যুক্তরাষ্ট্রের ‘নতুন’ কৌশলে স্বস্তি মিত্র শিবিরে, কী করবে ইরান?
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
যুদ্ধের তীব্র উত্তেজনার মধ্যে এবার নতুন কৌশলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদক দেশগুলো। এরই ধারাবাহিকতায় রাতের আঁধারে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পাহারায় হরমুজ প্রণালি পার করে তেল সরিয়ে নিচ্ছে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল কোম্পানিগুলো। এছাড়া হরমুজ খুলতে একজোট হয়েছে পশ্চিমারা। এমন পরিস্থিতিতে হরমুজ মার্কিন ভূ-খণ্ড বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এমন কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বিধ্বংসী’ জবাব দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান।
রয়টার্স জানিয়েছে, চলমান উত্তেজনার মধ্যেই হরমুজ প্রণালি সচলের উপায় নিয়ে বৈঠক করেছেন ন্যাটোর শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা। কয়েকদিন আগে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মূলত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে কোন দেশ কী ধরনের সহায়তা দিতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সম্ভাব্য এসব সহায়তা কীভাবে সমন্বয় করা যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হয়। এই বৈঠকের উদ্যোগ নেন ন্যাটোর শীর্ষ কমান্ডার মার্কিন বিমানবাহিনীর জেনারেল অ্যালেক্সাস গ্রিনকেউইচ।
তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়া এড়িয়ে চলতে চাইছে ন্যাটোর সদস্যরা। এর বদলে জোটের বাইরে আলাদা উদ্যোগের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালাচ্ছে পশ্চিমা সামরিক এই জোট। ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে আলাদাভাবে উদ্যোগ নিয়েছে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য। প্রায় এক ডজন দেশকে নিয়ে একটি জোট গঠনের চেষ্টা করছে তারা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা দেয়াই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য বলে জানা গেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তায় জাহাজের অবস্থান শনাক্তকারী ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে রাতের আঁধারে হরমুজ প্রণালি পার করে তেল সরিয়ে নিচ্ছে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল কোম্পানিগুলো। এই কৌশলে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো সরাসরি ইরানি হামলার ঝুঁকি না নিয়ে
পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে ওমান উপসাগরে পৌঁছাচ্ছে। সেখানে অপেক্ষমাণ ক্রেতাদের ট্যাংকারে তেল স্থানান্তর করে দেয়া হচ্ছে। এরপর খালি জাহাজগুলো আবার হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে পারস্য উপসাগরে ফিরে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮০ লাখ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হচ্ছে। পরিমাণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জাহাজের ট্রান্সপন্ডার থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করে ওয়াল স্ট্রিটের তেল বিশ্লেষক ও কেপলারের মতো শিপিং ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠানগুলো যে পরিমাণ তেল পরিবহনের হিসাব দেয়, এর তুলনায় প্রকৃত সরবরাহ প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। অর্থাৎ ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে চলাচল করা জাহাজগুলোর কারণে এতদিন তেল পরিবহনের প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি ধরা পড়ছিল না। এখন নিজেদের তেল পরিবহনের জন্য ট্যাংকার ভাড়া করছে কাতার, সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল কোম্পানিগুলো।
হরমুজ প্রণালিকে পাশ কাটাতে শুধু ডার্ক ট্রানজিটই নয়, তেল পরিবহনের বিকল্প পথও ব্যবহার করছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। সবচেয়ে বড় উদাহরণ সৌদি আরব। দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল, যা সাধারণত পারস্য উপসাগরে অপেক্ষমাণ ট্যাংকারে তোলা হতো, এখন পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পাঠাচ্ছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য তেল উৎপাদক দেশও প্রতিদিন আরো প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে অন্য পথে সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে ইরানের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে তেল রপ্তানির নতুন ব্যবস্থা গড়ে উঠছে। এতে স্বস্তি ফিরেছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র শিবিরে। সিএনএন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। গত শুক্রবার দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় এক সমাবেশে বক্তব্য দেয়ার সময় তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধে আদৌ জিতেছি কিনা, সেটি জানি না। কারণ, আমি এখন হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবেই দেখি।’ হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন পুরো অঞ্চল ও এর ভেতরের স্থলভাগের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে বলেও দাবি করেন ট্রাম্প।
এ সময় ইরানের উদ্দেশ্যে খোঁচা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আজ শুক্রবার রাত। আমাদের হাতে যথেষ্ট সময় আছে। আমার আর কী করার আছে? ফিরে গিয়ে ইরানে আরো একটু বোমা হামলা চালাব?’ ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান চুক্তি করতে অত্যন্ত আগ্রহী। তবে তার মতে, সঠিক চুক্তি করার জন্য এখনো প্রস্তুত নয় তেহরান।’ মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের সুযোগ সীমিত কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘সামনে কী হয়, তা যুক্তরাষ্ট্র দেখছে।’ বক্তব্যের একপর্যায়ে ‘দ্য স্নেক’ কবিতাও আবৃত্তি করেন ট্রাম্প। এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে গার্ডিয়ান।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কয়েক মাস ধরে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটানোর আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। শুক্রবার তিনি বলেছেন, ‘কূটনৈতিক আলোচনায় অচলাবস্থা থাকলেও তেহরান শক্তিশালী অবস্থানে আছে। তাই এখনই যুদ্ধের অবসান ঘটানোই ভালো। পুরো বিশ্ব আমাদের বিজয় স্বীকার করছে এবং জোর দিয়ে বলছে, যুক্তরাষ্ট্র সব ধরনের আইন ও বিধিবিধান লঙ্ঘন করে আমাদের স্কুল, হাসপাতাল ও অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে এবং সারা বিশ্বে ঘৃণিত হয়েছে।’
তেহরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক যুদ্ধ ঘোষণার জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহিকে উদ্ধৃত করে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের জবাব হবে চূড়ান্ত এবং ব্যাপক। স্থল, সমুদ্র, আকাশ, বিমান প্রতিরক্ষা, এমনকি সাইবার হামলা চালাতেও ইরানের বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। নতুন কোনো হুমকি এলে বিধ্বংসী জবাব দেয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত এক বছরে প্রতিরক্ষা অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের উৎপাদন দ্বিগুণ করেছে ইরান। ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজা তালাই-নিকের বরাত দিয়ে শনিবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছে তাসনিম নিউজ।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজা তালাই-নিক বলেন, দেশীয় অস্ত্র ও গোলাবারুদের দ্রুত ও টেকসই উৎপাদন ইরানকে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত সরঞ্জাম দ্রুত প্রতিস্থাপনের সক্ষমতা দিয়েছে। জায়নবাদী শাসনের চাপিয়ে দেয়া ১২ দিনের যুদ্ধের সময় দেশটির কয়েকটি প্রতিরক্ষা-শিল্প স্থাপনায় সীমিত হামলা হলেও ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের বার্ষিক উৎপাদন জুলাই ২০২৫ থেকে জুলাই ২০২৬ সময়ে আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দাবির বিপরীতে ইরানের প্রতিরক্ষা উৎপাদন শুধু অব্যাহতই থাকেনি, বরং যুদ্ধকালীন প্রয়োজনীয় কিছু কৌশলগত ও অগ্রাধিকারমূলক সামগ্রীর উৎপাদন তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে।’ এর বিপরীতে সম্প্রতি গণমাধ্যমের খবর- অস্ত্রভাণ্ডার কমে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পাহারায় সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন হরমুজ প্রণালি পার করে তেল সরিয়ে নিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা সম্ভব কিনা সে বিষয়ে শঙ্কা রয়েছে। কারণ এখানে ইরানের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। মূলত হরমুজ প্রণালির একটি বড় অংশ ইরানের জলসীমার কাছাকাছি। এ নৌপথের নিরাপত্তা ও চলাচল নিয়ে ইরানের ভূরাজনৈতিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ইরানের সম্মতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি সচল করা সম্ভব নয়।
