×

প্রথম পাতা

আত্রাইয়ে শোকের মাতম

রিয়াদে আগুনে ১৬ বাংলাদেশি নিহত

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ঋণের বোঝা শোধ করে বাড়ি করার স্বপ্ন ছিল মোহন-সুমনের। কেউ ফিরবেন বিয়ের আশায়, কেউ চেয়েছিলেন পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে। তবে রিয়াদের একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ আগুন মুহূর্তেই নিভিয়ে দিল সেই সব স্বপ্ন। প্রাণ হারালেন ১৬ বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে ১৩ জনই নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বাসিন্দা।

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের শিফা থানা এলাকার মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় গত রবিবার দুপুরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি নিহত হন। স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার অভিযান শেষে ১৬টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কারখানাটিতে মোট ১৭ জন বাংলাদেশি কর্মী ছিলেন। তাদের মধ্যে হাবিবুর রহমান হাবিব নামে একজন ঘটনার সময় চুল কাটাতে সেলুনে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। নিহতদের মধ্যে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ১৩ জন, নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দুজন ও রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার একজন রয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো। প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হওয়া নিহতদের মধ্যে আত্রাই উপজেলার ১৩ জন হলেন- গণ্ডগোহালী গ্রামের মো. রুবেল প্রামাণিক, একই গ্রামের মো. কলিমউদ্দিন, একই গ্রামের মো. মোহন, একই গ্রামের মো. সুমন, খরস্রোতা গ্রামের মজিদুল, একই গ্রামের আবদুল জলিল, উজানপই গ্রামের ফরিদ, ডুবাই গ্রামের শুভ, একই গ্রামের সুমন, বোয়ালা গ্রামের হৃদয়, নওগাঁ গ্রামের শাহিন, সাদনগর গ্রামের সাগর ও একই উপজেলার মিনহাজ। নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার নিহত দুজন হলেন দিঘীরপাড় গ্রামের শামীম ও খাজুরা গ্রামের সাব্বির আর রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার মরুগ্রামের শ্যামল।

দুই ভাইয়ের বাড়ি ফেরা হলো না : আত্রাই উপজেলার গণ্ডগোহালী গ্রামের গুফফার প্রামাণিকের দুই ছেলে মোহন ও সুমন ছিলেন নিহতদের মধ্যে। পরিবারের সচ্ছলতার আশায় প্রায় ৭ বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমান মোহন। দুই বছর আগে ছোট ভাই সুমনকেও সেখানে নিয়ে যান তিনি। একই কারখানায় কাজ করতেন দুই ভাই, থাকতেনও একসঙ্গে। পরিবারের ঋণের বোঝা শোধ করে একটি ভালো বাড়ি করার স্বপ্ন দেখছিলেন তারা। বাবা আব্দুল গাফফারকে মোহন বলেছিলেন, দেশে ফিরে বাড়ির কাজ শেষ করবেন। বিয়ে করে সংসারও শুরু করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। দুই ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে তাদের বাবা-মায়ের বাড়িতে এখন শুধু আহাজারি। দুই ছেলের ছবি বুকে নিয়ে বাবা আব্দুল গাফফার বিলাপ করে বলেন, ছেলেরা কোনোদিন ছুটিতে বাড়ি আসেনি। কষ্ট করে দেনা শোধ করছিল, বাড়ি বানানোর পরিকল্পনা করছিল। এবার আর তারা বাড়ি ফিরল না। মমোহন-সুমনের বোন আদরী বেগমের কাছেও ভাইয়ের শেষ ফোনকল এখন শুধুই স্মৃতি। তার ভাষ্য, গত রবিবার দুপুর ১টার দিকে মোহন ফোন করেছিলেন। ফোন ধরতে একটু দেরি হওয়ায় ভাই রাগ করেছিলেন। সেই ফোনই যে শেষ ফোন হবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি তিনি।

বিয়ের স্বপ্ন ছিল কলিমেরও : একই গ্রামের বজলুর প্রামাণিকের ছেলে কলিম উদ্দিনও নিহত হয়েছেন এই অগ্নিকাণ্ডে। তার পরিবারেও চলছে শোকের মাতম। কলিমের মা ছেলের ছবি বুকে নিয়ে কাঁদছেন। ছেলে এবার দেশে ফিরে বিয়ে করবেন- এমন প্রত্যাশাই ছিল পরিবারের। কিন্তু সেই অপেক্ষা এখন পরিণত হয়েছে সন্তানের মরদেহ শেষবার দেখার আকুতিতে। শুধু গণ্ডগোহালী নয়, আত্রাই উপজেলার আরো বহু গ্রামে এখন একই দৃশ্য। প্রবাসে থাকা স্বজনের উপার্জনের ওপর নির্ভর করে যেসব পরিবার ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছিল, এক দুর্ঘটনায় সেসব পরিবারের স্বপ্ন যেন থমকে গেছে।

১৭ জনের মধ্যে বেঁচে গেলেন একজন : বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় কারখানাটিতে ১৭ জন বাংলাদেশি কর্মী ছিলেন। তাদের মধ্যে একমাত্র হাবিবুর রহমান হাবিব বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। হাবিবুর জানান, ওইদিন দুপুর দেড়টার দিকে তিনি চুল কাটাতে সেলুনে গিয়েছিলেন। পরে ফিরে এসে দেখতে পান কারখানায় আগুন জ্বলছে। এরপরই জানতে পারেন ভেতরে থাকা অন্য কর্মীরা কেউ বেঁচে নেই। কারখানাটির কর্মীরা নিজেরাই সেখানে আসবাব তৈরি ও বিক্রির কাজ করতেন বলে জানা গেছে।

আগুনের সূত্রপাত শর্টসার্কিট থেকে : সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রাথমিক তথ্যে বলা হয়েছে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ৮ জন সরাসরি আগুনে পুড়ে মারা যান। অন্যরা কালো ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যান। গত রবিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টার দিকে আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। স্থানীয় সময় রাত ১১টার দিকে অভিযান শেষ হয় ও ১৬টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

মরদেহ দেশে ফেরাতে সরকারের উদ্যোগ : নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করছে। পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর পরিবারের সম্মতি অনুযায়ী মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, নিহত ১৩ জনের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। নিহতদের প্রত্যেক পরিবারের জন্য ৩ লাখ টাকা করে সহায়তা দেয়ার প্রক্রিয়াও চলছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নিহতদের পরিচয় যাচাইসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর শোক, দ্রুত মরদেহ ফেরানোর নির্দেশ : রিয়াদে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল সোমবার দেয়া এক শোকবার্তায় তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান ও প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানান, প্রধানমন্ত্রী ঘটনাটির সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং রিয়াদে বাংলাদেশ মিশনকে সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা, আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা ও মরদেহ দেশে ফেরানোর বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে দূতাবাস।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

১২ শিক্ষার্থীর ১৩ শিক্ষক, এসএসসিতে পাস মাত্র ১ জন

১২ শিক্ষার্থীর ১৩ শিক্ষক, এসএসসিতে পাস মাত্র ১ জন

শেখ হাসিনাকে ঘিরে নতুন সমীকরণে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক

টেলিগ্রাফের সম্পাদকীয় শেখ হাসিনাকে ঘিরে নতুন সমীকরণে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক

দুই বছরেও ধরা পড়েনি পলাতক ৩৪৫ বন্দি, উদ্ধার হয়নি ১১৪৩ গুলি

শেরপুর কারাগার দুই বছরেও ধরা পড়েনি পলাতক ৩৪৫ বন্দি, উদ্ধার হয়নি ১১৪৩ গুলি

সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের মৃত্যুদণ্ড

মানবতাবিরোধী অপরাধ সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের মৃত্যুদণ্ড

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App