×

শেষের পাতা

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী

অসাংবিধানিক ঘোষণার আর্জি রিটকারী পক্ষের

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অসাংবিধানিক ঘোষণার আর্জি রিটকারী পক্ষের

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে এবং এর ফলে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছেন রিটকারী পক্ষের আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। তার দাবি পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল করা উচিত।

এদিকে পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল না করে যেসব অংশ মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কেবল সেগুলো বাতিল করে বাকি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার সংসদের ওপর ছেড়ে দেয়ার আর্জি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী। গতকাল মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চে পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার শুনানিতে অংশ নিয়ে তারা এই দাবি জানান। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়ার সঙ্গে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আরশাদুর রউফ। আর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী সাদ্দাম হোসেন, আব্দুল ওয়াদুদ ও জাহিদ বিন আমজাদ। এ মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য বুধবার দিন ধার্য করেছে আদালত।

পুরোপুরি অসাংবিধানিক ঘোষণা করার দাবি শরীফ ভূইয়ার : শুনানীতে শরীফ ভূইয়া বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের সংবিধানের মৌলিক চরিত্র পরিবর্তন করা হয়েছে। তার ভাষায়, এটি সংবিধানের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের

জনবিরোধী সংশোধনী আর না হয় এবং জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা নস্যাৎ করা না যায়, সেজন্য এটি বাতিল হওয়া প্রয়োজন। তবে পুরো সংশোধনী বাতিলের পরও দুটি বিধান বহাল রাখার প্রয়োজনীয়তার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল হয়ে গেলে বিচারকদের জবাবদিহির এই ব্যবস্থাটি আর থাকবে না। সংসদ পুনরায় এটি প্রবর্তন না করা পর্যন্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জনগণের বিচারিক সুরক্ষায় শূন্যতা সৃষ্টি হবে।

তিনি আদালতকে জানান, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনঃঅন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। পাশাপাশি ১০২ অনুচ্ছেদে মানবাধিকার রক্ষায় হাইকোর্টে রিট করার বিষয়ে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, সেটিও বহাল রাখা উচিত। এতে বিচারিক ব্যবস্থায় কোনো আইনি শূন্যতা তৈরি হবে না।

শুনানিতে আরো বলা হয়, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ, যা অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত, তা নিয়ে পৃথক একটি মামলা আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে। তাই এ বিষয়ে বর্তমান মামলায় কোনো রায় না দেয়ারও অনুরোধ জানান রিটকারীপক্ষের আইনজীবী।

নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত সংসদের ওপর ছাড়ার আর্জি শিশির মনিরের : শুনানি শেষে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সংক্রান্ত বিষয়গুলো আদালতের বদলে সংসদে মীমাংসা হওয়ার ওপর জোর দিয়ে শিশির মনির বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতি কি হবে? প্রস্তাবনায় কী থাকবে? অনুচ্ছেদ ৮, ৯, ১০, ১১, ১২ তে কী থাকবে? এবং ২৫ এর ২ এ কী থাকবে? এগুলো মূলত নীতি নির্ধারণী ব্যাপার। আমরা বলেছি নীতি নির্ধারণী ব্যাপারগুলো মূলত সংসদের দায়িত্ব। একটা প্রোপার বিতর্ক করে সাংবিধানিক বিলের মাধ্যমে কোনটা গ্রহণ করবে কোনটা করবে না- এই দায় দায়িত্ব পার্লামেন্টের। আদালতের এখতিয়ার ও ক্ষমতার পৃথকীকরণ তত্ত্বের কথা তুলে ধরে এ আইনজীবী বলেন, আদালতের সেখানে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। আদালত যদি সেই অংশে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে সংসদের যে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা আছে, তা খর্ব করা হয়। আমরা এটাও বলেছি যে আদালতের কখনো সুপার লেজিসলেটরের ভূমিকা পালন করা উচিত নয়। আদালত যদি কোনো নীতিকথা কিংবা কোনো রাজনৈতিক বিষয় সেটেল করতে যায়, তাহলে আদালতকে একটা বড় বিতর্কের সম্মুখীন হতে হয়।

রাজনৈতিক বিষয়গুলো সংসদে সমাধানের ওপর জোর দিয়ে শিশির মনির বলেন, এই বিতর্কে জড়ানো আদালতের কাজ না। এই বিতর্কে কে জড়াবে? এই বিতর্কে জড়াবে সংসদ। সরকারপক্ষ ও বিরোধী দল বিতর্ক করে কোনটা সঠিক কোনটা বেঠিক এটা নির্ধারণ করবে। সেজন্য আমাদের সাবমিশন হল ফান্ডামেন্টাল প্রিন্সিপাল অব স্টেট পলিসি বা নীতিকথা বা মৌলিক বা প্রস্তাবনায় যে সমস্ত পরিবর্তনের সূচনা করা হয়েছিল, এগুলো যেন আদালতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংসদের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়। সংসদ সেগুলো বিতর্ক করে জুলাই চার্টারের আলোকে সিদ্ধান্ত নিবে।

সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো আদালতের বাতিল করা উচিত মন্তব্য করে শিশির মনির বলেন, যেমন ধরুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাদ করে দেয়া হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার যদি না থাকে, তাহলে ডেমোক্রেসি থাকে না। ডেমোক্রেসি না থাকলে সংবিধান, রাষ্ট্র, প্রতিযোগিতা সবকিছুই ব্যাহত হয়। এইজন্য আমরা বলেছি, যে সমস্ত বিষয় বেসিক স্ট্রাকচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সেগুলোর ব্যাপারে উচ্চ আদালত যেন তার রায় দেন।

আদালত সীমার বাইরে গেলে রাষ্ট্রের ৩ অঙ্গের ভারসাম্য নষ্ট হবে মন্তব্য করে শিশির মনির বলেন, সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত হয় এই ধরনের কোনো ফাইন্ডিংস কিংবা এই ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত আদালতের নেয়া ঠিক হবে না। যদি আদালত এই ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে এটাকে বলবে এনক্রোচমেন্ট অব জুডিশিয়াল রিভিউ। অর্থাৎ বিচার বিভাগ আইনের বাইরে গিয়ে তার দায়িত্ব পালন করতে গেলে গণতন্ত্রে কিংবা রাষ্ট্রীয় সিস্টেমে ৩ অর্গানের ব্যালেন্স বজায় রাখা সম্ভব হবে না।

পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হলে পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াবে- এমন প্রশ্নে বাকশাল ব্যবস্থার প্রসঙ্গ টানেন শিশির মনির। তিনি বলেন, চ্যাপ্টার সিক্সের ‘এ’ যদি এখন বাতিল করে দেন, পুরোটা মিলে যদি আপিল বিভাগ বাতিল করে দেন, তাহলে আমরা অনিবার্যভাবে বাকশাল ব্যবস্থাপনায় ফিরে যাব। তাহলে বাংলাদেশের ডেমোক্রেসি বলতে তো আর কিছু থাকবে না। এখন যদি আদালত বাদ করে দিয়ে বলেন ‘ইয়েস, আমরা বাকশাল সিস্টেমে চলে গিয়েছি’, আমরা বলছি ‘নো’। ইট ইজ নট দ্য ফাংশন অব দ্য কোর্ট। ইট ইজ দ্য ফাংশন অব দ্য পার্লামেন্ট। ডেমোক্রেসি যদি ঠিক না থাকে, সিক্সের ‘এ’ বাদ দিয়ে দেয়া হয়, তাহলে আমরা যাব কোথায়? কীভাবে দেশ চলবে? ডেমোক্রেসি কিভাবে বিলীন থাকবে? এখন আমরা আর্গুমেন্ট যদি করি যে এ টু জেড যা কিছু আছে সব বাদ করে দেন, তাহলে তো এটাও বাদ হয়ে যাবে এবং বাতিলটা বাদ হয়ে যাবে।

ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের মত নীতিগত বিষয়গুলো ‘আদালতের কাজের পরিধির বাইরে’ বলে দাবি করেন জামায়াতের আইনজীবী। তিনি বলেন, সেকুলারিজম একটা রাষ্ট্রে থাকবে কি থাকবে না, এই সিদ্ধান্ত কি আদালত নেবে, নাকি এই সিদ্ধান্ত পার্লামেন্ট নেবে? এখন যদি আমরা বলি ইন ইটস এনটায়ারটি বাতিল করে দেন, তাহলে তো সেকুলারিজম বাতিল হয়ে যাবে, সোশালিজম বাতিল হয়ে যাবে। সেকুলারিজম, সোশালিজম যদি আদালত বাদ দেয়, এটি আদালতের ফাংশন না। কারণ এটি নীতিকথা। এটি হল রাষ্ট্রের গাইডিং প্রিন্সিপাল। এটাকে বলা হয় পোলস্টার। পোলস্টার আদালত ঠিক করে না, পোলস্টার ঠিক করে পার্লামেন্ট। অতীতে দেখেছেন, যখনই রাজনৈতিক বিতর্ক আদালত সেটেল করতে গিয়েছে, সে সমস্ত জায়গায় আদালত নিজেই বিতর্কিত হয়েছে।

আদালতকে আইনি কাঠামোর মধ্যে থাকার অনুরোধ জানিয়ে শিশির মনির বলেন, রাজনৈতিক বিতর্ক সংসদেই হওয়া উচিত। আমরা যদি আদালতের চার দেয়ালের মধ্যে বসে, আদালতের বারান্দায় এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে যাই, তাহলে জনগণের মধ্যে একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। আমাদের তা করা উচিত নয়। পঞ্চদশ সংশোধনীর কোন বিষয়গুলো আদালতের বাতিল করা উচিত এবং কোনগুলো সংসদের জন্য রেখে দেয়া উচিত, তা স্পষ্ট করতে শুনানিতে একটি তালিকা জমা দেয়ার কথা বলেন জামায়াতের আইনজীবী।

প্রসঙ্গত; গত বছরের ১৩ নভেম্বর আপিল বিভাগ হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিলের অনুমতি দেয়। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এ আদেশ দেন। রিটকারী সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া আপিলটি দায়ের করেন। এতে পঞ্চদশ সংশোধনী সম্পূর্ণ বাতিলের আবেদন জানানো হয়। এর আগে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি বিধানকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করে বাতিল করেন। একই সঙ্গে সংবিধানে গণভোটের বিধান পুনর্বহাল করা হয়। তবে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করা হয়নি।

রায়ে হাইকোর্ট বলেন, গণতন্ত্র সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অন্যতম ভিত্তি এবং তা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বিকশিত হয়। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বিগত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে জনআস্থা নষ্ট হয়েছে বলেও পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়। রায়ে আরো বলা হয়, জনগণের প্রত্যাশার ভিত্তিতে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সময়ের সঙ্গে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছে। তাই এ ব্যবস্থা বিলুপ্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদ সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী হওয়ায় বাতিল ঘোষণা করা হয়। এছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত সংবিধানের ৭ক, ৭খ এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদও সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ উল্লেখ করে বাতিল ঘোষণা করেন আদালত। একই সঙ্গে গণভোটের বিধান বাতিলসংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনীর ৪৭ ধারাও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের আগের বিধান পুনর্বহাল করা হয়।

তবে রায়ে আদালত স্পষ্ট করেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর সব বিধান বাতিল করা হচ্ছে না। যেসব বিষয় বহাল রাখা হয়েছে, সেগুলো ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদ জনগণের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন, পরিমার্জন বা পরিবর্তন করতে পারবে। ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়, নারীদের জন্য সংরক্ষিত সংসদীয় আসন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয় এবং সংবিধানের বিভিন্ন ধারায় আরো বেশ কয়েকটি পরিবর্তন আনা হয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

রাজধানীতে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড

রাজধানীতে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড

বিশ্বকাপে শেষ আটের লড়াই, কে কার মুখোমুখি

বিশ্বকাপে শেষ আটের লড়াই, কে কার মুখোমুখি

মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করলো ইরান

মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করলো ইরান

আরো এক দফা কমে আজ কত দরে বিক্রি হচ্ছে স্বর্ণ ?

আরো এক দফা কমে আজ কত দরে বিক্রি হচ্ছে স্বর্ণ ?

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App