×

শেষের পাতা

যাদুকাটায় অবাধে অবৈধ বালু উত্তোলন

Icon

মধ্যনগর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

যাদুকাটায় অবাধে অবৈধ বালু উত্তোলন

সীমান্তঘেঁষা সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া যাদুকাটা নদী একসময় ছিল স্বচ্ছ পানি, নির্মাণযোগ্য বালু এবং অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। বর্ষা ও শুষ্ক- দুই মৌসুমেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা ছুটে আসেন এই নদী দেখতে। কিন্তু সেই যাদুকাটা এখন ভয়াবহ সংকটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ ড্রেজারের লাগামহীন ব্যবহারে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বদলে যাচ্ছে, ভাঙছে তীর, বিলীন হচ্ছে বসতভিটা ও কৃষিজমি। প্রশাসনের একাধিক অভিযানও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি।

স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং অনুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে নদীতে প্রতি রাতে শতাধিক দেশীয় ড্রেজার, স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘বোমা মেশিন’, ব্যবহার করে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। নদীর নির্ধারিত সীমানার বাইরে তীর কেটে বালু উত্তোলনের কারণে গত দেড় মাসে বিভিন্ন স্থানে নদীর প্রশস্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীতীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং শত শত বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, অবৈধভাবে পরিচালিত ড্রেজারগুলোর অধিকাংশই রাতের আঁধারে চালানো হয়। ফলে দিনের বেলায় প্রশাসনের অভিযান চালানো হলেও রাতের কর্মকাণ্ড বন্ধ করা যাচ্ছে না। নদীর তলদেশ ও তীর একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিবেশগত ঝুঁকির পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়েছে যোগাযোগব্যবস্থা, কৃষিজমি ও পর্যটনকেন্দ্র।

এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়েও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। অবৈধ ড্রেজার মূলত রাতের বেলায় পরিচালিত হয়। ইতোমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কয়েক দফা অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা করা হয়েছে। এবার পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হয়েছে। এ ধরনের অভিযান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বাজেটও চাওয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্রে দেখা গেছে, যাদুকাটার দুটি বালুমহালের ইজারা নিয়ে বর্তমান ও সাবেক ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক ব্যক্তি যৌথভাবে বিনিয়োগ করেছেন। গত অর্থবছরে দুটি বালুমহালের ইজারা মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১০৬ কোটি টাকা। নথিতে বিভিন্ন ব্যক্তির অংশীদারের হিসাবও উল্লেখ রয়েছে।

নথি অনুযায়ী, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শাহ রুবেল আহমেদ, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন ব্যবসায়ী এবং বিএনপির কয়েকজন স্থানীয় নেতার মধ্যে বিনিয়োগের অংশীদার ছিল। অনুসন্ধানে পাওয়া দলিল অনুযায়ী, এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে ইজারা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, যাদুকাটা নদীতে দুটি বালুমহাল- যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ এবং পৃথকভাবে একটি ফাজিলপুর বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারি রয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে জেলা প্রশাসন দুটি বালুমহাল ইজারা দেয়, অন্যদিকে খনিজসম্পদ বিভাগ পৃথকভাবে বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারির ইজারা দিয়ে থাকে। এই পৃথক ইজারা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করেই দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিরোধ ও আইনি জটিলতা তৈরি হয়ে রয়েছে।

নথিপত্রে দেখা গেছে, যাদুকাটা নদীতে দুটি বালুমহাল এবং একটি বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারি রয়েছে। এর মধ্যে যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহাল ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে জেলা প্রশাসন ইজারা দেয়। অন্যদিকে ফাজিলপুর বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারি ইজারা দেয় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের খনিজসম্পদ বিভাগ।

সরকারি নথি অনুযায়ী, ফাজিলপুর বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারির আয়তন প্রায় ১২১ হেক্টর বা প্রায় ৩০০ একর। এর সীমানা চালিয়াঘাট, পুরান লাউড়, ঘাগটিয়া ও আশপাশের কয়েকটি মৌজা নিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে।

১৪৩২ বাংলা সনের জন্য (১৪ এপ্রিল ২০২৫ থেকে ১৩ এপ্রিল ২০২৬) যাদুকাটা-১ বালুমহালের ইজারা পান তাহিরপুর উপজেলার মেসার্স তাহিন স্টোন ক্রাশারের মালিক নাছির মিয়া। সর্বোচ্চ দর ছিল ৩০ কোটি টাকা। ভ্যাট ও উৎসে করসহ মোট ইজারা মূল্য দাঁড়ায় ৩৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

একই সময়ে যাদুকাটা-২ বালুমহালের সর্বোচ্চ দর ওঠে ৫৫ কোটি টাকা। ভ্যাট ও উৎসে করসহ মোট মূল্য দাঁড়ায় ৬৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এই বালুমহালের ইজারা পান জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি শাহ রুবেল আহমেদ। জেলা প্রশাসনের দরপত্র বাছাই কমিটির সিদ্ধান্তের পর উভয় ইজারাদার আনুষ্ঠানিকভাবে বালুমহাল বুঝে নেন।

নথিতে আরো দেখা গেছে, যাদুকাটা-১ বালুমহালের আয়তন ৮৯ একর ৫৬ শতক এবং যাদুকাটা-২-এর জন্য পৃথক দাগে নির্ধারিত রয়েছে কয়েকশ একর নদী এলাকা। ইজারার ক্ষেত্রে প্রতিটি বালুমহালের সীমানা ও দাগ নম্বর পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৪৩৩ বাংলা সনের জন্য জেলা প্রশাসন নতুন করে দুই বালুমহালের দরপত্র আহ্বান করে। তবে বিদ্যমান ইজারাদাররা হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে নতুন ইজারা কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।

রিটে তাদের দাবি ছিল, এক বছরের জন্য ইজারা পেলেও প্রায় পাঁচ মাস তারা কার্যকরভাবে দখল পাননি। ফলে ওই সময়ের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার সুযোগ দেয়া উচিত। তবে অনুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্রে সময়মতো বালুমহাল বুঝিয়ে দেয়ার তথ্যও রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আদালতে আইনি প্রক্রিয়া চলার পর নতুন ইজারা কার্যক্রম স্থগিত থাকে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট নথি বলছে, ফাজিলপুর বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারির সীমানা নির্ধারণ নিয়েও আগে একটি রিট হয়েছিল। সেই মামলায় আদালত পর্যবেক্ষণ দেন, একই মৌজায় হলেও পৃথক দাগে থাকলে বালুমহাল ও কোয়ারি আলাদা ইজারা হিসেবে বৈধ হতে পারে। পরে উচ্চতর আদালতও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনি জটিলতার সুযোগে নদীর বিভিন্ন অংশে নির্ধারিত সীমার বাইরে ড্রেজার ব্যবহার বেড়ে যায়। এতে নদীর তীর দ্রুত ভাঙতে শুরু করে। বিভিন্ন এলাকায় বসতবাড়ি, কৃষিজমি এবং গ্রামীণ অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়ে।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, যাদুকাটা শুধু বালুর উৎস নয়; এটি সীমান্তাঞ্চলের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, কৃষি ও পর্যটনের অন্যতম ভিত্তি। তাই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও তীর রক্ষায় নিয়মিত নজরদারি এবং কার্যকর আইন প্রয়োগের দাবি তাদের।

এমন পরিস্থিতিতে যাদুকাটা নদীর অব্যাহত ভাঙন ও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল। গত ২৫ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক ডিও লেটারে তিনি উল্লেখ করেন, প্রশাসনের সীমিত অভিযানে স্থায়ী ফল আসছে না। তার ভাষ্য, রাতের অন্ধকারে সংঘবদ্ধভাবে নদীতীর কেটে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকায় যাদুকাটা নদীর তীর, নির্মাণাধীন সেতু, শিমুল বাগান, লাউড়েরগড়, ঘাগটিয়া, ঘরঘাট্টি, বিন্নাকুলি বাজারসহ আশপাশের বহু গ্রাম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

ডিও লেটারে তিনি যাদুকাটা নদীতে নিয়মিত নৌ-পুলিশের বিশেষ টিম মোতায়েন অথবা প্রয়োজন হলে কোস্ট গার্ড নিয়োগের সুপারিশ করেন। তার মতে, কার্যকর ও স্থায়ী নজরদারি ছাড়া নদী রক্ষা সম্ভব হবে না।

এদিকে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, অবৈধ ড্রেজার ব্যবহার ঠেকাতে শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত নয়, সমন্বিত অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণে যৌথ অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি চলছে। এজন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন ও বাজেটও চাওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, বিচ্ছিন্ন অভিযানের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা কঠিন হবে। বিশেষ করে রাতের অভিযানে সক্ষমতা বাড়ানো এবং নদীপথে নিয়মিত টহল জোরদার করার ওপর তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন।

প্রতিবেদনে উত্থাপিত বিষয়গুলো সম্পর্কে বক্তব্য জানতে যাদুকাটা বালুমহালের দুই ইজারাদার নাছির মিয়া ও শাহ রুবেল আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

এ প্রতিবেদন তৈরির শেষ মুহূর্তে জানা গেছে, যাদুকাটা নদীর পাড় কেটে বালু লুটের মামলায় পরিবেশ অধিদপ্তর ২৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেছে। গত সোমবার সুনামগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, আমল গ্রহণকারী আদালতে এই চার্জশিট দাখিল করা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের পরিদর্শক ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম তদন্তকাজ সম্পন্ন করে তাহিরপুর উপজেলার সোহালা গ্রামের আফতাব উদ্দিন (চেয়ারম্যান) (৪০), ঘাঘটিয়া গ্রামের মোশাহিদ হোসেন রানু (রানু মেম্বার) (৩৭), ঢালারপাড় (লাউড়েরগড়) জামাল মিয়া (৫৪), বিল্লাল মিয়া (৪৮), রাজারগাঁও গ্রাতের বোরহান উদ্দিন (৫৪)সহ ২৭ জন আসামির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত-২০১০) এর ধারা ৪(২), ৬(ঙ), ১২ এবং একই আইনের ১৫(১) ধারার টেবিল ক্রমিক নং- ১,৮ ও ১২ বিধানাবলি লঙ্ঘনজনিত অপরাধে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, আমল গ্রহণকারী আদালত, তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ এ চার্জশিট দাখিল করেন।

রানু মেম্বার এর আগেও যাদুকাটা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ঘটনায় কারাভোগ করেছেন।

তবে মামলার এজাহারে নাম থাকলেও ‘অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না মেলার’ কথা জানিয়ে তাহিরপুর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক রাকাব উদ্দিনসহ দশ জনকে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোহাইমিনুল হক বলেন, মামলায় কে বিএনপি বা আওয়ামী লীগ করে সেটা দেখা হয়নি, রাজনৈতিক পরিচয়ে কাউকে আসামি করা হয়নি।

তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। আর যাদের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি, তাদের নাম বাদ দেয়া হয়েছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

রাজধানীতে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড

রাজধানীতে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড

বিশ্বকাপে শেষ আটের লড়াই, কে কার মুখোমুখি

বিশ্বকাপে শেষ আটের লড়াই, কে কার মুখোমুখি

মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করলো ইরান

মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করলো ইরান

আরো এক দফা কমে আজ কত দরে বিক্রি হচ্ছে স্বর্ণ ?

আরো এক দফা কমে আজ কত দরে বিক্রি হচ্ছে স্বর্ণ ?

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App