুক্ত খালগুলো হলো কাটাসুর, রামচন্দ্রপুর, কল্যাণপুর, রূপনগর, মিরপুর দিয়াবাড়ি, ইব্রাহিমপুর, বাউনিয়া, বাইশটেকী, সাংবাদিক কলোনি, আবদুল্লাহপুর, দ্বিগুণ, বেগুনবাড়ী, শাহজাদপুর, সুতিভোলা, কসাইবাড়ি, মহাখালী, ডুমনি, উত্তরা দিয়াবাড়ী, বোয়ালিয়া, গোবিন্দপুর ও নরাইল খাল। একইভাবে ডিএসসিসির তালিকাভুক্ত খালগুলো হলো জিরানী, বাসাবো, কদমতলা, খিলগাঁও বাগিচা, মান্ডা, কাজলাপাড়, শ্যামপুর, তিতাস, উত্তর কুতুবখালী, মৃধাবাড়ী, মাতুয়াইল, ডিএনডি এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক খাল। কিন্তু কাগজে খাল থাকলেও সেগুলোতে পানি প্রবাহ নেই। অধিকাংশ খালের জায়গা ভরাট করে বেদখল হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টি হলে পানি নামতে পারে না।
সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, বৃষ্টির পানি প্রথমে সড়ক থেকে নালায়, পরে কালভার্ট ও খাল হয়ে আউটলেট দিয়ে নদীতে যাওয়ার কথা। এই পথের কোনো একটি অংশ বন্ধ, সরু বা বিচ্ছিন্ন হলে পুরো ব্যবস্থার সক্ষমতা কমে যায়। এমন অবস্থায় কোথাও নালার মুখ বর্জ্য ও পলিতে বন্ধ, কোথাও কালভার্ট সরু, আবার কোথাও খালের সঙ্গে নালার সংযোগ বিচ্ছিন্ন। এসব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে পানি নদীতে যেতে পারে না। তখনই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে নাগরিক দুর্ভোগ বেড়ে যায়।
জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা : দুই সিটি করপোরেশন গত এপ্রিলে ঢাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকিপূর্ণ ১৪১টি স্থান চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে উত্তর সিটিতে ১০৮টি এবং দক্ষিণ সিটিতে ৩৩টি। ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগ সম্প্রতি নগরীর জলাবদ্ধতাপ্রবণ ২৯টি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ধানমন্ডি-২৭, গ্রিন রোড, নিউ মার্কেট, ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট, নায়েম রোড, ইস্কাটন গার্ডেন রোড, পলাশী এস এম হলের সামনে, সাকুরা মার্কেট এলাকা, মোকাররম ভবনের সামনে, পশ্চিম মালিবাগ, খিলগাঁও ফ্লাইওভার থেকে মালিবাগ কমিউনিটি সেন্টার, মানিকনগর টিটিপাড়া পাম্পের সামনে, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, কমলাপুর রেল স্টেশন, শাপলা চত্বর, নটর ডেম কলেজ এলাকা, পল্টন, দৈনিক বাংলা, ফকিরাপুল, চানমারির মোড়, শান্তিবাগ, আলমবাগ, পশ্চিম জুরাইন এবং সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল-সংলগ্ন সড়ক অন্যতম।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) এক গবেষণায় রাজধানীর জলাবদ্ধতাপ্রবণের ৯টি এলাকা উঠে আসে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, পল্লবী শিয়ালবাড়ি, রূপনগর ও ইস্টার্ন হাউজিং; কালশী ও মিরপুর ১১; টোলারবাগ, আহমেদনগর ও পাইকপাড়া; শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া ও কাফরুল; কলাবাগান, ধানমন্ডি ২৭, কাঁঠালবাগান, গ্রিনরোড ও হাতিরপুল; হাজারীবাগ, নবাবগঞ্জ, রায়েরবাজার, পশ্চিম ধানমন্ডি ও ঢাকা নিউ মার্কেট; রামপুরা ও বাড্ডা; সূত্রাপুর, ওয়ারী, নবাবপুর, কাজী আলাউদ্দিন রোড, সিদ্দিক বাজার, নারিন্দা ও তাঁতিবাজার এবং জুরাইন, সিদ্ধিরগঞ্জ, জাকের মঞ্জিল, শ্যামপুর, পূর্ব জুরাইন, সাদ্দাম মার্কেট ও রায়েরবাগ জলাবদ্ধতার হটস্পট। জলাবদ্ধতা নিরসনে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি রূপনগর মেইন খাল, বাউনিয়া খাল, বাইশতেকি খাল, সাংবাদিক কলোনি খাল, কল্যাণপুর খাল, ইব্রাহিমপুর খাল, পান্থপথ বক্স কালভার্ট খাল, রায়েরবাজার খাল, জিরানী খাল, রামপুরা খালের দক্ষিণ প্রান্ত, দোলাই খাল, কদমতলী খাল ও মান্দা খাল খননের সুপারিশ করেছিল। দখল হয়ে যাওয়া এই ১৫টি খাল খনন করলেই অবিরাম জলাবদ্ধতা সমস্যার প্রায় ৮০ শতাংশের সমাধান হতে পারে বলেও গবেষণা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল।
আরডিআরসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ বলেছিলেন, একসময় ঢাকা থেকে বৃষ্টির পানি সরতে পারে এমন ৭৭টি খাল ও লেক ছিল। এখন এগুলোর বেশিরভাগই আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে দখল করা হয়েছে। চিহ্নিত ১৫টি খাল খনন করতে পারলে নগরীর জলাবদ্ধতা সমস্যার ৮০ শতাংশ সমাধান হবে।
খাল দখলমুক্ত করতে ও মহাপরিকল্পনা নিতে হবে : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, বর্ষাকালে প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে পুরোপুরি জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। ঢাকার অধিকাংশ খাল-বিল ভরাট বা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশনের সুযোগ কমে গেছে। ফলে ভারী বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি সরাতে সময় লাগে।
তিনি বলেন, ঢাকা শহরে বৃষ্টির পানি নদীতে নামার পথ সীমিত। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই সেই পথ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। চলতি বছরে পুরো সুফল না-ও মিলতে পারে, তবে আগামী বছর পরিস্থিতির আরো উন্নতি হবে বলে আশা করছি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন বেদখল খালগুলো উদ্ধার না করা পর্যন্ত জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে না। খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে দখলমুক্তকরণ ও পুনঃখননের কাজ অব্যাহত থাকবে। নগরকে বাসযোগ্য রাখতে খাল পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, আগে ঢাকার ভেতর অসংখ্য জলাশয় ছিল। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে একে একে তা দখল, ভরাট হয়ে গেছে। এখন বৃষ্টির পানি যাওয়ার জায়গা নেই। আবার গত ২০ বছরের মধ্যে ১৬ বছর ঢাকার খালগুলোর ওয়াসার অধীনে ছিল; পরে চার বছর সিটি করপোরেশনের কাছে। তারা জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্লæ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারেনি। ওপর থেকে রহমতের বৃষ্টি পড়বে। এটা গড়িয়ে গড়িয়ে খাল হয়ে নদীতে যাবে; এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পানি বের হওয়ার পথ খুঁজে পায় না। তাই জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে ব্লু নেটওয়ার্ক তৈরির বিকল্প নেই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বৃষ্টির পানি গড়িয়ে নদী বা জলাশয়ে যাওয়ার প্রধান মাধ্যম হলো ক্যানেল বা ড্রেন। কিন্তু ঢাকার খালগুলো বহু আগেই দখল ও ময়লা-আবর্জনা ফেলে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে পানি নিষ্কাশন পুরোপুরি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ঢাকাকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করতে হলে, খাল ও জলাশয়গুলো দখলমুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, ঢাকায় প্রাকৃতিক জলপথ ও কৃত্রিম নালাকে যুক্ত করে সমন্বিত পানিনিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা নেই। বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প নেয়া হচ্ছে, কিন্তু পানি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পড়বে, সেই আউটলেট সচল করা হচ্ছে না। শুধু যেখানে পানি জমে, সেখানে নতুন নালা বানিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
