ইরানকে ধ্বংস করতে ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ‘বাধা’ চীন-রাশিয়া
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর নজিরবিহীন ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েছে তেলের দাম। তবে এই নিষেধাজ্ঞায় ইরানকে কতোটা ধ্বংস করা যাবে তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ ইরানকে একঘরে করার ট্রাম্পের পরিকল্পনা ভন্ডুল করে দিতে পারে চীন ও রাশিয়া। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই তিন দেশ একটি অনানুষ্ঠানিক কৌশলগত অক্ষ বা জোট হিসেবে পরিচিত।
ইতোমধ্যে ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও চাপ নিয়ে সমালোচনা করেছে চীন। গতকাল শুক্রবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘নিষেধাজ্ঞা ও চাপ কোনো সমস্যার সমাধান বয়ে আনবে না।’ এ সময় চীন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি। এছাড়া রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে সমস্যা সমাধানের তাগিদও দেন লিন জিয়ান। এর আগে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর জন্য ট্রাম্পের উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান নেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। সিএনবিসিকে সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় বেসেন্টের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল- এই অভিযানে যোগ দিতে চীনকে চাপ দেয়া হবে কি না? জবাবে বেসেন্ট বলেন, ‘অনেক বিষয়ই ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করা ভালো।’ এরপরই তিনি বেইজিংকে ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অভিযানে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান।
বেসেন্টের মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে মুখপাত্র লিন জিয়ান সব পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন না থাকা যেকোনো একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে চীন।’
অপরদিকে ইরানের ওপর নতুন করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি রাশিয়া। তবে ইরানের ওপর প্রায় ৫০ বছর ধরে একের পর এক কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই দেশটি এসব নিষেধাজ্ঞার মুখে আছে। রুশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বরাবরই এই নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে তেহরানকে সহযোগিতা ও মার্কিন নীতির সমালোচনা করার কথা বলা হয়েছে। ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমা বিশ্লেষক ও
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাশিয়া, চীন ও ইরানকে (উত্তর কোরিয়াসহ) প্রায়শই একটি অনানুষ্ঠানিক কৌশলগত অক্ষ বা জোট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মার্কিন প্রভাব খর্ব করা, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাকে পাশ কাটানো এবং বহুপক্ষীয় বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দেশগুলোর মধ্যে গভীর মিল রয়েছে। পশ্চিমা আধিপত্য ও একক আধিপত্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা ভাঙতে এই দেশগুলো কাজ করে। জ্বালানি বাণিজ্য, প্রযুক্তি বিনিময় এবং যৌথ সামরিক অনুশীলনের মাধ্যমে এরা পরস্পরকে সমর্থন দেয়। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইতোমধ্যে এরা নিজেদের মধ্যে বিকল্প লেনদেন ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
তারা আরো বলছেন, ইরানের দুই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার চীন ও রাশিয়ার ওপর ট্রাম্পের প্রভাব খাটানোর সুযোগ বেশ সীমিত। রাশিয়ার ওপর আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। দেশটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে থেকে নিজেদের কার্যক্রম চালায়। অন্যদিকে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রয়োজনে চীনও বারবার প্রমাণ করেছে যে তারা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা করে না।
এ বিষয়ে আল-জাজিরাকে কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ বলেছেন, ট্রাম্পের জন্য এই চাপ প্রয়োগের কৌশল সফলভাবে বাস্তবায়ন করা ‘খুবই কঠিন হবে’। মাসগ্রেভ আরো বলেন, ‘ট্রাম্প একতরফাভাবে এমন কিছু সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন, যার জন্য সাধারণত বহুপক্ষীয় সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়। এর মানে হলো, এ উদ্যোগে চীন, রাশিয়া ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যকে পাশে পেতে হবে।’
চ্যাথাম হাউসের চীন ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ গবেষক ইউ জিয়ে বলেন, ‘ট্রাম্প যখন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে চান, তখন বেইজিং ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের একটি যুদ্ধবিরতি চায়। চীনা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ও শোধানাগারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করাও কঠিন, কারণ এগুলোর অনেকগুলোই স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয় এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তাদের নির্ভরতা সীমিত। বড় চীনা ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে ক্ষতি হতে পারে, কারণ এর ফলে বেইজিং পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে।’
এর আগে গত বুধবার ইরানের অর্থনীতিকে লক্ষ্য করে নতুন করে অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রæথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘আজ আমি কোনো দেশের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত নেয়া সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ ঘোষণা করছি! এটি হবে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও একঘরে অবস্থা।’
ট্রাম্প হুমকি দিয়ে আরো বলেন, ‘যে দেশ তার আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থাকে ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা দেয়ার সুযোগ দেবে, সেই দেশকেও ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।’
ইরানকে সহায়তা করলে দেশগুলোকে কী ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলেননি ট্রাম্প। ইরান ছাড়া অন্য কোনো দেশের নামও উল্লেখ করেননি তিনি। তবে বেশ কয়েকটি কর্মকাণ্ডের তালিকা দেন ট্রাম্প, যেগুলো তার ভাষায় অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
এর পরের দিন বৃহস্পতিবার সিএনবিসিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, ইরানের ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, ‘আমরা কেন সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হলে নতুন করে বড় সামরিক অভিযান চালানোর আশঙ্কা কমে আসবে।’
বেসেন্ট জানিয়েছেন, আগামী সোমবার সংবাদ সম্মেলনে নতুন নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত তুলে ধরবেন তিনি। কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে, সে বিষয়ে সেদিন জানানো হবে। তিনি বলেন, ‘ইরানের ওপর আমাদের অবরোধ রয়েছে, এবার দেয়া হবে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা।’
তবে তেহরান এমন হুমকিকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ আখ্যা দিয়ে বলেছে, এ ধরনের উদ্যোগ ব্যর্থ হতে বাধ্য। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞায় ইরানের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংকল্পে সামান্যতম পরিবর্তনও আসবে না।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এখনো চড়া রয়েছে। শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪ সেন্ট বা ০.০৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি দাঁড়ায় ৯৩.৮২ ডলারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ৬ সেন্ট বা ০.০৬ শতাংশ কমে ৮৬.৭৮ ডলার হয়।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত প্রায় ছয় মাসে গড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম চড়া থাকায় বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাই বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে এই সংঘাতের একটি স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।
