গণিত-ইংরেজিতে ফলের পতন
পাসের হার ১৯ বছরে সবচেয়ে কম
সেবিকা দেবনাথ
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
‘মন চায় উড়তে উড়তে...’। এসএসসির ফলাফলে প্রত্যাশিত সাফল্যে এভাবেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন ভিকারুন নিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা -ভোরের কাগজ
মাধ্যমিক বা এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন। কোথাও আনন্দ, কোথাও হতাশা। কেউ জিপিএ-৫ পাওয়ার উচ্ছ্বাসে ভাসছে, আবার কারো হাতে ফলের কাগজ-একটি বা দুটি বিষয়ে ‘এফ’। প্রতিবছর ফল প্রকাশের পর একই প্রশ্ন ফিরে আসে, কোন বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা বেশি ফেল করছে? সাম্প্রতিক বছরগুলোর ফল বিশ্লেষণ করলে উত্তরটি প্রায় একই-গণিত ও ইংরেজি।
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায়ও সেই পুরনো চিত্র বদলায়নি। এবার দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকাশিত ফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গণিত ও ইংরেজিতে তুলনামূলকভাবে দুর্বল ফলই সামগ্রিক ফলকে নিচের দিকে টেনে এনেছে। তবে বিষয়টি শুধু ‘শিক্ষার্থীরা পড়েনি’-এমন সরল ব্যাখ্যায় শেষ করার সুযোগ নেই। কারণ একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটছে বছরের পর বছর। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছিল ৬৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে। তখনো শিক্ষা কর্মকর্তারা গণিতে, বিশেষ করে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের দুর্বল ফলকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তারা আরো বলছেন, ২০২৬ সালের ফলের আরেকটি দিক আরো গুরুত্বপূর্ণ। আইসিটি, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন কিংবা উচ্চতর গণিতের মতো তুলনামূলক কঠিন বিষয়েও অনেক বোর্ডে পাসের হার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশের ওপরে। অথচ সাধারণ গণিত ও ইংরেজিতে বড় একটি অংশ পাসের সীমা পার করতে পারছে না। এ বৈপরীত্যই প্রশ্ন তোলে-সমস্যাটি কি কেবল বিষয়গুলোর কঠিনত্বে, নাকি শেখানোর পদ্ধতি ও শিক্ষাব্যবস্থার গভীরে?
পাসের হার ১৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম : প্রকাশিত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। ২০০৭ সালের পর আর কখনো এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার এত কম ছিল না। অর্থাৎ ১৯ বছরের সবচেয়ে কম পাসের হার। ২০০৭ সালে ৫৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছিল। ২০০৮ সালে পাসের হার ছিল ৭০ দশমিক ৮১ শতাংশ, ২০০৯ সালে ৬৭ দশমিক ৪১ শতাংশ, ২০১০ সালে ৭৮ দশমিক ১৯ শতাংশ, ২০১১ সালে ৮২ দশমিক ১৬ শতাংশ, ২০১২ সালে ৮৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ, ২০১৩ সালে ৮৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৯১ দশমিক ৩৪ শতাংশ, ২০১৫ সালে ৮৭ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৮৮ দশমিক ৭০ শতাংশ, ২০১৭ সাল ৮০ দশমিক ৩৫ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৭৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ, ২০১৯ সালে ৮২ দশমিক ২০ শতাংশ, ২০২০ সালে ৮২ দশমিক ৮৭ শতাংশ, ২০২১ সালে ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ (করোনার বছরে অটোপাস), ২০২২ সালে ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ, ২০২৫ সালের ৬৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।
তবে শিক্ষা উপদেষ্টা ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর কর্মকর্তাদের দাবি, এটিই প্রকৃত ফল। বিগত ১৬ বছর আওয়ামী লীগের শাসনামলে ফলাফল ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হতো। ফল প্রকাশের একদিন আগেও শিক্ষা উপদেষ্টা গণমাধ্যমকে এমন বক্তব্য দেন। কাউকে বাড়তি নম্বর বা গ্রেস মার্কস না দেয়ায় ‘প্রকৃত ও সত্য’ ফল উঠে এসেছে বলে দাবি বোর্ড কর্মকর্তাদের।
সংখ্যার ভেতরের গল্প : এই ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হলো- এ বছর সব বোর্ডে তুলনামূলক ইংরেজি এবং গণিতে সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করেছে। অপরদিকে সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী কৃতকার্য হয়েছে আইসিটি বিষয়ে। ২০২৬ সালের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইংরেজিতে ময়মনসিংহ বোর্ডে পাসের হার মাত্র ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৩৩ জন
ইংরেজিতে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। গণিতে একই বোর্ডে পাসের হার ৬৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে ৩০ জন গণিতে উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
এ বছর ঢাকা বোর্ডে ইংরেজি এবং গণিতে যথাক্রমে ৭৮ দশমিক ৪০ এবং ৮২ দশমিক ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কৃতকার্য হয়েছে। রাজশাহী বোর্ডে ইংরেজি এবং গণিতে যথাক্রমে ৭৪ দশমিক ৭ এবং ৭৭ দশমিক ১৭, কুমিল্লা বোর্ডে ইংরেজি এবং গণিতে যথাক্রমে ৮১ দশমিক ২৯ এবং ৮১ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যশোর বোর্ডে ইংরেজি এবং গণিতে যথাক্রমে ৭১ দশমিক ৮৪ এবং ৮৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ, চট্টগ্রাম বোর্ডে ইংরেজি এবং গণিতে যথাক্রমে ৭২ দশমিক ২৭ এবং ৮০ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, বরিশাল বোর্ডে ইংরেজি এবং গণিতে যথাক্রমে ৬৯ দশমিক ২৪ এবং ৭৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ, সিলেট বোর্ডে ইংরেজি এবং গণিতে যথাক্রমে ৬৯ দশমিক ১১ এবং ৭৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ, দিনাজপুর বোর্ডে ইংরেজি এবং গণিতে যথাক্রমে ৭২ দশমিক ৯১ এবং ৭১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজি এবং গণিতে যথাক্রমে ৬৬ দশমিক ৬৪ এবং ৬৯ দশমিক ৬১ শতাংশ, মাদ্রাসা বোর্ডে ইংরেজি এবং গণিতে যথাক্রমে ৭৯ দশমিক ২১ এবং ৬৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ, কারিগরি বোর্ডে ৯৪ দশমিক ৭৯ এবং ৭০ দশমিক ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী কৃতকার্য হয়েছেন। অপরদিকে আইসিটিতে সব বোর্ডে সর্বেচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী কৃতকার্য হয়েছে।
এই ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যদি গণিত বা ইংরেজির প্রশ্নই মূলত অস্বাভাবিক কঠিন হতো, তাহলে সব বোর্ডেই প্রায় একই ধরনের ফল হওয়ার কথা। কিন্তু শহর ও গ্রাম, অঞ্চল ও প্রতিষ্ঠানভেদে পার্থক্য দেখাচ্ছে-শিক্ষার্থীর শেখার পরিবেশ, শিক্ষক, বিদ্যালয়ের সক্ষমতা ও পারিবারিক সহায়তার সঙ্গে ফলাফলের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
অন্যদিকে আইসিটিতে এবার অধিকাংশ বোর্ডে পাসের হার ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশ। পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নেও অধিকাংশ বোর্ডে পাসের হার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশের ওপরে এবং উচ্চতর গণিতে সব বোর্ডে পাসের হার ৯০ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ ‘বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় দুর্বল’-এমন সার্বিক সিদ্ধান্তও টেকে না। তারা কিছু বিষয়ে ভালো করছে, আবার কিছু বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। সমস্যাটি বিষয়ভিত্তিক এবং কাঠামোগত।
কেন গণিত এত কঠিন হয়ে উঠছে?
গণিতের প্রথম সমস্যা হচ্ছে ভিত্তি। প্রাথমিক পর্যায়েই যদি সংখ্যা, ভগ্নাংশ, শতকরা, অনুপাত, চার প্রক্রিয়া বা মৌলিক যুক্তি ঠিকমতো আয়ত্ত না হয়, তাহলে ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণিতে বীজগণিত ও জ্যামিতি, আর অষ্টম-নবম শ্রেণিতে জটিল সমস্যা সমাধানে গিয়ে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ে। সরকারের মাধ্যমিক শিক্ষা সংস্কারবিষয়ক পর্যালোচনা কমিটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে গণিত ও বিজ্ঞানে শিক্ষার্থীদের সামনে মৌলিক হিসাব থেকে দ্রুত বীজগাণিতিক চিন্তায় যাওয়ার চাপ তৈরি হয়। অথচ অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিক পর্যায় থেকেই প্রয়োজনীয় সংখ্যাজ্ঞান ও গাণিতিক ভিত্তি নিয়ে মাধ্যমিকে প্রবেশ করতে পারে না। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, শ্রেণিকক্ষে এখনো মুখস্থনির্ভর পাঠদান এবং শিক্ষার্থীর প্রস্তুতির স্তর অনুযায়ী আলাদা সহায়তার ঘাটতি রয়েছে। এখানেই একটি বড় প্রশ্ন- যে শিক্ষার্থী সপ্তম শ্রেণিতে এসে ভগ্নাংশের ধারণা নিয়ে সমস্যায় আছে, তাকে নবম শ্রেণিতে শুধু ‘আরো বেশি অঙ্ক করতে হবে’ বললেই কি সমস্যার সমাধান হবে? উত্তরটা হলো- হবে না। কারণ গণিত মূলত ধারাবাহিক জ্ঞান। আগের ধাপের ঘাটতি পরের ধাপে জমা হয়। একটি সূত্র না বোঝার সমস্যা কয়েক মাস পর একটি অধ্যায়, পরে একাধিক অধ্যায় এবং শেষ পর্যন্ত পুরো বিষয়টির প্রতি ভয় তৈরি করতে পারে। এই ভয়কে শিক্ষাবিজ্ঞানের ভাষায় গণিত-ভীতি বলা হয়। বাংলাদেশেও মাধ্যমিক পর্যায়ে গণিতে ধারাবাহিকভাবে খারাপ করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতভীতির উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা হয়েছে। ঢাকার একটি বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণির দুর্বল ফল করা ১২২ শিক্ষার্থীকে নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থীর উচ্চ মাত্রার গণিতভীতি পাওয়া গিয়েছিল। ফলে পরীক্ষার হলে একটি অঙ্ক না পারা শুধু একটি প্রশ্ন না পারার ঘটনা থাকে না। তা পরের প্রশ্নেও আত্মবিশ্বাস নষ্ট করতে পারে।
প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ, সমস্যা সমাধান কোথায়?
গণিতের আরেকটি বড় সংকট হলো অনুশীলনের ধরন। অনেক শিক্ষার্থী অঙ্কের ‘প্রক্রিয়া’ মুখস্থ করে। একটি নির্দিষ্ট ধরনের প্রশ্নের জন্য নির্দিষ্ট সূত্র বা ধাপ শেখে। কিন্তু প্রশ্নের ভাষা বা কাঠামো সামান্য বদলে গেলে কোথা থেকে শুরু করবে, সেটিই বুঝতে পারে না। এখানে পরীক্ষাকেন্দ্রিক কোচিং সংস্কৃতিরও ভূমিকা রয়েছে। ‘কমন’ প্রশ্ন, সাজেশন, গুরুত্বপূর্ণ অঙ্ক- এসবের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা শিক্ষার্থীর সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা তৈরি করে না। বরং পরীক্ষায় পরিচিত কাঠামো না এলে সে বিপাকে পড়ে। সরকারের সাম্প্রতিক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে শিক্ষা ওয়াচ-এর শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক স্তরে মুখস্থনির্ভর শিক্ষা এখনো ব্যাপক এবং বিভিন্ন সক্ষমতার শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজনীয় আলাদা সহায়তা সীমিত। অর্থাৎ গণিতে ফেলকে শুধু ‘ছাত্রের অলসতা’ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা আড়াল হয়ে যায়।
ইংরেজির সংকট আরো গভীরে :
ইংরেজির সমস্যা আরো জটিল। কারণ এটি শুধু একটি পরীক্ষার বিষয় নয়; একই সঙ্গে এটি ভাষা। ভাষা শেখার জন্য নিয়মিত শোনা, বলা, পড়া ও লেখার অনুশীলন প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের বড় অংশের শিক্ষার্থীর ইংরেজির সঙ্গে কার্যকর ব্যবহারিক যোগাযোগের সুযোগ খুব সীমিত। শ্রেণিকক্ষে ইংরেজি শেখানো অনেক সময় গ্র্যামার রুল, প্যারাগ্রাফ, অ্যাপ্লিকেশন বা নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে পরীক্ষার খাতায় পরিচিত প্রশ্ন এলে শিক্ষার্থী লিখতে পারে; কিন্তু নতুন কিছু থাকলেই বা নিজের ভাষায় উত্তর লেখার প্রয়োজন হলে সমস্যা হয়।
ফল প্রকাশের দিন নয়, নজর দিতে হবে শুরুতেই :
সমাধান যদি সত্যিই করতে হয়, তাহলে এসএসসি ফল প্রকাশের দিন গণিত ও ইংরেজিতে কতজন ফেল করেছে- সেই সংখ্যা গোনার পাশাপাশি আরো কয়েকটি সংখ্যা নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। কত স্কুলে গণিতের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই? কত স্কুলে ইংরেজির শিক্ষক নেই? কত শিক্ষার্থী ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার সময় মৌলিক গণিতে দুর্বল? কত শিক্ষার্থী অষ্টম শ্রেণিতে একটি অনুচ্ছেদ পড়ে নিজের ভাষায় উত্তর লিখতে পারে না? কত স্কুলে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ক্লাসের ব্যবস্থা আছে? এই তথ্যগুলো না থাকলে ফলাফল কেবল একটি রিপোর্ট কার্ড হয়ে থাকবে; শিক্ষার রোগ নির্ণয়ের উপায় হবে না। কারণ গবেষণার তথ্য বলছে, এসএসসি পরীক্ষার দিন যে ‘ফেল’ দেখা যাচ্ছে, তা অনেক সময় ষষ্ঠ, সপ্তম কিংবা অষ্টম শ্রেণিতেই সূত্রপাত হয়। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়েভ ফাউন্ডেশনের ২০২৩ সালে করা একটি জরিপে দেখা যায়, প্রাথমিকের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ১৩ দশমিক ৬২ শতাংশ শিশু গণিত বিষয়ে একক অঙ্কবিশিষ্ট সংখ্যা শনাক্ত করতে পারে না। আর প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠ্য বইয়ের দুটি বিয়োগ ও দুটি ভাগ সমস্যার সমাধান করতে পারে না পর্যায়ক্রমে ৭৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ ও ৯৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ শিশু। শুধু বেসরকারি সংস্থার তথ্যই নয়, শিক্ষার্থীদের এ দুর্বলতার তথ্য উঠে এসেছে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সরকারি প্রতিবেদনেও। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ দুই বছর পর পর জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সর্বশেষ এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয় ২০২২ সালে। সে তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ৩৯ শতাংশ গণিতে শ্রেণি বিবেচনায় কাক্সিক্ষত মাত্রায় দক্ষতা অর্জন করেছে। আর পঞ্চম শ্রেণির ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৩০ শতাংশ।
মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত জাতীয় মূল্যায়নের তথ্যও সেই কথাই বলছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অব সেকেন্ডারি স্টুডেন্টস ২০২৩-এ প্রায় ৩০ হাজার করে অষ্টম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী, মোট ৯৯৯টি স্কুল ও মাদ্রাসা থেকে অংশ নেয়। ওই মূল্যায়নে ২০১৯ সালের তুলনায় অষ্টম শ্রেণির গণিতে দুর্বল শিক্ষার্থীর অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে; ২০১৯ সালে যেখানে ২২ শতাংশের কিছু বেশি শিক্ষার্থী দুর্বল শ্রেণিতে ছিল, ২০২৩ সালে তা ৪৭ শতাংশে পৌঁছায়। অর্থাৎ এসএসসি পরীক্ষার দিন যে ‘ফেল’ দেখা যাচ্ছে, তার শিকড় অনেক সময় ষষ্ঠ, সপ্তম কিংবা অষ্টম শ্রেণিতে।
শিক্ষকদের অদক্ষতা ও বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের অভাব :
শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের এ দুর্বলতার অন্যতম কারণ পাঠদানে শিক্ষকদের অদক্ষতা ও বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের অভাব। শিক্ষকদের এ ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) গবেষণা প্রতিবেদনেও। ২০২২ সালে প্রকাশিত ‘মেজারিং টিচারস ইফেকটিভনেস ফর প্রাইমারি টিচার্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, গড়ে মাত্র ১৯ দশমিক ১৪ শতাংশ শিক্ষকের ক্লাস পারফরম্যান্স সন্তোষজনক ছিল। আর মোটামুটি সন্তোষজনক ছিল ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ শিক্ষকের ক্লাস পারফরম্যান্স। ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশের পারফরম্যান্স একেবারেই সন্তোষজনক ছিল না। জরিপে ১২টি জেলার ২৪টি স্কুল থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তাতে শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, পেশাগত দক্ষতা, পড়ানোর ধরন, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, যোগাযোগ দক্ষতা, মূল্যায়ন ও প্রতিক্রিয়াসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হয়েছিল। এসব শিক্ষকের মধ্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী শিক্ষকদের ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ, স্নাতক ডিগ্রিধারী শিক্ষকদের ১৭ দশমিক ১ শতাংশ, এসএসসি কিংবা এইচএসসি পাস ১৮ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষকের শ্রেণি পারফরম্যান্স সন্তোষজনক ছিল। এর আগে ২০১৯ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ইংরেজি ও গণিত শিক্ষার পরিস্থিতি নিয়ে দুটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল নেপ। এসব প্রতিবেদনেও শিক্ষার্থীদের এ দুই বিষয়ে দুর্বলতার বিষয়টি উঠে আসে। এসব দুর্বলতার অন্যতম কারণ হিসেবে শিক্ষকদের দক্ষতার ঘাটতিকেই চিহ্নিত করা হয়। ‘ইফেকটিভনেস অব লেসন স্টাডি: এ কেস অব এনহ্যান্সিং কোয়ালিটি অব ম্যাথমেটিকস টিচিং লার্নিং ইন দ্য প্রাইমারি এডুকেশন অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে অংশ নেয়া গণিত শিক্ষকদের শতভাগই গণিত বিষয়ে পাঠদানকে কঠিন বলে মত দিয়েছিলেন। জরিপে অংশ নেয়া সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও ইউআরসি ইনস্ট্রাক্টরদের শতভাগই বলেছেন, শিক্ষকরা গণিতে পাঠদানের ক্ষেত্রে ডিফিকাল্টি অনুভব করেন।
একই বছর ‘উইকনেস অব গ্রেড থ্রি স্টুডেন্টস ইন ইংলিশ: কজেস অ্যান্ড রেমেডিস’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে নেপ। ওই প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার কারণ হিসেবে যেসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল শিক্ষকদের দক্ষতার সীমাবদ্ধতা। জরিপে অংশ নেয়া বেশির ভাগ শিক্ষক জানিয়েছিলেন তাদের ইংরেজি উচ্চারণ এবং শব্দভাণ্ডারের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
শিক্ষক সংকটও বড় কারণ :
২০২৫ সালের বাংলাদেশ এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি শিক্ষকের সংখ্যা ৭৪ হাজার ৪৬৪ থেকে কমে ৫৯ হাজার ৭৯১ হয়েছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানসংখ্যা ১৯ হাজার ৭০ থেকে বেড়ে ২০ হাজার ৬৩১ এবং শিক্ষার্থীসংখ্যা বেড়ে প্রায় ৯০ লাখে পৌঁছেছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থী বেড়েছে, কিন্তু ইংরেজি শিক্ষকের সংখ্যা কমেছে। গণিত শিক্ষকের সংখ্যাও একই সময়ে ৬৩ হাজার ৩১৪ থেকে কমে ৬১ হাজার ৭০৭ হয়েছে। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা। কয়েক বছর আগের সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছিল, মাধ্যমিক পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক ইংরেজি শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিকে মূল বিষয় হিসেবে পড়েননি। গণিতের ক্ষেত্রেও বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের অনুপাত ছিল কম। অবশ্য পুরনো এই তথ্যকে বর্তমানের সরাসরি পরিসংখ্যান হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু সমস্যাটি যে নতুন নয়, সেটিই এর গুরুত্ব বাড়ায়। ২০২৫ সালের বিশ্লেষণে শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা শিক্ষকসংকট, নিয়োগে প্রশাসনিক জটিলতা, কম বেতন-সুবিধা এবং ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে দক্ষ গ্র্যাজুয়েটদের অন্যান্য চাকরির বাজারে চলে যাওয়াকে সংকটের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।
মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা কেন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত?
২০২৬ সালের ফলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবিক বিভাগের বিপর্যয়। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে মানবিক বিভাগের পাসের হার মাত্র ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। বিপরীতে বিজ্ঞানে ৮০ দশমিক ৬৪ এবং ব্যবসায় শিক্ষায় ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। মানবিক বিভাগের ৬ লাখ ১৭ হাজার ৮৮৫ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৩ লাখ ১ হাজার ১৭৪ জন। এর একটি বড় কারণ গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বলতা।
শিক্ষা বোর্ড কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত মানবিক শাখার শিক্ষার্থীরা এ দুই বিষয়ে বেশি অকৃতকার্য হয়েছে। বিশেষ করে মাদ্রাসা থেকে দাখিলে অংশ নেয়া মানবিকের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ও গণিতে বেশি দুর্বল। তারা এ দুটি বিষয়ে ফেল করায় এবার দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে নি¤œমুখী ফল হয়েছে।
মানবিক বিভাগে আসা অনেক শিক্ষার্থী গণিতকে ইতোমধ্যেই ‘নিজের বিষয় নয়’ বলে ধরে নেয়। নবম-দশম শ্রেণিতে গণিতের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আগ্রহ কমে যায়। ইংরেজির ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দেয়। অথচ এসএসসিতে এগুলো বাধ্যতামূলক। ফলে দশম শ্রেণির শেষ দিকে এসে কয়েক বছরের ঘাটতি একসঙ্গে পূরণ করার চেষ্টা শুরু হয়। এটি অনেকটা এমন একজনকে দৌড় প্রতিযোগিতায় নামানোর মতো, যে শুরুতেই কয়েকশ মিটার পিছিয়ে পড়েছে।
দায় একক ভাবে কারো নয় :
বছরের পর বছর ধরে এই ধারায় চলে আসার পেছনে দায় কার- এই প্রশ্নের উত্তরে বিশেষজ্ঞরা মোটা দাগে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করছেন। প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থার দায়। মৌলিক দক্ষতার ঘাটতি শনাক্ত করে সময়মতো পুনরুদ্ধারমূলক শিক্ষা চালু করা হয়নি যথেষ্ট মাত্রায়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক ব্যবস্থার দায়। বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা যায়নি, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তৃতীয়ত, পাঠদানের পদ্ধতির দায়। মুখস্থনির্ভরতা এখনো শক্তিশালী। গণিতে যুক্তি ও সমস্যা সমাধান এবং ইংরেজিতে ব্যবহারিক ভাষাদক্ষতার বদলে পরীক্ষার উত্তর তৈরিতে বেশি জোর দেয়া হয়। চতুর্থত, অভিভাবক ও সমাজের দায়। অনেক পরিবার ফলকে শেখার চেয়ে বড় করে দেখে। ফলে ‘কত নম্বর’ প্রশ্নটি ‘কী শিখল’ প্রশ্নকে সরিয়ে দেয়। পঞ্চমত, কোচিং সংস্কৃতির দায়। কোচিং অনেক শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় ভালো করতে সাহায্য করলেও এর ওপর অতিনির্ভরতা স্কুলের শেখার ঘাটতি ঢেকে রাখতে পারে; সমস্যার মূল সমাধান করে না।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন :
প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষার ভিত। আর মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে এ পর্যায়ে মান নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী। ভোরের কাগজকে তিনি বলেন, আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরেই প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীরা ঘাটতি নিয়ে ওপরের শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হচ্ছে। এ ঘাটতি তৈরির পেছনে বড় কারণ শিক্ষকস্বল্পতা, প্রি-সার্ভিস প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না করা এবং শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধার অভাব। শিক্ষকস্বল্পতার কারণে তারা বেশির ভাগ সময়ই শিক্ষার্থীদের প্রতি প্রয়োজনীয় মনোযোগ ও যতœ নিশ্চিত করতে পারেন না। আবার অনেক সময় শ্রেণিকক্ষের বাইরেও তাদের জরিপ-নির্বাচনী দায়িত্বসহ নানা কাজে নিযুক্ত করা হয়, যা বাড়তি চাপ তৈরি করে এবং শ্রেণি কার্যক্রমে ঘাটতি দেখা দেয়।
প্রি-সার্ভিস প্রশিক্ষণের বিষয়ে গণসাক্ষরতা অভিযানের এ নির্বাহী পরিচালক বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরেই এ প্রশিক্ষণের কথা বলছি। অর্থাৎ শিক্ষক হিসেবে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরুর আগে তাকে প্রশিক্ষিত করা। এতে তিনি প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু ভালোভাবে আয়ত্ত করতে এবং নিজেকে মানসিকভাবে পাঠদানের জন্য উপযুক্ত করতে পারবেন। কিন্তু আমাদের এখানে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় পাঠদান শুরুর পর। তাৎক্ষণিকভাবে দেয়া এসব প্রশিক্ষণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তেমন একটা ফলপ্রসূ হয় না। প্রাথমিক শিক্ষায় মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে হলে আমাদের শিক্ষকদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মেধাবীরা এ পেশায় থাকেন এবং আন্তরিকতার সঙ্গে শিক্ষকতা করেন। একই সঙ্গে প্রি-সার্ভিস প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষকদের শ্রেণি কার্যক্রমের বাইরে অন্য কোনো কার্যক্রমে যুক্ত না করার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফোরাম ফাউন্ডেশনের বাংলাদেশের ন্যাশনাল রিপ্রেজেনটেটিভ মঞ্জুশ্রী মিত্র ভোরের কাগজকে বলেন, গণিত ও ইংরেজিতে ফেল করা শিক্ষার্থীকে ‘দুর্বল’ বলে চিহ্নিত করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। বরং তার পেছনে তাকাতে হবে সে কোথায় শেখা থেকে ছিটকে পড়েছিল। কারণ এসএসসির ফলাফল আসলে দশম শ্রেণির পরীক্ষার ফল হলেও, একজন শিক্ষার্থীর গণিত বা ইংরেজিতে ফেল করার গল্প শুরু হয় অনেক আগেই। ২০২০-২১ সালে করোনা মহামারির সময় দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার প্রভাব বিশেষ করে মৌলিক দক্ষতায় পড়েছিল। এর সঙ্গে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শ্রেণিকক্ষের বিঘœ যুক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালের এসএসসি ফল বিশ্লেষণেও বিশেষজ্ঞরা মহামারি ও শ্রেণিকক্ষে দীর্ঘমেয়াদি বিঘেœর কারণে তৈরি লার্নিং গ্যাপ-এর কথা উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালের ফলকে কেবল করোনার ফল বলা যাবে না। কারণ সমস্যা তারও আগে ছিল এবং এখনো আছে। আজকের ফল তাই শুধু কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর ব্যর্থতার গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার একটি দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতার আয়না। প্রতিবছর ফল প্রকাশের পর আমরা সেই আয়নায় একই ছবি দেখি-গণিত ও ইংরেজিতে লাল দাগ। প্রশ্ন হলো, আগামী বছরও কি আমরা শুধু দাগটি গুনব, নাকি এবার সত্যিই কারণটি খুঁজে ব্যবস্থা নেব?
