×

রংপুর

বুড়িমারী বন্দরে আমদানি-রপ্তানিতে ধস, কমেছে রাজস্ব আয়

Icon

এস আই সবুজ, পাটগ্রাম (লালমনিরহাট)

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৫ এএম

বুড়িমারী বন্দরে আমদানি-রপ্তানিতে ধস, কমেছে রাজস্ব আয়

ছবি : ভোরের কাগজ

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, আমদানি-রপ্তানিতে নানা বিধিনিষেধ, উচ্চ শুল্ক ও অবকাঠামোগত সমস্যায় লালমনিরহাটের পাটগ্রামের বুড়িমারী স্থলবন্দরে বাণিজ্যে ভাটা পড়েছে। এতে কমেছে সরকারের রাজস্ব আয়। পাশাপাশি স্থলবন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও আয়-রোজগারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বুড়িমারী শুল্ক স্টেশন ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ-ভুটান ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টের আওতায় ভারতের ট্রানজিট রুট ব্যবহার করে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে স্থাপিত হয়। ২০০২ সালের ১২ জানুয়ারি এটি পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরে রূপান্তর করা হয়। ১১ দশমিক ১৫ একর জমির এ বন্দর দিয়ে ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

আরও পড়ুন: অচেনা শহরে হঠাৎ পরিচিত ডাক

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে এখানে আমদানির বড় অংশই পাথরনির্ভর। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বুড়িমারী দিয়ে মোট ২৪ লাখ ৪২ হাজার ৯৯৯ টন পণ্য আমদানি হয়। এর মধ্যে পাথর ছিল ২২ লাখ ৩০ হাজার ৬২৯ টন, যা মোট আমদানির প্রায় ৯১ দশমিক ৩১ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট আমদানি বেড়ে ২৬ লাখ ৮১ হাজার ১০৯ টনে দাঁড়ালেও পাথরের ওপর নির্ভরতা কমেনি। ওই অর্থবছরে পাথর আমদানি হয়েছে ২৪ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৪ টন, অর্থাৎ প্রায় ৯০ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

অন্যদিকে, ভারত থেকে বিভিন্ন কৃষি ও শিল্পপণ্যের আমদানিও কমেছে। নদীর পাথর, চুনাপাথরের বোল্ডার ও টুকরা, ভাঙা পাথর, জিপসাম পাউডার, ডলোমাইট, বড় এলাচ, ফেস ভিনিয়ার, এমএস ব্লেড, সংরক্ষিত ফল, বাদাম, ভোজ্য উদ্ভিজ্জাংশ ও কুইকলাইমসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানি কমেছে।

বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ২০২৫ সালের ১৭ মে ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফরেন ট্রেড (ডিজিএফটি) বাংলাদেশি তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ফল ও কার্বনেটেড পানীয়, তুলা ও তুলার বর্জ্য, প্লাস্টিক-পিভিসি পণ্য এবং কাঠের আসবাব আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে।

আরও পড়ুন: চাকরিজীবীদের জন্য সুখবর, সামনে ৬ দিন সরকারি ছুটি

এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের চ্যাংড়াবান্দা স্থলবন্দর দিয়ে এসব পণ্যের আমদানি বন্ধ হওয়ায় বুড়িমারী দিয়ে রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বুড়িমারী দিয়ে ভারতে ২ লাখ ১ হাজার ৭৩৫ টন পণ্য রপ্তানি হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৬ হাজার ১৬৫ টনে। অর্থাৎ এক বছরে রপ্তানি কমেছে ৬৫ হাজার ৫৭০ টন বা প্রায় ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ।

এদিকে উচ্চ শুল্কের ১৩টি পণ্যের আমদানি নিষেধাজ্ঞা এবং পাথরনির্ভর বাণিজ্যের কারণে ব্যবসা সম্প্রসারণেও বাধা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে গত সাত অর্থবছর ধরে এনবিআরের নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৪৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৮৭ কোটি ৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। ঘাটতি ছিল ৬০ কোটি ৮০ লাখ ৫২ হাজার টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১২৪ কোটি ১১ লাখ ৩ হাজার টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৯০ কোটি ৬৬ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। এ অর্থবছরে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৩ কোটি ৪৪ লাখ ২০ হাজার টাকা।

আরও পড়ুন: নিম্নচাপের প্রভাব, ৪ সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সংকেত

লালমনিরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি সেলিম সবুজ বলেন, যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের প্রভাবে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এর প্রভাব বুড়িমারী স্থলবন্দরের ব্যবসা-বাণিজ্যেও পড়েছে। এতে ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

বুড়িমারী স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান প্রধান রাজু বলেন, ভারতের চ্যাংড়াবান্দা স্থলবন্দরে পাথরের দাম বৃদ্ধি, আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো, ব্যাংক থেকে প্রয়োজনমতো এলসি না পাওয়া এবং সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্য কমেছে।

আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান রুবি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী অজয় কুমার ধর বলেন, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে বুড়িমারী থেকে পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ বেশি হচ্ছে। প্রতিটি গাড়িতে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হওয়ায় ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

বাণিজ্য কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে বন্দরের শ্রমজীবী মানুষের ওপর। পণ্য ওঠানো-নামানোর শ্রমিক মহিদুল ইসলাম বলেন, আগের তুলনায় কাজ অনেক কমেছে। আগে দৈনিক ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা আয় হলেও এখন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। এতে সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে।

বুড়িমারী স্থলবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফারুক হোসেন বলেন, নানা প্রতিবন্ধকতায় ব্যবসা কমেছে। দীর্ঘদিনেও বুড়িমারী স্থল শুল্ক স্টেশনকে কাস্টম হাউস ঘোষণা করা হয়নি। বাণিজ্য সহজীকরণে বুড়িমারী থেকে রংপুরের পায়রাবন্দ পর্যন্ত মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজন।

বুড়িমারী স্থল শুল্ক স্টেশনের সহকারী কমিশনার মতলেবুর রহমান বলেন, বুড়িমারী স্থল কাস্টমস স্টেশনে প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো রয়েছে। উচ্চ শুল্কের ১৩টি পণ্যের আমদানিতে অনুমতি দেওয়া হলে এ বন্দর থেকে আরও বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।

ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ভারত-বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা, আমদানি-রপ্তানির বিধিনিষেধ সহজ করা, সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি সুযোগ বাড়ানো গেলে বুড়িমারী স্থলবন্দর আবারও উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সাবেক মন্ত্রী দীপু মনির স্বামী মারা গেছেন

সাবেক মন্ত্রী দীপু মনির স্বামী মারা গেছেন

বৃষ্টির দিনে চা শ্রমিকদের স্বস্তি, রেইনকোট দিচ্ছে সরকার

বৃষ্টির দিনে চা শ্রমিকদের স্বস্তি, রেইনকোট দিচ্ছে সরকার

চাঁপাইনবাবগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪

চাঁপাইনবাবগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪

বুড়িমারী বন্দরে আমদানি-রপ্তানিতে ধস, কমেছে রাজস্ব আয়

বুড়িমারী বন্দরে আমদানি-রপ্তানিতে ধস, কমেছে রাজস্ব আয়

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App