জামিন পেয়ে ফের ছিনতাইয়ে
আজিজুর রহমান জিদনী
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘবদ্ধ ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সবশেষ যশোরের কেশবপুরে টাকা নিয়ে ফেরার পথে এক মৎস্য খামারের ব্যবস্থাপককে ছিনতাইয়ের চেষ্টা ও কুমিল্লা নগরীতে চুরি-ছিনতাই বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন সেই উদ্বেগেরই প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করেছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। তাদের ভাষ্য, ছিনতাইয়ের ঘটনা অনেক ঘটলেও তার সবগুলো সামনে আসে না। ঝামেলা ও হয়রানির ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগই করেন না। ফলে ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্রও পুরোপুরি উঠে আসে না। তারা আরো বলছেন, ছিনতাইয়ে জড়িত অধিকাংশ দুর্বৃত্তই একাধিক মামলার আসামি ও মাদকসেবী। পুলিশ অনেককে গ্রেপ্তার করলেও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে জামিনে বের হয়ে তাদের ফের একই অপরাধে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। মাদকের লাগাম ও এমন আসামিদের নজরদারিতে রাখা না গেলে ছিনতাইয়ের প্রকোপ কমানো সম্ভব নয়।
গত শুক্রবার রাতে যশোরের কেশবপুরের মধ্যকুল এলাকায় টাকা নিয়ে ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন মৎস্য খামারের ব্যবস্থাপক সত্যজিৎ দেবনাথ। রাত ১০টার দিকে ছয় ছিনতাইকারী তার পথরোধ করে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে সত্যজিৎ ব্যাগটি পাশের মাছের ঘেরের পানিতে ছুড়ে দেন। স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনাস্থলে এগিয়ে এলে ছিনতাইকারীরা ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়াও কুমিল্লা নগরীতে চুরি-ছিনতাই বন্ধ ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে গত শুক্রবার বিকালে টাউন হলের সামনে মানববন্ধন করেছে সচেতন রাজনৈতিক ফোরাম কুমিল্লা। কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নগরীতে চুরি ও ছিনতাই নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে চাকরিজীবীরাও এসব অপরাধের শিকার হচ্ছেন। ছিনতাইকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে বলে তারা উল্লেখ করেন। মানববন্ধনে নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চুরি-ছিনতাই বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া ও অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়। অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল নিরাপদ কুমিল্লা চাই, ভয়মুক্ত কুমিল্লা চাই, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনো’সহ বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড।
পুলিশ সদর দপ্তর ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পরিসংখ্যানে ছিনতাইয়ের জন্য আলাদা কোনো শ্রেণি নেই। এসব মামলা সাধারণত ডাকাতি বা দস্যুতার ঘটনায় নথিভুক্ত হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১ হাজার ৬৭টি ডাকাতির মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ডিএমপি এলাকায় হয়েছে ১৭৮টি। মাসভিত্তিক মামলা হয়েছে ২২ থেকে ৩৩টি। তবে পুলিশের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, এসব পরিসংখ্যান ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না। অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন না। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় ১১৭টি পেশাদার ছিনতাই চক্রের মাধ্যমে ১ হাজার ৩৮৭ জন সক্রিয়
ছিনতাইকারী কাজ করছে। প্রতিটি চক্রে সদস্য রয়েছে প্রায় ১০-২০ জন। তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ওয়ারী বিভাগে- ৩০৮ জন। এরপর তেজগাঁও ও উত্তরা বিভাগে ২৪০ জন করে রয়েছে। সবচেয়ে কম মিরপুরে- ৫৩ জন।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক ভোরের কাগজকে বলেন, অপরাধীরা সুযোগসন্ধানী হয়। সুযোগ পেলেই অপরাধ করে। সুযোগের ফাঁকফোকর বন্ধ করা গেলে অপরাধ কমানো সম্ভব। সাধারণত ছিনতাই ও ডাকাতি আসামিরা বারবার একই অপরাধে জড়ায়। কারণ এ ধরনের অপরাধীরা পরিচিত হয়ে থাকে। তাদের নজরদারিতে রাখা গেলে এ অপরাধ অনেকাংশে দমন সম্ভব। ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ঘটনায়ও আইনানুগ ঝামেলা পড়ার ভয়ে কেউ থানায় যান না। অভিযোগের জায়গাগুলো এখনো জনবান্ধব করতে পারিনি আমরা। তিনি বলেন, এছাড়াও অপরাধ দমনে ন্যারেটিভ পাল্টাতে হবে। ক্রিমিনাল জাস্টিস বলছে শুধু ভুক্তভোগী নয়, অপরাধীরও ন্যারেটিভ দেখতে হবে। তাকে শুধু শাস্তি না, প্রয়োজনে সংশোধন বা সামাজিক বর্জনের মতো বিষয় নিয়েও ভাবতে হবে।
সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরা এলাকায় একটি পেট্রোল পাম্পের ১ কোটি ২১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় সংঘবদ্ধ ছিনতাই চক্রের তৎপরতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত ৯ আগস্ট সকালে ক্রাউন প্লাজা হোটেলের সামনে, র্যাব-১ কার্যালয়ের বিপরীতে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার ১২ দিন পর ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় ৫ জন গ্রেপ্তার রয়েছেন। বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে বিমানবন্দর থানার পুলিশ। এর আগে গত ১১ জুন শেরেবাংলা নগরে ছিনতাইকারীদের হামলায় সোহেলি নামে এক নারী মারা যান। গত ১৯ মার্চ উত্তরায় একটি মেট্রো স্টেশনের কাছে ছিনতাইকারীর কাছ থেকে ব্যাগ রক্ষার চেষ্টার সময় রাস্তায় পড়ে মারা যান গৃহিণী মুক্তা আক্তার। ৭ জুন মতিঝিলের শাপলা চত্বরে মুদ্রা ব্যবসায়ী লোকমানকে গুলি করে ১৭ হাজার মার্কিন ডলার ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিশ্বের অনেক রাজধানীর তুলনায় ডিএমপি এখনো কম জনবল ও সীমিত বাজেট নিয়ে কাজ করছে। ফলে অপরাধ দমনে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমাদের সার্কভুক্ত ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি বা পাকিস্তানের রাজধানীর ইসলামাবাদের তুলনায় ডিএমপির জনবল অনেক কম। ডিএমপির আওতাধীন এলাকায় স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে এখন প্রায় আড়াই কোটি মানুষের বসবাস। সে হিসাবে প্রতি ১ লাখ মানুষের নিরাপত্তায় কাজ করছেন মাত্র ১১৩ জন পুলিশ সদস্য। তিনি বলেন, ছিনতাইয়ের হটস্পট হিসেবে খ্যাত মোহাম্মদপুর জোনে প্রায় ২০ লাখ মানুষের বসবাস। সেখানে যে পরিমাণ পুলিশ প্রয়োজন, তা তুলনায় সংখ্যা অনেক কম। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে থানা ও পুলিশ ফাঁড়ির সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অপরাধ সাংবাদিকতায় তিন যুগের বেশি সময় ধরে কাজ করা সিনিয়র সাংবাদিক পারভেজ খান ভোরের কাগজকে বলেন, ছিনতাই ও টানা পার্টির শিকার হওয়ার পর অধিকাংশ ভুক্তভোগীই নানা ঝামেলার আশঙ্কায় থানায় অভিযোগ করেন না। ফলে এসব ঘটনার বড় একটি অংশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিসংখ্যানের বাইরে থেকে যায়। এতে ছিনতাইয়ের প্রকৃত প্রবণতা বা পরিমাণও স্পষ্টভাবে উঠে আসে না। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ছিনতাইকারীদের একবারে নির্মূল করা সম্ভব নয়। বিশ্বের কোনো দেশেই রাতারাতি এ ধরনের অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। তবে অপরাধীদের নিয়মিত নজরদারির মধ্যে রেখে তাদের সামাজিকভাবে দায়বদ্ধতার জায়গায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
গতকাল শনিবার সন্ত্রাসীদের হামলায় আহত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক, কান ও গলা (ইএনটি) বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুর রহমানকে দেখতে হাসপাতালে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এসময় সন্ত্রাস নির্মূলে পুলিশকে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে মন্তব্য করেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা সন্ত্রাসীদের নির্মূল করতে চাই। ডিএমপি ও মেট্রোপলিটন এলাকায় যারা চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারির সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কার্যক্রম আরো জোরদার করা হবে।
