রাষ্ট্রদূতকে তলব
মিয়ানমারের বিবৃতি ঢাকার প্রত্যাখ্যান
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সর্বশেষ বিবৃতির বেশ কয়েকটি বিষয় প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ। একইসঙ্গে মিয়ানমার সরকারের দেয়া এ বিবৃতির ব্যাখ্যা চেয়ে ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ কিয়াও সোয়ে মোয়ের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. তৌফিক-উর-রহমান। ঢাকা বলেছে, বিশেষ করে বিবৃতিতে উল্লেখিত জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা নিয়ে দেয়া তথ্যসমূহ ভুল পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। রোহিঙ্গা ইস্যুতে গত ১৫ আগস্ট মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতির প্রসঙ্গ তুলে মহাপরিচালক বলেন, ওই বিবৃতির অনেক বিষয়ই ভুল পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা-সংক্রান্ত তথ্যও রয়েছে। তিনি বলেন, জাতিসংঘের কাছে নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের সংখ্যাই তাদের প্রকৃত সংখ্যা।
এসময় দ্বিপক্ষীয়ভাবে সম্মত নথিপত্র অনুযায়ী বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য মিয়ানমারকে আহ্বান জানান তৌফিক-উর-রহমান। তিনি বলেন, যাচাই প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গা শিবিরে জন্ম নেয়া শিশুদের পাশাপাশি ২০১৭ সালের পর রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক পালিয়ে আসা নতুন রোহিঙ্গাদেরও বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি জানান, বাংলাদেশ বর্তমানে তাদের নিবন্ধন করছে এবং বিদ্যমান ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের হিসাবের বাইরে থাকা রোহিঙ্গাদের তথ্য যথাসময়ে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শেয়ার করা হবে।
মহাপরিচালক মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে যাচাই প্রক্রিয়ায় এসব অতিরিক্ত তথ্য যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানান। তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করা উচিত নয়। তাদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয় রয়েছে, যা এতদিন পর্যন্ত মিয়ানমার কর্তৃপক্ষও স্বীকার করেছে।
তৌফিক-উর-রহমান বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় রাখাইন রাজ্যে তাদের নিজ ভূমিতে প্রত্যাবাসন।
মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত সোয়ে মোয়ে বাংলাদেশ সরকারের উদ্বেগ ও পর্যবেক্ষণ তার দেশের সরকারের কাছে পৌঁছে দেয়ার আশ্বাস দেন। রাষ্ট্রদূত জানান, যাচাই করা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করার লক্ষ্যে মিয়ানমার যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রতিশ্রæতিবদ্ধ।
এদিকে, এদিন দুপুরে ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের সাথে আলোচনার পর এক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গারা বাঙালি, শনিবার মিয়ানমারের দেয়া এমন বিবৃতির সঙ্গে ঢাকা একমত নয়। রোহিঙ্গাদের প্রত্যর্পণে মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, অবশ্যই মিয়ানমারের বিবৃতির সঙ্গে আমরা একমত নই। তাদের নিজেদের একটা আইডেনটিটি আছে, সেই আইডেনটিটি নিয়েই তারা ফেরত যাবে। একটা ভালো পরিবেশে মিয়ানমারের ডিজির সঙ্গে অ্যাম্বাসেডরের আলোচনা হয়েছে। উনি আশ্বস্ত করেছেন যে উনি সরকারের সঙ্গে কথা বলে এই কাজগুলো দ্রুত করবেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ মানবতা ও মানবাধিকার বিবেচনায় ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিল। মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আমাদের যেই যোগাযোগটা আছে, মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আমাদের এক্সচেঞ্জ হচ্ছে, কমিউনিকেশন হচ্ছে কারণ আমরা এই রিপ্যাট্রিয়েশনটা শুরু করতে চাই। শুধু সার্জিও গোর না প্রধানমন্ত্রী যখন চীন সফর করেছিলেন তখন চীন সরকারও আমাদেরকে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে আশ্বস্ত করেছিল যে তারাও মিয়ানমারের সাথে যথেষ্ট পরিমাণ চাপ প্রয়োগ করবে।
প্রসঙ্গত, গত শনিবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, বাংলাদেশ থেকে দেয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ শরণার্থীর একটি তালিকা মিয়ানমার গত জুলাইয়ের শেষ নাগাদ যাচাই-বাছাই করেছে। কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, যাচাই করা ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ ব্যক্তির মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রাখাইন বাসিন্দা ছিলেন।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ ব্যক্তির পরিচয় সফলভাবে যাচাই-বাছাই করা যায়নি। অন্যদিকে ৪ হাজার ২৪১ জন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল বলে সরকার দাবি করেছে। দেশটি রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার বিষয়টিও অস্বীকার করেছে।
