শঙ্কায় সাড়ে চার হাজার স্বাস্থ্যকর্মী
সেবিকা দেবনাথ
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন নগর এলাকার দরিদ্র ও নি¤œআয়ের মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছেন প্রায় সাড়ে ৪ হাজার চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিক, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, পরিবার পরিকল্পনা কর্মী, কাউন্সেলর ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী। কিন্তু সম্প্রতি সরকারের নগর স্বাস্থ্যসেবা পুনর্গঠনের উদ্যোগের মধ্যেই তারা চাকরি হারানোর শঙ্কায়, মাসের পর মাস বেতন বকেয়া এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। একই সঙ্গে প্রকল্প পরিচালনাকারী কয়েকটি এনজিওর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, অতিরিক্ত সেবামূল্য আদায়, কেনাকাটায় দুর্নীতি, কর্মী ছাঁটাই এবং বেতন বৈষম্যের অভিযোগ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে দেয়া এসব কর্মচারীদের একটি লিখিত আবেদনে এসব অভিযোগ তুলে ধরে প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক তদন্ত, বকেয়া বেতন পরিশোধ, চাকরির নিরাপত্তা এবং দীর্ঘদিন কর্মরতদের রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগপত্র, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট নথি এবং কর্মীদের একাধিক বক্তব্য পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৯৯ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ‘আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারি প্রকল্প’ চালু হয়। বর্তমানে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ ১২টি সিটি করপোরেশন এবং ১৩টি পৌরসভায় ২১টি এনজিওর মাধ্যমে প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি সরকার ১৯২টি সরকারি ভবনে পরিচালিত নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেয়ার উদ্যোগ শুরু করেছে। তবে ভাড়া ভবনে পরিচালিত আরো ৯৭টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখনো এই প্রক্রিয়ার বাইরে থাকায় সেখানকার কার্যক্রম ও কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তারা বলছেন, চলতি মাসের ১২ তারিখে তৃতীয় বারের মতো সরকার এনজিওগুলোর কাছে তথ্য চাইলেও তারা তথ্য দেয়া থেকে বিরত আছে। এনজিওগুলো ইচ্ছাকৃত ভাড়াবাসায় পরিচালিত স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর তথ্য দিচ্ছে না। কারণ তারা এগুলো নিজেরাই পরিচালনা করতে চায়। যার প্রমাণ পাওয়া যায় সম্প্রতি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এ-সংক্রান্ত একটি সভার বক্তব্য থেকে। সেখানে এনজিওদের পক্ষ থেকে এই প্রতিষ্ঠানগুলো আরো এক বছর পরিচালনার অনুমতি চাওয়া হয়। তারা বলেন, আরো এক বছর যদি তারা ভালো করে চালাতে পারেন, তাহলে সরকারি খাতে নেয়ার প্রয়োজন নেই। যদিও স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এ বিষয়ে আপত্তি জানান। তবে এখনো এনজিওগুলোর পক্ষ থেকে এ-সংক্রান্ত তথ্য মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের পাঠানো হয়নি। যদিও বর্তমান সরকার নগর স্বাস্থ্য সেবায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু
এনজিওগুলোর এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারি উদ্যোগকে ব্যর্থ করার অপচেষ্টা মাত্র।
যেসব এনজিও জড়িত : সীমান্তিক, বিএপিএএসএ, ড্যাম, পিএসটিসি, এডামস, নারীমৈত্রী, ইউটিপিএস, চট্টগ্রাম সিটিজি, এমএএমএটিএ, লাইট হাউজ, এফপিএবি, পিএসকেপি এণ্ড পিপিএস, গোপালগঞ্জ পাওয়ার, কুষ্টিয়া পাওয়ার, তিলোত্তমা, রিক, পদক্ষেপ, উন্নয়ন, আরটিএম, তারাবো পাওয়ার, সামাহার। এই এনজিওগুলো সারাদেশে নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র পরিচালনা করে আসছে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য : ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে কার্যক্রম পরিচালনাকারী এনজিও নারীমৈত্রীর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ছিল দুদকে। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তদন্ত কমিটির সামনে সাক্ষাতের জন্য ডাকা হয়। ২০২৫ সালে ইউটিপিএস কর্মীদের জন্য একটি নির্দেশনা জারি করে। সেখানে তারা উল্লেখ করে, প্রতিটি স্যাটেলাইট ক্লিনিক ৩০ হাজার টাকার কম আয় করলে সেটি বন্ধ করে দেয়া হবে। এফডব্লিউএ/এসপিদের প্রতি মাসে ৭টি ডেলিভারি করতে হবে, ব্যর্থ হলে এক হাজার টাকা বেতন থেকে কেটে নেয়া হবে। আয়া, পিওন ছাড়া বাকি সব কর্মীদের মাসে অন্তÍত একটি করে ডেলিভারি করতে হবে। অন্যথায় এক হাজার টাকা বেতন থেকে কেটে নেয়া হবে। মাসিক খরচের ৫০ শতাংশ আয় করতে না পারলে আয়ের আনুপাতিক হারে বেতন কাটা হবে। এর প্রেক্ষিতে ওই বছরের আগস্ট মাসে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ৫০০ টাকা থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন কাটা হয়। কুড়িগ্রামের রিকের এক কর্মী জানান, সেখানে কর্মী ছিল ৩২ জন। কিন্তু সিভিল সার্জন অফিসে লিস্ট দেয়া হতো ৩৯ জনের।
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে নারীমৈত্রীর প্রোগ্রাম ম্যানেজার ওসাং প্রো বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে যখন যে তথ্য চাওয়া হয়েছে আমরা দিয়েছি। অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ বিষয়ে বলেন, যখনকার অভিযোগ তখন তিনি এই প্রতিষ্ঠানে ছিলেন না। তিনি বলেন, নগর স্বাস্থ্যে যারা কাজ করেন, তাদের মধ্যে নারীমৈত্রী সবচেয়ে ভালো কাজ করে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উপপ্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন বলেন, প্রকল্প শেষ হওয়ার পরে আমরা এক বছর কার্যক্রম চালিয়েছি, কোনো সমস্যা হয়নি। যেসব অভিযোগের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে আমার জানা নেই।
স্বাস্থ্য কর্মীদের অভিযোগ : প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে এনজিওগুলোর পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া ‘৫০+৫০’ অর্থায়ন মডেলের কারণে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর ওপর আয় বাড়ানোর চাপ সৃষ্টি করা হয়। এর ফলে আগে স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে দেয়া অনেক সেবার জন্যও অর্থ নেয়া শুরু হয়। প্রকল্প নীতিমালা অনুযায়ী মোট সেবাগ্রহীতার ৩০ শতাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ‘লাল কার্ড’-এর মাধ্যমে বিনামূল্যে সেবা দেয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে সেই সুবিধা কার্যত সীমিত হয়ে পড়েছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে লাল কার্ডধারীদের (বিনামূল্যে সেবাগ্রহীতা) কাছ থেকেও অর্থ আদায় করা হচ্ছে। যা এই প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পরিপন্থি।
সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন : প্রকল্প পরিচালনাকারী কয়েকটি এনজিও আয় বাড়ানোর নামে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা চাপিয়ে দিয়েছে। কোনো স্যাটেলাইট ক্লিনিক মাসে ৩০ হাজার টাকা আয় করতে না পারলে, সেটি বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সংখ্যক প্রসবসেবা নিশ্চিত করতে না পারলে চিকিৎসক, প্যারামেডিক ও অন্য কর্মীদের বেতন থেকে অর্থ কেটে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে। মাসিক ব্যয়ের অন্তত ৫০ শতাংশ আয় না হলে কর্মীদের বেতনও আনুপাতিক হারে কমিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তের কথাও উঠে এসেছে ইউপিএইচসিএসডি নামের একটি এনজিওর জরুরি নির্দেশনায়।
বাড়ানো হয়েছে সেবামূল্য : ৫০+৫০ মডেল বাস্তবায়নের ফলে রোগীদের সেবামূল্য ৫০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তালিকায় দেখা যায়, আগে ওপিডি চিকিৎসা পেতে ব্যয় করতে হতো ৫০ টাকা, বর্তমানে সেটি ১০০ টাকা। একইভাবে গর্ভকালীন পরীক্ষা এবং প্রসব-পরবর্তী সেবা পেতে রোগীকে ব্যয় করতে হতো ৫০ টাকা, এখন ব্যয় করতে হচ্ছে ১০০ টাকা। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে সিবিসি ৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা; এইচবি ৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০০ টাকা; এইচবিএসএজি ১৭০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫০ টাকা; সিআরপি ১৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা; আরএ ১৫০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা; এএসও ১৮০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা; ক্রসম্যাচ ২০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা; এমআর ৫০০ টাকা থেকে ২৫০০ টাকা; পিএসি ১০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০০ টাকা; সিজারের আগে ফি ছিল ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা, বর্তমানে করা হয়েছে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা; স্বাভাবিক প্রসব আগে ছিল ১০০০ টাকা, এখন ২৫০০ টাকা। এমনকি অ্যাম্বুলেন্স সেবামূল্য ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০০ টাকা করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যকর্মীদের ভাষ্য : স্বাস্থ্যসেবাকে জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের পরিবর্তে রাজস্বনির্ভর ব্যবসায়িক কাঠামোয় পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবা যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি স্বাস্থ্যকর্মীরাও পেশাগত নিরাপত্তা হারাচ্ছেন।
অভিযোগপত্রে যা আছে : অভিযোগপত্রে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পে পর্যাপ্ত অর্থায়ন থাকা সত্ত্বেও অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী পাঁচ, ছয় এমনকি সাত মাস পর্যন্ত বেতন পাননি। এতে তাদের পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসা ব্যয় এবং দৈনন্দিন জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। একই সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, আর্থিক অস্বচ্ছতা, অতিমূল্যে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র কেনা, ভুয়া বিল-ভাউচার এবং প্রকল্প তহবিল ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে।
কর্মচারীদের দাবি : দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে কর্মরত ও সাবেক কর্মকর্তাদের কাছে এসব অনিয়মের বিভিন্ন নথি, বিল-ভাউচার এবং ক্রয়সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে তারা প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ দিতে প্রস্তুত। তারা আরো বলেন, প্রায় তিন দশক ধরে গড়ে ওঠা এই দক্ষ জনবলই নগর এলাকার মাতৃস্বাস্থ্য, নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদান, পুষ্টি, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা, রোগী কাউন্সেলিং এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবার মূল ভিত্তি। এই জনবল হারিয়ে গেলে নগর স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে নগর স্বাস্থ্যকর্মী ইউনিয়নের আহ্বায়ক ডা. সালেহা খাতুন বলেন, দীর্ঘদিন কর্মরতদের রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত বা স্থায়ী নিয়োগ দিতে হবে। পাশাপাশি সব পর্যায়ের কর্মীর চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসনিম বলেন, আমরা নগর স্বাস্থ্য সম্পৃক্ত সবাইকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে আত্মীকরণ করতে চাই। কাউকে বাদ নয়। কারণ সরকারের কাক্সিক্ষত নগর স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে সবার সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, নগর স্বাস্থ্যসেবা পুনর্গঠনের এই সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতাকে কাজে লাগানো। একই সঙ্গে প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় যদি কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকে, তবে জনস্বার্থে তা স্বাধীনভাবে তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
