×

প্রথম পাতা

চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে এখনো সেই দুর্বোধ্য লেখা

Icon

সেবিকা দেবনাথ

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে এখনো সেই দুর্বোধ্য লেখা

সম্প্রতি চিকিৎসা সেবা নিতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছিলেন মৌসুমী। ৪০ বছর বয়সী এই নারী গিয়েছিলেন স্বনামধন্য একজন চিকিৎসকের কাছে। চিকিৎসক মৌসুমীকে অনেকটা সময় নিয়ে দেখেছেন। তার সব কথা শুনেছেন। এরপর ওষুধ ও কিছু পরীক্ষার কথা উল্লেখ করেছেন প্রেসক্রিপশনে। নির্ধারিত একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে এমআরআইসহ অন্য পরীক্ষাগুলো করানোর কথা বলে সেখানে ডিসকাউন্টের বিষয়টিও লিখে দিয়েছেন। মৌসুমী চিকিৎসকের চেম্বার থেকে বেরিয়ে মহল্লার পরিচিত দোকান থেকে ওষুধ কিনবেন বলে ঠিক করলেন। মহল্লার ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে গিয়ে ঘটল বিপত্তি। প্রেসক্রিপশনের লেখা দেখে কেউই বুঝতে পারছেন না ওষুধের নাম। কয়েকটা ফার্মেসি খোঁজার পর অবশেষে একটি ফার্মেসিতে গিয়ে সুখবর পেলেন মৌসুমী। ফার্মেসিতে থাকা একজন বিক্রেতা বেশ খানিকটা সময় নিয়ে কিছুক্ষণ মোবাইল ঘাঁটঘাঁটি করে বের করে দিলেন ওষুধগুলো।

পরের দিন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করানোর জন্য নির্ধারিত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গেলেন মৌসুমী। পরীক্ষার জন্য টিকিট কাটতে গিয়ে সেখানকার কাউন্টার থেকে একজন বললেন, দয়া করে আপনার নামটা বলবেন? প্রেসক্রিপশনে যদিও লেখা আছে কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না। মুচকি হেসে মৌসুমী নাম, বয়স বিস্তারিত বললেন। কাউন্টারের লোকটি বললেন, দৈনিকই স্যারের অনেক রোগী এখানে টেস্ট করাতে আসে। সব সময় একই সমস্যা হয়। স্যারের লেখা বোঝা খুব মুশকিল।

মৌসুমীর মতো এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। অধিকাংশ চিকিৎসকের হাতের লেখা অন্য স্বাভাবিক লেখার মতো নয়। চিকিৎসকেরা লেখার ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ শব্দ ব্যবহার করেন। তবে সেটা সাধারণ মানুষের জন্য বোঝা সহজ নয়। যারা দীর্ঘদিন ধরে ফার্মেসিতে কাজ করেন, ওষুধ বিক্রি করেন, তারা খুব সহজে এটি ধরে ফেলতে পারেন।

২০১৭ সালের জানুয়ারিতে প্রেসক্রিপশন স্পষ্ট ও বড় অক্ষরে অথবা ছাপানো আকারে লিখতে চিকিৎসকদের প্রতি নির্দেশনা দিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারির নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। স্বাস্থ্য সচিব এবং বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের রেজিস্ট্রারের প্রতি এই নির্দেশ দেয়া হয়। একইসঙ্গে রোগীদের জন্য স্পষ্টভাবে ব্যবস্থাপত্র লেখায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না ও ব্যবস্থাপত্রে ওষুধের জেনেরিক নাম লেখার নির্দেশ কেন দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে একটি রুল জারি করেন আদালত।

স্বাস্থ্য সচিব, বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সেক্রেটারিসহ বিবাদীদের ৪ সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এই আদেশ দেন। তবে পরিস্থিতির খুব যে উন্নতি হয়েছে তেমন নয়। তবে বর্তমানে হাতের লেখার ঝামেলা এড়াতে অনেক চিকিৎসকই কম্পিউটারে প্রেসক্রিপশন লেখেন। কেউ কেউ প্রেসক্রিপশন লিখতে সহকারীও রাখেন।

স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন জাতীয় কমিটির সভাপতি বাংলাদেশে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (সাবেক বিএসএমএমইউ) সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব ভোরের কাগজকে বলেন, প্রেসক্রিপশন অবশ্যই স্পষ্ট করে লিখতে হবে। কারণ, এটা রোগীর জীবন-মরণের প্রশ্ন। প্রেসক্রিপশন অবশ্যই স্পষ্ট হওয়া জরুরি। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকেই বলা আছে-চিকিৎসকদের হাতের লেখা স্পষ্ট হতে হবে। কারণ, অস্পষ্ট হাতের লেখার কারণে ভুল ওষুধ পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে কারো হাতের লেখা হুট করেই তো আর ভালো করা যায় না। এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা বড় অক্ষরে লিখলে বা কম্পিউটারাইজড করলে সমাধান আসতে পারে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মুনীরউদ্দিন আহমদ বলেন, চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রে জেনেরিক, স্পষ্ট ও বড় অক্ষরে ওষুধের নাম লিখতে ২০১৭ সালে সরকারকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছিলেন উচ্চ আদালত। সেটি কার্যকর হয়নি। অথচ জেনেরিক নাম না লেখার বিকল্প নেই। এটি করতে পারলে সঠিক ওষুধ লেখার ব্যাপারে স্বচ্ছতা বাড়বে, রোগীরাও সহজে বুঝতে পারবে। সরকারি ও বেসরকারি ফার্মেসিতে সঠিক ওষুধ বিতরণ নিশ্চিত করতে এ পদ্ধতি কার্যকর হবে বলে তিনি মনে করেন।

অন্তর্বর্তী সকারের সময় জাতীয় অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক একে আজাদ খানের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে গঠিত ১২ সদস্যের স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্কার কমিশন সদস্যরা একটি প্রতিবেদন জমা দেন। সেই প্রতিবেদনেও চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনে অন্তত ২০ শতাংশ ব্যয়বহুল ওষুধ জেনেরিক নাম লিখতে বাধ্য করার সুপারিশ করা হয়। একইসঙ্গে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সব ওষুধের প্রেসক্রিপশনে জেনেরিক ও ব্র্যান্ড উভয় নামই অন্তর্ভুক্ত করাও বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়। এটি করতে পারলে সঠিক ওষুধ লেখার ব্যাপারে স্বচ্ছতা বাড়বে, রোগীরাও সহজে বুঝতে পারবে। সরকারি ও বেসরকারি ফার্মেসিতে সঠিক ওষুধ বিতরণ নিশ্চিত করতে এ পদ্ধতি কার্যকর হবে বলে কমিশন মনে করে। ক্লিনিক্যাল অডিটের মাধ্যমে প্রেসক্রিপশনের কঠোর নজরদারি চালু করার সুপারিশও করা হয় প্রতিবেদনে।

এদিকে সারাদেশে চিকিৎসকদের অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও টেস্ট লেখা বন্ধে ‘জাতীয় ই-প্রেসক্রিপশন’ চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে রোগীদের ভোগান্তি কমানোর পাশাপাশি তাদের সুরক্ষা ও প্রেসক্রিপশন নজরদারি করবে স্বাস্থ্য বিভাগ। এরমধ্যে বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করছে সরকার।

জানা গেছে, এই ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে রোগী যেকোনো সময় নিজের ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন দেখতে বা ডাউনলোড করতে পারেন। চিকিৎসকদের দেয়া প্রেসক্রিপশন সহজেই বিশ্লেষণ করা যাবে। এতে চিকিৎসকদের অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও টেস্ট লেখা বন্ধ হবে। ভুল কোনো সিদ্ধান্ত রোগীকে চিকিৎসক দিয়েছে কিনা ধরার ক্ষেত্রে এটি একটি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে। এতে রোগীদের হয়রানি কমে আসবে। এ প্রক্রিয়া চালু হলে স্বাস্থ্য বিভাগে নজরদারি করার জন্য থাকবে আলাদা বিশেষজ্ঞ দল। তারা যেকোনো সময় চাইলে দেশের যেকোনো চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ইন্টারনেট থেকে নিয়ে যাচাই-বাছাই করতে পারবেন। কোনো রোগীর অভিযোগ থাকলে তা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে দেখতে পারবেন।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. আকরাম হোসেন বলেন, চিকিৎসকদের অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা কমাতে ই-প্রেসক্রিপশন চালুর উদ্যোগ অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। এটি স্বাস্থ্যসেবায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং রোগীর নিরাপত্তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন চালু করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; এর সঙ্গে জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা, ক্লিনিক্যাল অডিট, শক্তিশালী রেফারেল ব্যবস্থা এবং চিকিৎসকদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল ভোরের কাগজকে বলেন, এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে খুবই ভালো হবে। স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে দীর্ঘ দিনের অসন্তোষ অনেকটা কমে আসবে। প্রেসক্রিপশনে দুর্বোধ্য লেখা থেকে রোগীরা মুক্তি পাবে। সরকার যেকোনো সময় নজরদারি করতে পারবে। কে, কোথায় লিখতেছে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ, তখন সরকার চাইলে নোটিস পাঠাতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের নিজ থেকে আগ্রহী হতে হবে যে, আমরা অতিরিক্ত ওষুধ লিখব না। ই-প্রেসক্রিপশন চালু হলে ওষুধ-টেস্ট লেখায় চিকিৎসকরা সচেতন হয়ে যাবেন। কেননা, কর্তৃপক্ষ চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ করবে।

ই-প্রেসক্রিপশন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও এক্ষেত্রে অনেক বাজেট এবং প্রয়োজনীয় অনেক বিষয় জড়িত, সেগুলো পূরণ না হলে উদ্যোগ কাজে আসবে না বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আব্দুল হামিদ। তার মতে, এর জন্য প্রয়োজন হবে ইকো-সিস্টেম, শক্তিশালী ইন্টারনেট সেবা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা থাকতে হবে। চিকিৎসক ও অন্যান্য সেসব জনবল ঘাটতি রয়েছে সেগুলো পূরণ করতে হবে। সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এই পদ্ধতি চালু করতে হবে। তাহলে জনগণ সুফল পাবে। সরকার অনেক কিছু করতে চায়, উদ্যোগও ভালো; তবে বিষয়টা বুঝে করতে হবে।

তিনি বলেন, ই-প্রেসক্রিপশন চালু হলে ইলেট্রনিক একটা প্রেসক্রিপশন থাকবে চিকিৎসকরা লিখে রোগীকে প্রিন্ট করে দেবে। এতে রোগীরা প্রিন্ট করা প্রেসক্রিপশন পাবে এবং ডাটাবেজ সংরক্ষিত থাকবে। এই পদ্ধতি চালু করতে হলে হাসপাতালগুলোকে অটোমেশন করতে হবে। হাসপাতালগুলোতে কম্পিউটার, সার্ভার এবং মেইনটেন্যান্স থেকে শুরু করে প্রচুর বাজেট প্রয়োজন হবে। সরকারি হাসপাতালে সব টেস্ট করার সুযোগ দেয়া হলে আর এমনিতেই চিকিৎসকরা অতিরিক্ত টেস্ট লিখবে না। ওষুধের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

বিমার টাকা হাতাতে স্বামীকে বিষধর সাপ দিয়ে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্য

বিমার টাকা হাতাতে স্বামীকে বিষধর সাপ দিয়ে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্য

সিরিজ জিততে ১৪৪ রানের লক্ষ‍্য পেল বাংলাদেশ

সিরিজ জিততে ১৪৪ রানের লক্ষ‍্য পেল বাংলাদেশ

জুলাইয়ের বীরদের ভিলেন বানানোর চেষ্টা চলছে

সাদিক কায়েম জুলাইয়ের বীরদের ভিলেন বানানোর চেষ্টা চলছে

জমিতে পড়ে ছিল বিদ্যুতের ছেঁড়া তার, প্রাণ গেল দুই শ্রমিকের

জমিতে পড়ে ছিল বিদ্যুতের ছেঁড়া তার, প্রাণ গেল দুই শ্রমিকের

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App