গ্যাসের সংকট কাটেনি থমকে আছে জনজীবন
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের সংকট কাটেনি। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এ সংকটে প্রতিদিন ভোরের আগেই স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পাওয়ায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন সিএনজি অটোরিকশা, বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকরা। এর প্রভাব পড়েছে নগরীর গণপরিবহন ব্যবস্থায়ও। কর্মজীবী মানুষ থেকে শুরু করে জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া সাধারণ নাগরিকরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংকট দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেয়া হলেও বাস্তবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার চিত্র এখনো ভিন্ন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং গ্যাসের চাপ কম থাকায় সিএনজি স্টেশনগুলো স্বাভাবিক সক্ষমতায় সেবা দিতে পারছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর মহাখালী, তেজগাঁও, কল্যাণপুর, শ্যামলী, গাবতলীসহ বিভিন্ন এলাকার সিএনজি ফিলিং স্টেশনে এখনো গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো স্টেশনে রাতে কিছু সময়ের জন্য গ্যাস সরবরাহ পাওয়া গেলেও সকাল হওয়ার পর আবার সংকট দেখা দিচ্ছে। ফলে চালকদের একেকটি গাড়িতে গ্যাস নিতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
তেজগাঁওয়ের আকিজ সিএনজি ফিলিং স্টেশনের বিক্রয়কর্মী তারেক জানান, রাত সাড়ে ৯টার দিকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে তারা গাড়িতে গ্যাস দেয়া শুরু করেন। কিন্তু ভোরের পর থেকে আবার চাপ কমে যায় এবং অনেক সময় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। চালকদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে তাদের দৈনিক আয় ব্যাপকভাবে কমে গেছে। একজন সিএনজি অটোরিকশাচালকের জন্য দিনের কয়েক ঘণ্টা যদি শুধু গ্যাস সংগ্রহেই চলে যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবে যাত্রী পরিবহনের সময় কমে যায়। এতে আয় কমলেও গাড়ির মালিকের জমা, জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ বহন করতে হচ্ছে।
গণপরিবহন খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গ্যাসের অপেক্ষায় অনেক বাস ও সিএনজি
অটোরিকশা ফিলিং স্টেশনে আটকে থাকায় বিভিন্ন রুটে যানবাহনের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে অফিসের সময় যাত্রীরা যানবাহনের সংকটে পড়ছেন। কেউ অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে বিকল্প পরিবহন ব্যবহার করছেন, আবার কেউ দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর বাধ্য হয়ে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছেন।
ফিলিং স্টেশন মালিকদের দাবি, গ্যাসের চাপ কম থাকায় তাদের যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। কম চাপের মধ্যে কমপ্রেসর চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অনেক সময় বাধ্য হয়ে সরবরাহ সীমিত রাখতে হচ্ছে। ফলে একটি স্টেশন থেকে যে পরিমাণ গাড়িতে স্বাভাবিক সময়ে গ্যাস দেয়া সম্ভব হয়, বর্তমানে তার অর্ধেকের কাছাকাছি গাড়িতেও সেবা দেয়া যাচ্ছে না।
জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিএনজি সরবরাহ ব্যবস্থা সরাসরি নির্ভর করে জাতীয় গ্রিডের গ্যাস পরিস্থিতির ওপর। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও আবাসিক খাতের চাহিদার পাশাপাশি সিএনজি খাতেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ প্রয়োজন। কোনো একটি খাতে সরবরাহ কমে গেলে তার প্রভাব দ্রুত অন্য খাতেও ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, চলমান গ্যাস সংকট দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে স্বাভাবিক হবে। গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, বর্তমানে ফ্রিজিং প্রক্রিয়ার কারণে কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ প্রক্রিয়া শেষ হলে বিকাল থেকে গ্যাস সঞ্চালন আবার শুরু হবে এবং ধীরে ধীরে চাপ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে। তিনি বলেন, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হওয়ার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে কিছুটা সময় লাগবে। পর্যায়ক্রমে উত্তোলন ও সরবরাহ বাড়ানো হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, আশ্বাসের পরও কেন বারবার গ্যাস সংকট তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে ব্যবধান রয়েছে, তা সমাধান না হলে সাময়িক পদক্ষেপে সংকট পুরোপুরি দূর হবে না। গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানি সক্ষমতা বাড়ানো এবং সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য জরুরি।
রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে এই জ্বালানি সংকট। চালক, পরিবহন মালিক ও যাত্রীরা এখন অপেক্ষায়- কবে স্বাভাবিক হবে গ্যাস সরবরাহ, কবে শেষ হবে দীর্ঘ লাইনের দুর্ভোগ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপই পারে এই সংকট থেকে নগরবাসীকে স্বস্তি দিতে।
