এক বছরে বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে খেলাপি ঋণ
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
খেলাপি ঋণের হারে বিশ্বে এখন শীর্ষে বাংলাদেশ। দিন দিন দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের সংকট আরো গভীর হচ্ছে। বিশেষ করে খুচরা (রিটেইল) ঋণ গ্রাহকদের মধ্যে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত এক বছরে শ্রেণিকৃত (খেলাপি) ঋণসংবলিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে চলতি বছরের মার্চ মাসের শেষে প্রায় ৪৬ লাখে পৌঁছেছে। এর বেশিরভাগই ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের হিসাব, যা সাধারণ গ্রাহক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ছোট ব্যবসায়ীদের আর্থিক চাপ বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। এদিকে ঋণ আদায়ে জোর দেয়ার পাশপাশি এক্ষেত্রে ধাপে ধাপে কঠোর হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আছে, এমন অ্যাকাউন্টের সংখ্যা চলতি বছরের মার্চ শেষে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২১ লাখ ৬৩ হাজার। গত ২৩ জুলাই ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ শীর্ষক এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বলা হয়, খুচরা পর্যায়ে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ব্যাপক অবনতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়া ও পারিবারিক ঋণের চাপ, এসএমই কার্যক্রমে স্থবিরতা এবং কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসা খাতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমাসর কারণে এটা হতে পারে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, যদিও উচ্চ অঙ্কের খেলাপি ঋণ বড় ধরনের আর্থিক ধাক্কা তৈরি করে, তবে ছোট হিসাবগুলোও বড় আর্থিক সংকটের সতর্কবার্তা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, মোট বকেয়া ঋণের বিপরীতে সার্বিক মন্দ বা খেলাপি ঋণের অনুপাত গত বছর যেখানে ছিল ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ, এবার তা বেড়ে চলতি বছরের মার্চে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসলামী ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে, যা সুশাসনের অভাবকে নির্দেশ করে।
অন্যদিকে, বিদেশি ব্যাংকগুলোর কঠোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কারণে খেলাপির হার খুবই কম। বাংলাদেশ ব্যাংক উল্লেখ করেছে, ২০১৬ বা তার পরে চালু হওয়া নতুন ব্যাংক এবং বিদেশি ব্যাংকগুলো ছাড়া বাকি সব রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও ইসলামী ব্যাংকগুলোতে ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে খুচরা ঋণ বেড়েছে। শিল্পভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, কুটির শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এ খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ।
ব্র্যাক ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও রিটেইল ব্যাংকিং প্রধান মো. মাহীয়ুল ইসলাম বলেন, ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণ বাড়ার একটি কারণ হতে পারে সঠিক ঋণ ঝুঁকি মূল্যায়নের অভাব। এর একটি অংশ কনজিউমার ও ক্রেডিট কার্ড ঋণ হওয়ার সম্ভাবনা আছে, যা উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ক্রয়ক্ষমতা কমানোর কারণে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে চলতি বছরের মার্চের মধ্যে ব্যবসা, কৃষি ও শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ার পাশাপাশি সব ধরনের শিল্পেই খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে শুধু বড় ঋণগ্রহীতাদের নয়, ক্ষুদ্র ও খুচরা ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারেও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। একই সঙ্গে ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি মূল্যায়ন আরো শক্তিশালী করা এবং নিয়মিত তদারকি বাড়ানো না গেলে ব্যাংকিং খাতে এই চাপ আরো বাড়তে পারে।
ঋণ আদায়ে ধাপে ধাপে কঠোর হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক : বর্তমানের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ খেলাপি ঋণ কমিয়ে চলতি বছর শেষে ২০ শতাংশে নামানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর আগামী বছর শেষে ১০ শতাংশে নামানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর অংশ হিসেবে প্রথম পর্যায়ে শুরুতে সুদ মওকুফসহ নানা শিথিলতার মাধ্যমে ঋণ আদায়ে জোর দেয়া হয়েছে। তবে ধাপে ধাপে কঠোর হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এক পর্যায়ে মূলধন ঘাটতি পূরণে ব্যর্থ ব্যাংকের পরিচালকরা মালিকানা হারাবেন। এর পর ব্যাংক রেজল্যুশনের আওতায় এনে বিক্রি, একীভূতকরণ বা অবসায়নের মতো সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে মোট ২১টি কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা হয়েছে। এসব নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক বৈঠক করেছেন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। সিদ্ধান্ত হয়েছে, নতুন করে ঋণ পুনঃতফসিলে আর বিশেষ কোনো নীতিমালা হবে না। গত ২৯ জুন জারি করা ‘এক্সিট পলিসি’-এর আওতায় অন্তত মূল ঋণ আদায় করতে হবে। যে কারণে আয় খাতে নেয়া সুদ এবং তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়ও মওকুফের সুযোগ রাখা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত শিথিল নিয়মে ঋণ পরিশোধ করা যাবে। আগামী বছর থেকে কঠোরতার অংশ হিসেবে দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়ন এবং বিদ্যমান অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন করে ৬ মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান যুক্ত করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, যেসব খেলাপি গ্রহীতা নমনীয় নীতিতে ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করবেন না, তাদের নাম, ছবিসহ তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হবে। এ তালিকা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা যেমন-বিমানবন্দর, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও শাখার সামনে টানিয়ে রাখা হবে।
ব্যাংকগুলোর প্রকৃত খেলাপি ঋণের আলোকে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতি বের করা হবে। খেলাপি ঋণ কমানোর মাধ্যমে প্রভিশন ঘাটতি পূরণ করে প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংক পরিচালনায় যুক্তদের একটি সময়সীমা বেঁধে দেয়া হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মূলধন পূরণ করতে না পারলে পরিচালকরা মালিকানা হারাবেন। এভাবে একবার কারো মালিকানা গেলে পরবর্তী ৫ বছরের জন্য তিনি আর কোনো ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার যোগ্য হবেন না।
