×

প্রথম পাতা

দামের উত্তাপে পুড়ছে মানুষ

Icon

সেবিকা দেবনাথ

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দামের উত্তাপে পুড়ছে মানুষ

‘বাজারে এসে পণ্যের দাম জিজ্ঞেস করলেই যেন ছ্যাঁকা লাগে। বিক্রেতার কাছে যে সবজির দামই জিজ্ঞেস করি সবই ১০০ টাকার বেশি। আলু আর পেঁপে ছাড়া, সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে সব নিত্য পণ্যের দাম। এখন কি আমরা যারা সীমিত আয়ের মানুষ আছি, তারা সবাই পেঁপে আর আলু খাব? মোটা চালের কেজিও ৬০ টাকা। সরকার কি এসব দেখে না? কোনো ইস্যু হলেই ১৭ বছরের উদাহরণ টানে। মানলাম এত বছর ধরে সমস্যা হয়েছে। এখন সরকার বাজারে নিত্য পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না কেন? এখানেও কি ১৭ বছরের উদাহরণ দিবেন? মন্ত্রী বাজার ঘুরে মিডিয়াতে বলেন পণ্যের দাম বাড়েনি। কিন্তু বাজারে এসে তো আমরা ভিন্নচিত্র দেখতে পাই। বেশি দামেই পণ্য কিনতে হয় আমাদের। সরকারের পক্ষ থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণে আছে বলে দাবি করলেও এর প্রতিফলন দেখছি না। সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে।’ গতকাল শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শান্তিনগর কাঁচা বাজারে বাজার করতে আসা আমিনুল ইসলাম এভাবেই ক্ষোভ ঝাড়েন।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চল্লিশোর্ধ আমিনুল বলেন, ‘পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকা মুশকিল হয়ে পড়ছে। সরকার কত কী নিয়ে ভাবছে, অথচ সীমিত ও স্বল্প আয়ের মানুষরা কীভাবে বেঁচে থাকবে তা নিয়ে ভাবছে না। বন্যা ও বৃষ্টির কারণে ফসলের ক্ষতি হয়েছে এটি ঠিক। কিন্তু এর দোহাই দিয়ে লাগামহীনভাবে কেন দাম বাড়াবে? এই তথ্য কি সরকারের অজানা?

হাতিরপুল বাজারে বাজার করতে আসা পেশায় শিক্ষক রিয়াজুল হকের কণ্ঠেও নিত্য পণ্যের দাম নিয়ে ক্ষোভ। তিনি বলেন, নিত্য পণ্যের দাম বেড়ে চলছে তো চলছেই। আমরা যারা সীমিত ও স্বল্প আয়ের মানুষ তাদের আয় কি বেড়েছে? বাড়েনি। তাহলে আমরা বাঁচব কীভাবে? অবৈধ পথে উপার্জন করব? বাজারে নিত্য পণ্যের দামে যে অবস্থা তাতে আমাদের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। কিন্তু সরকার নির্বিকার।

একই বাজারে বাজার করতে আসা গৃহিণী তাসনুভা বলেন, টিভিতে দেখলাম এক অনুষ্ঠানে বক্তারা বলছেন, পণ্য পরিবহনের পথে চাঁদাবাজির কারণে অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এই অর্থটা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছ থেকেই নেয়া হয়। তাই যদি হয়, তাহলে কী বলব, এখন পথে চাঁদাবাজি বেড়েছে? তাই পণ্যের দাম বাড়ছে? সরকারকে বলব, দয়া করে নিত্য পণ্যের দামে লাগাম টানুন। সাধারণ মানুষের কষ্টটা বুঝুন।

নিত্য পণ্যের দাম বাড়ার বিষয়টি সম্প্রতি উঠে এসেছে গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ’ (সিপিডি) পরিচালিত এক গবেষণায়ও। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষকের কাছ থেকে উৎপাদিত পণ্য ভোক্তার টেবিলে পৌঁছাতে একাধিক ধাপ পার হওয়ার সময় অস্বাভাবিকভাবে দাম বেড়ে যাচ্ছে। মধ্যস্বত্বভোগী, মিলার, পাইকার, আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতাদের বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত মুনাফা এবং পরিবহন ব্যবস্থায় চাঁদাবাজির কারণে দেশের অন্তত ১০টি নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কৃষক পর্যায়ের তুলনায় কখনো কখনো দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাচ্ছে। সংস্থাটি বলছে, বাজারে স্বচ্ছতা ও কার্যকর নজরদারির অভাবে সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে অস্বাভাবিক মুনাফা করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর ফলে কৃষক ন্যায্য দাম পান না, আবার ভোক্তাকেও বেশি দাম গুনতে হয়।

সিপিডির গবেষণায় দেশের ৮১০টি বাজার ঘুরে ১০টি নিত্য পণ্যের দাম বাড়ার বিভিন্ন ধাপ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, সব পণ্যের ক্ষেত্রেই একই পর্যায়ে দাম বাড়ে না; বরং পণ্যের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি মূল্য সংযোজন হয়। চাল উৎপাদকের কাছ থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে ৫টি ধাপ অতিক্রম করে। এই প্রক্রিয়ায় চালের গড় দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর মধ্যে মিলার পর্যায়েই কেজি প্রতি গড়ে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৮ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ে। ডালের ক্ষেত্রে শহরের আড়তদাররা সবচেয়ে বেশি মূল্য বাড়ান। একই চিত্র মরিচের বাজারেও দেখা গেছে। মরিচের ক্ষেত্রে শহরের আড়তদাররা গড়ে কেজি প্রতি প্রায় ১০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়ে দেন। অন্যদিকে বেগুন ও আলুর বাজারে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেন খুচরা বিক্রেতারা। পেঁয়াজের ক্ষেত্রে প্রান্তিক পাইকারদের পর্যায়ে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে এসে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায়। আমিষ জাতীয় পণ্যের বাজারেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। সিপিডির গবেষণায় বলা হয়, মাছের দামের সবচেয়ে বেশি দাম বাড়ে শহরের আড়তদার পর্যায়ে। ডিম ও মুরগির বাজারে পাইকাররা বড় ভূমিকা রাখেন। আর গরুর মাংসের ক্ষেত্রে ব্যাপারীদের হাত ধরে কেজি প্রতি গড়ে প্রায় ৭৫ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ে।

ওই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, খাদ্যপণ্যের দাম কমাতে হলে বাজারব্যবস্থার অসংগতি দূর করার পাশাপাশি কৃষিপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল আরো দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। তিনি স্বীকার করেন, কৃষিপণ্য পরিবহনের পথে চাঁদাবাজির কারণে অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তবে বাজার নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি কমাতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

একই অনুষ্ঠানে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, কৃষিপণ্য পরিবহনের পথে চাঁদাবাজির কারণে অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এই অদৃশ্য ব্যয় শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাকেই বহন করতে হয়।

১০০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই; কাঁচা মরিচ ৪শ থেকে ৪২০ টাকা

টানা বৃষ্টির প্রভাবে সরবরাহ কমে যাওয়ায় প্রায় সব ধরনের সবজির দাম আরো বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ক্রেতা ও বিক্রেতা। অধিকাংশ সবজির দাম এখন ১০০ টাকার আশপাশে বা তারও বেশি। এরমধ্যে সাধারণ মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে কাঁচামরিচের দাম। এখন বাজারে প্রতি কেজি মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪২০ টাকায়। বরবটি ৯০ থেকে ১০০ টাকা, করলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, কচুরলতি ৮০ থেকে ৯০ টাকা, কাঁকরোল ১২০ টাকা, গাজর ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, পটল ৮০ টাকা, চিচিঙ্গা ১০০ টাকা, দেশি শসা ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, টমেটো ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি এবং আকারভেদে লাউ ৯০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লম্বা বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে। গোলাকৃতির কালো বেগুনের দাম উঠেছে ১৮০ টাকায় এবং সাদাটা বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা কেজি দরে। কোথাও কোথাও মানভেদে বেগুনের দাম ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত কমবেশি দেখা গেছে। এই চড়া বাজারে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে শুধু পেঁপে। প্রতি কেজি পেঁপে পাওয়া যাচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়। তবে সপ্তাহ দুয়েক আগেও অধিকাংশ সবজির দাম বর্তমানের তুলনায় ২০ থেকে ৪০ টাকা কম ছিল।

বিক্রেতারা বলছেন, বৃষ্টিতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সরবরাহ কমে যাওয়ায় মরিচের দাম দ্রুত বেড়েছে। এছাড়া অন্যান্য সবজির দামও বাড়তি।

পাইকারি বাজারে বেড়েছে পেঁয়াজের দাম

দেড়-দুই সপ্তাহ আগেও দেশি পেঁয়াজের দাম ছিল মানভেদে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। যা এখন বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬৫ টাকায়। চারদিন আগেও ছিল ৫০ থেকে ৬০ টাকা।

বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজারে হঠাৎ করেই পেঁয়াজের দাম বেশি। যে কারণে এক সপ্তাহ আগেও যে পেঁয়াজ ৪০ টাকায় বিক্রি করেছি, তা এখন ৬০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। ভালো মানের বাছাই করা পেঁয়াজ ৬৫ টাকাও বিক্রি করতে হচ্ছে। এদিকে জাতভেদে আলু ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

আরো বেড়েছে মাছ-মুরগি-ডিমের দাম

গরুর মাংস বাদে চলতি সপ্তাহে আরো এক দফা বেড়েছে মাছ, ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দাম। তবে সবচেয়ে বেশি উত্তাপ ছড়াচ্ছে মাছের বাজার। বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছের দাম এখন সাধারণ ক্রেতাদের একেবারেই নাগালের বাইরে; হাজার টাকার নিচে মিলছে না কোনো সামুদ্রিক মাছ।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে প্রতি কেজি মাছের দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গরিবের মাছ হিসেবে পরিচিত পাঙাশের কেজি এখন ২০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পুকুরে চাষ করা পাঙাশ, তেলাপিয়া, রুই, কাতলা, মৃগেল ও পোয়া মাছের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি জ্যান্ত পাঙাশ ২৩০ টাকা এবং তেলাপিয়া ২৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাজারে মানভেদে প্রতি কেজি চিংড়ি ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৭০০ টাকা, ওজন ভেদে রুই মাছ ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা ও টেংরা ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা, বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, পোয়া ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আকারভেদে চাষের শিং মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকায়। তবে রূপচাঁদা, বড় আকারের শোল ও নদীর বেলে মাছ কিনতে গেলে ক্রেতাকে হাজার টাকার বেশি গুনতে হচ্ছে। মান ও আকারভেদে প্রতি কেজি ইলিশ ১৬০০ থেকে ৩২০০ টাকা, রূপচাঁদা (সাদা) ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাছের পাশাপাশি দাম বেড়েছে ডিমেরও। গত সপ্তাহের তুলনায় ডজনে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়ে বর্তমানে ফার্মের মুরগির ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪৫ থেকে ১৫৫ টাকায়। মুরগির বাজারেও বেড়েছে দাম। ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৯০ থেকে ২১০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংসের দাম স্থির থাকলেও তা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা দরে। আর খাসির মাংস কিনতে গেলে কেজিতে গুনতে হচ্ছে ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা।

ডাবল সেঞ্চুরি ছাড়াল পোলাও চাল

পোলাও চালের দাম বেড়ে ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, গত ৬ মাসে কেজিতে বেড়েছে ৮০ থেকে ৯০ টাকা। গত এক সপ্তাহে বেড়েছে প্রায় ৪০ টাকা। বাজারে ব্র্যান্ডভেদে প্যাকেটজাত পোলাও চাল কেজি প্রতি ২১০ থেকে ২৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা চালের দাম ১৬০ থেকে ২০০ টাকা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

অঙ্কুশকে নিয়ে নতুন গেম শোর পরিকল্পনা রাজের

অঙ্কুশকে নিয়ে নতুন গেম শোর পরিকল্পনা রাজের

অস্ত্রত্যাগে রাজি হামাস, সেনা সরাবে ইসরায়েল: ট্রাম্প

অস্ত্রত্যাগে রাজি হামাস, সেনা সরাবে ইসরায়েল: ট্রাম্প

ওমান উপকূলে ট্যাংকার জাহাজে হামলা

ওমান উপকূলে ট্যাংকার জাহাজে হামলা

আজ থেকে শুরু জুলাই-গ্রাফিতি পুনর্লিখন কার্যক্রম

ঢাবি ক্যাম্পাস আজ থেকে শুরু জুলাই-গ্রাফিতি পুনর্লিখন কার্যক্রম

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App