‘গভীর যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়ছে সৌদি
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতকে কেন্দ্র করে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী, ইরাকের মিলিশিয়া ও ইরান- এই তিন শত্রুর মুখোমুখি হয়েছে সৌদি আরব। ফলে লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনে এক প্রকার কোণঠাসা হয়ে পড়েছে দেশটি। ইতোমধ্যে পাল্টাপাল্টি বিমান হামলার ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নৌপথ সুরক্ষায় বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশ নিয়ে একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করেছে সৌদি আরব।
এই বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটের স্বাক্ষরকারী দেশের মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ, তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও কমোরোস। এই জোটের প্রধান কার্যালয় হচ্ছে সৌদি ভূখণ্ডেই। তবে দেশটির কোন শহরে এর হেডকোয়ার্টার হচ্ছে, তা নির্দিষ্ট করা হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সম্মিলিত সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ গড়ে তোলা হয়েছে। জোটভুক্ত দেশগুলো স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ভারত মহাসাগরের সঙ্গে ভূমধ্যসাগরকে যুক্ত করা এই অতি গুরুত্বপূর্ণ তিনটি জলপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের রুট পুরোপুরি নিরাপদ রাখতে চায় তারা।
তবে কোন দেশ ঠিক কতগুলো যুদ্ধজাহাজ বা বিমান পাঠাবে, সে তথ্য এখনই প্রকাশ করা হয়নি। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ সামরিক মহড়া এবং একযোগে নৌ অভিযান পরিচালনার বিষয়টি এই জোটের মূল কার্যপরিধির মধ্যে থাকছে। এই উদ্যোগ পুরোটাই আত্মরক্ষামূলক এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে গঠিত হয়নি বলে জোটের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরো জানানো হয়, প্রয়োজনীয় জাতীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অন্য দেশগুলোর জন্যও এই জোটের সনদে যুক্ত হওয়ার পথ খোলা রাখা হয়েছে। সদস্য দেশগুলোর দৃঢ় বিশ্বাস- সামুদ্রিক নিরাপত্তা কোনো একক দেশের বিষয় নয়, এটা যৌথ দায়িত্ব। আন্তসীমান্ত নৌ হুমকি মোকাবিলায় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ই প্রধান মূলধন।
আল-জাজিরা সূত্রে জানা গেছে, লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও এডেন উপসাগরের নৌপথ সুরক্ষায় এই জোট গঠনের আলোচনায় অংশ নিতে ৫১টি দেশকে আমন্ত্রণ জানায় সৌদি আরব। এর মধ্যে সাড়া দিয়ে বৈঠকে হাজির হয় ৪৩টি দেশের প্রতিনিধিরা। বৈঠকে উপস্থিত ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি প্রতিনিধি দলও। যদিও লোহিত সাগরে আগে থেকেই ইইউর ‘অ্যাস্পাইডস’ নামে একটি নিজস্ব নৌ নিরাপত্তা মিশন চালু রয়েছে, ফলে সৌদি-নেতৃত্বাধীন এই নতুন জোটের কার্যক্রম তাদের চেয়ে কতটা আলাদা হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে ইরানকে কেন্দ্র করে সমুদ্র জলপথে এমন সংকট তৈরি হলেও এই জোটে স্বাক্ষর করেনি সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ওমান কেউই। গত সপ্তাহেই ইরানের মদতে লোহিত সাগরে সৌদি আরবের ওপর একধরনের সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেয় হুতি বিদ্রোহীরা। ফলে এখন সৌদির তেলবাহী জাহাজগুলোর চলাচল মারাত্মক বিঘ্নিত হচ্ছে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হুতি গোষ্ঠী ও সৌদির মধ্যে পাল্টাপাল্টি বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে ওই অঞ্চলে তীব্র উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। যা একপ্রকার অলিখিত অবরোধের মতোই।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৭০ শতাংশ লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে রপ্তানি করে সৌদি আরব। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার পর সৌদি আরব তাদের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ব্যবহার করে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানি বহুগুণ বাড়িয়েছিল। কিন্তু বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে হুতিদের অবরোধের ফলে সেই বিকল্প পথটি এখন পুরোপুরি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। লোহিত সাগরে সৌদির তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার দাবি এবং হুতিদের কড়াকড়ির কারণে অনেক জাহাজ পথ পরিবর্তন বা ইউটার্ন করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে সৌদির দৈনিক তেল লোডিং এবং বৈদেশিক মুদ্রার আয় কমিয়ে দিচ্ছে। এ কারণে সৌদির অর্থনীতি ও রাজস্ব আয়ে বড় বিপর্যয় নেমে আসার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে চাপে পড়েছে বাংলাদেশ, জাপান, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো। এসব দেশ তাদের আমদানির ৯০ শতাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে ক্রয় করে থাকে। এখন হরমুজ প্রণালি ও বাব এল-মান্দেব প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ থাকায় চাপে পড়েছে এশিয়ার এসব দেশ। সরবরাহ নিশ্চিত করতে এখন নানা চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। কিন্তু গত সোমবার হুতি বিদ্রোহীরা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, লোহিত সাগর দিয়ে সৌদির কোনো পণ্য রপ্তানি করতে দেয়া হবে না।
মূলত ইরিত্রিয়া, জিবুতি ও ইয়েমেনের মাঝে বাব আল-মানদেব প্রণালি অবস্থিত। সামুদ্রিক এই সংকীর্ণ জলপথের পাশের ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশটি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এটি লোহিত সাগরে প্রবেশ ও বের হওয়ার মাত্র দুটি জলপথের একটি। অন্যটি হচ্ছে সুয়েজ খাল। এ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেলসহ বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক বাণিজ্যের ১০ থেকে ১২ শতাংশ সরবরাহ হয়ে থাকে। এই অবস্থান সশস্ত্র হুতি গোষ্ঠীকে লোহিত সাগরে জাহাজগুলো নিশানা করার কৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছে।
ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, গত মার্চ মাসে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাব এল-মান্দেব প্রণালিকে এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি সরবরাহের ‘লাইফলাইন’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। তবে সৌদি আরব ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবার সংঘাত শুরু হওয়ায় শিগগিরই জলপথটি স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ নেই। এছাড়া চলমান আঞ্চলিক সংঘাত থেকে নিজেদের দূরে রাখতে বিগত পাঁচ মাস ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছিল সৌদি আরব। এমনকি ইরানি ড্রোন দেশটির তেলশিল্পকে লক্ষ্যবস্তু করার পরও তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছিল রিয়াদ। এই পথও এখন কতটা খোলা থাকবে তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কেপলার জানিয়েছে, গত সপ্তাহে বাব এল-মান্দেবে ইয়ানাবু বন্দরে হামলার পর থেকে লোহিত সাগর দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের হার অনেক কমে গেছে। এমন আবহেই ১৪ দেশ নিয়ে ওই বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করেছে সৌদি আরব।
অন্যদিকে কার্যত বন্ধ থাকা হরমুজ প্রণালিও সচল হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানান, হরমুজ প্রণালিতে সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা তাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন। ওমান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প নৌপথের পরিকল্পনা ইরান মেনে নেবে না।
তাই শান্ত পরিবেশের অবসান ঘটিয়ে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ‘আকস্মিক’ হামলা চালিয়ে নতুন করে যুদ্ধকে উসকে দিয়েছে ইরান। হামলাটি ইরানের স্থানীয় সময় বুধবার রাত সোয়া ১টা দিকে চালানো হয়। এতে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে ১৩ দিন ধরে চলা লড়াইয়ের পর যে বিরতি ঘটেছিল তার অবসান হয়।
এ ঘটনায় পাল্টা জবাব দিতে ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীর ওপর যৌথ হামলা চালায় মার্কিন ও সৌদি বাহিনী। ফলে সময় যত এগোচ্ছে যুদ্ধ নতুন মাত্রা পাচ্ছে। ইয়েমেনের হুতি, ইরাকের মিলিশিয়া ও ইরানের হুমকির মুখে গভীর সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে সৌদি আরবও।
ফক্স নিউজকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা ওদের (ইরান) ওপর মারাত্মক আঘাত হানব। ওদের কঠোর জবাব দেয়া হবে।’ ইতোমধ্যে জর্ডানে ওই হামলার জবাবে শুধু ইরাক নয়, ইরানে আইআরজিসির একাধিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
জার্মান চিন্তক প্রতিষ্ঠান এসডব্লিউপির গবেষক হামিদ রেজা আজিজি মনে করেন, সম্প্রতি ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকের পরই বিরতি ভেঙে জর্ডানে আকস্মিক হামলা চালায় ইরান। এই হামলা ইরানের কৌশলগত অবস্থানে বড় পরিবর্তনকে ইঙ্গিত দেয়। কারণ আগাম হামলার প্রয়োজন মনে করলে তারা আর পিছিয়ে থাকছে না।
এ বিষয়ে ইসরায়েলের গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, ‘তেহরান বা তার মিত্ররা নিজেদের মূল লক্ষ্য থেকে সরতে রাজি নয়। ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর কর্তৃত্ব ধরে রাখতে চায়, আর হুতিরা মার্কিন অবরোধ না তোলা পর্যন্ত হামলা থামাবে না।’ সিট্রিনোভিচের মতে, ‘ওয়াশিংটনের সামনে এখন দুটি পথ খোলা- ইরানের কিছু দাবি মেনে নেয়া, অথবা বাণিজ্য ও জ্বালানি রুটে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্য তৈরি থাকা।’
উল্লেখ্য, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়ে সৌদিকে কূটনৈতিক ও কৌশলী ভূমিকা পালনের ওপর জোর দিতে বলছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দেশের স্বার্থ রক্ষা এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা এড়াতে নিরপেক্ষতা ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেয়া অত্যন্ত জরুরি।
