থার্ড টার্মিনালে যুক্ত হচ্ছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
ছয় মাস ঝুলে থাকার পর অবশেষে জট খুললো ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের। প্রকল্পে সংশোধনী এনে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালসহ গুরুত্বপূর্ণ তিনটি নতুন অঙ্গ যুক্ত হচ্ছে। বাইপাইল ইন্টারসেকশন ও নির্মাণাধীন পাতাল মেট্রোরেলের (এমআরটি লাইন-১) সঙ্গে সরাসরি সংযোগ ঘটবে। নতুন সংযোজনগুলোর ফলে চীনের অর্থায়নে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের কাজ ৮০ শতাংশ শেষ হওয়ার পরও ব্যয় এক লাফে ৫৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের ও যানজটমুক্ত চলাচলের এই মেগা প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব গতকাল বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সচিবালয়ে মন্ত্রিসভা কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী এবং একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান। সভায় ১৪ হাজার ৪১ কোটি ২১ লাখ ব্যয় সম্বলিত ৮টি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১০ হাজার ৪৯৪ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ ৩ হাজার ৫৫০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে নতুন প্রকল্প ৩টি ও সংশোধিত প্রকল্প ৫টি।
অর্থ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থানীয় সরকার, পল্লিউন্নয়ন মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর; শিল্প, বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, পানি সম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, স্থানীয় সরকার, পল্লিউন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা সভায় অংশগ্রহণ করেন।
২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে কাওলা থেকে শুরু হয়ে আব্দুল্লাহপুর, কামারপাড়া, ধউর, আশুলিয়া, জিরাবো ও বাইপাইল অতিক্রম করবে। এরপর ঢাকা ইপিজেড এড়িয়ে সাভারের শ্রীপুর বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে শেষ হবে।
এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত এই সড়কটি চালু হলে ঢাকার যানজটপূর্ণ সড়ক এড়িয়ে চট্টগ্রাম বন্দর ও দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে একটি দ্রুতগতির যোগাযোগ করিডর তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবে আরো বলা হয়েছে, সমন্বিত পরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলা, নগরীর যানজট কমানো এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার সরকারি লক্ষ্যের সঙ্গে প্রকল্পটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। পাশাপাশি রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত হওয়ায় পণ্য পরিবহন ব্যয় ও যাতায়াতের সময়ও কমে আসবে।
কেন বাড়ানো হল প্রকল্প ব্যয়? বৈঠকের পর ব্রিফিংয়ে এসে এ প্রশ্নের মুখে পড়েন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এখানে আসলে ঢাকা-আশুলিয়া যে প্রকল্পের খরচটা এখন বেড়েছে, তার দুটো কারণ আছে। একটা হচ্ছে মূলত ডলার রেটে একটা বড় আকারে পরিবর্তন ঘটেছে। সেই ডলারের পরিবর্তনের কারণেই আবার কতগুলো ভ্যাট, ট্যাক্সসহ বেশ কিছু পরিবর্তনের জায়গা আছে। অপর কারণটির ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, এখানে নতুন একটা অঙ্গ সংযোজন হয়েছে। তো সেই অঙ্গ সংযোজনের ফলেও খরচের একটি বৃদ্ধি আছে। আর কিছু ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর, যেটা মূল ডিপিপিতে সেখানে ছিল না- যার ফলে ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তরে একটা খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে, আর পাঁচটি নতুন অঙ্গ সংযোজনের খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ দুটোই আসলে মূলত খরচ বৃদ্ধি। বাকিটা মূলত ডলারের রেট সমন্বয় এবং তদঅনুযায়ী যে ভ্যাট-ট্যাক্সের হিসাব, সেটা।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৭ সালে শুরু হওয়া বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা; এর মধ্যে চীনের অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা। প্রকল্পটি ২০২২ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরে ওই বছর জুনেই প্রকল্প প্রস্তাবে প্রথম সংশোধনী আনা হয়। এতে প্রকল্প ব্যয় ৬৫২ কোটি টাকা বেড়ে ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা দাঁড়ায়। তবে ওই সময় চীনের অর্থায়নের পরিমাণ কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা।
সবশেষ বুধবার একনেকে এ প্রকল্পের ব্যয় ৯ হাজার ৪৯২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা বাড়িয়ে করা হয় ২৭ হাজার ৪৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ বাড়ল এক লাফে ৫৪ শতাংশ টাকা। এতে সরকারের সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন প্রায় ৭৬ শতাংশ বেড়ে ১৩ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা এবং চীনের অর্থায়ন ৩৭ শতাংশ বেড়ে ১৩ হাজার ২৪২ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। সংশোধিত প্রকল্পের ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে তথ্য দিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী।
আরো যেসব প্রকল্পের অনুমোদন : এদিন এই প্রকল্প ছাড়াও আরো
আটটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে একনেক। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রকল্পগুলো অনুমোদন দেয়া হয়। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প তিনটি ও সংশোধিত প্রকল্প চারটি।
অনুমোদিত প্রকল্প হলো- স্থানীয় সরকার ও পল্লিউন্নয়ন সমবায় মন্ত্রণালয়ের ৩৬৮ কোটি ব্যয় বৃদ্ধি করে সর্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন-২ (জিএসআইডিপি-২) (প্রথম সংশোধন) প্রকল্প (২)। প্রকল্পটির ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা।
একই মন্ত্রণালয়ের বৃহত্তর দিনাজপুর (দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়) জেলা সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প। নতুন এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা। এই মন্ত্রণালয়েরই ২ হাজার ৮২ কোটি ব্যয়ের পল্লি সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থান প্রকল্প।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১ হাজার ২৩ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অনুমোদন দেয়া হয়েছে দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্প (তৃতীয় সংশোধিত)।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ১১৭ কোটি টাকা ব্যয় কমিয়ে ‘বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প, সিলেট বিভাগ (তৃতীয় সংশোধন)’ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। এখন ব্যয় দাঁড়াল ১ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা।
একই মন্ত্রণালয়ের ৭২৯ কোটি টাকার একটি মূল্যায়ন কাম উন্নয়ন কূপ (বেগমগঞ্জ-৫) ও দুটি ‘অনুসন্ধান কূপ (বেগমগঞ্জ-৬ ও সুনেত্র-২) খনন প্রকল্প।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসমূহে বিদ্যমান কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ এবং জেলা সদর হাসপাতালসমূহে ১০ শয্যার কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধন) প্রকল্প। ৮১ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে করা হয়েছে ৩৭৫ কোটি টাকা।
সভায় পরিকল্পনামন্ত্রী ইতোমধ্যে অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয় সম্বলিত ১১টি প্রকল্প সম্পর্কে একনেক সভায় অবহিত করেন। সেগুলো হলো- জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি আঞ্চলিক অফিস স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্প। বরিশাল টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট, গৌরনদী বরিশাল স্থাপন প্রকল্প (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্প। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তৃতীয় টার্মিনাল মোবাইলে নেটওয়ার্ক স্থাপন প্রকল্প।
নলকা-সিরাজগঞ্জ–-সয়দাবাদ আঞ্চলিক মহাসড়কের সিরাজগঞ্জ শহর অংশ (শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হতে কাটা ওয়াপদা মোড় পর্যন্ত ) চার লেনে উন্নীতকরণ ও অবশিষ্ট অংশ দুই লেনে উন্নীতকরণ (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্প।
পিরোজপুর-নাজিরপুর-মাটিভাঙ্গা-পাটগাতী-ঘোনাপাড়া (জেড-৭৭০৪) জেলা মহাসড়কের ঘোনাপাড়া হতে পাটগাতী সেতু এ্যাপ্রোচ পর্যন্ত অংশসহ জেড-৮৫০৪, জেড-৮৫০৭ ও জেড-৮৪২৯ জেলা সহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্প।
ভুয়াপুর লিংক সড়ক (জেড-৪৮০২) নির্মাণ (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্প। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ ইভাকুয়েশনের জন্য সঞ্চালন অবকাঠামো উন্নয়ন (প্রথম সংশোধন)। পূর্বাঞ্চলীয় গ্রিড নেটওয়ার্কের পরিবর্ধন এবং ক্ষমতাবন্ধন (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্প। গোপালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, বরিশাল, রংপুর, জামালপুর এবং যশোর জেলায় বিটাকের ছয়টি কেন্দ্র স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্প।
