তিস্তায় ফের পানি বাড়ছে, কয়েকটি জেলায় অবনতি
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের বন্যাকবলিত সাত জেলায় এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে দেড় লাখের বেশি পরিবার। সরকারের হিসেবে, অতিবর্ষণ, পাহাড়ি ঢলে বন্যা ও পাহাড় ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৪ জনে দাঁড়িয়েছে। বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ জনে। এদিকে টানা ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে ফের তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটারের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নীলফামারী ও লালমনিরহাটে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের ৯টি জেলার নদীসংলগ্ন নি¤œাঞ্চলে বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির আরো কিছুটা অবনতি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
পানি উন্নয়ন বোর্ড তিস্তা ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানিয়েছেন, সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় ডিমলা উপজেলার ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার থেকে ৫২ দশমিক ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিকাল ৬টায় এ পয়েন্টে (খালিশাচাপানি বাইশপুকুর) নদীর পানি বিপৎসীমার তিন সেন্টিমিটার উপর দিয়ে এবং বেলা ৩টায় বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার তথ্য দেন তিনি। তিনি বলেন, তিস্তার পানি আগামী ২৪ ঘণ্টায় বিপৎসীমার ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে; যা বড় বন্যার বার্তা দিচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নিয়মিত পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ এবং উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নি¤œাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি অথবা অবনতি হতে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়েছে, সোমবার সকাল ৯টায় সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর পানি তিনটি জেলার চারটি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এর মধ্যে সুরমা নদীর পানি ছাতক (সুনামগঞ্জ জেলা) পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
কুশিয়ারা নদীর পানি ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট জেলা) পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৭ সেন্টিমিটার এবং মারকুলি (সুনামগঞ্জ জেলা) পয়েন্টে ১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল।
এছাড়া নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা পয়েন্টে সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপৎসীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় সাঙ্গু নদীর বান্দরবান ও দোহাজারী পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার নিচে নেমেছে এবং সুরমা নদীর ছাতক পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপরে উঠেছে।
সরকারের হিসাব : সোমবার বিকালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বন্যা সংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ এই সাত জেলা বর্তমানে তীব্রভাবে বন্যা উপদ্রুত। সরকারি হিসাবে এসব জেলার মোট ৫৯টি উপজেলার ৩৩৪টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।
বন্যা ও ভূমিধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি এবং ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কক্সবাজারে। এ জেলায় এখন পর্যন্ত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৮ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা। আহত হয়েছেন ২৪ জন এবং একজন এখনো নিখোঁজ। অন্যান্য জেলার মধ্যে চট্টগ্রামে ১৩ জন, পার্বত্য জেলা বান্দরবানে ৬ জন, রাঙ্গামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা উপদ্রুত জেলাগুলোয় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জরুরি আশ্রয়ের জন্য প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় মোট ১ হাজার ৪৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে এ পর্যন্ত মোট ৩৮ হাজার ৪২২ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
সবচেয়ে বেশি ৪১৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে চট্টগ্রামে; সেখানে ১৬ হাজার ৮২১ জন মানুষ অবস্থান করছেন। এছাড়া বান্দরবানের ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৫ হাজার ১৩৪ জন, রাঙ্গামাটির ৪৭টি কেন্দ্রে ৩ হাজার ৪৮৭ জন, কক্সবাজারের ৭টি কেন্দ্রে ৪ হাজার ১৩১ জন এবং মৌলভীবাজারের ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ২৪ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
খাগড়াছড়িতে ১৫০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও সেখানে মাত্র ৭৪ জন আশ্রয় নিয়েছেন এবং হবিগঞ্জের দুটি আশ্রয়কেন্দ্রে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আশ্রিত মানুষের তথ্য পাওয়া যায়নি।
উপদ্রুত জেলাগুলোতে সরকারিভাবে ত্রাণ তৎপরতাও জোরদার করা হয়েছে বলে তথ্য দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, বন্যাকবলিত সাত জেলায় এ পর্যন্ত মোট ৮ হাজার ৯৫০ টন চাল এবং ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা নগদ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি শুকনো খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমও চলমান।
উপদ্রুত জেলাগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ টন চাল এবং ৬৫ লাখ টাকা নগদ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
কক্সবাজারে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৪৫০ মেট্রিক টন চাল ও ৩০ লাখ টাকা। এই বরাদ্দের বিপরীতে ৩৬৩ টন চাল এবং ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
এছাড়া রাঙ্গামাটিতে ৫০০ টন চাল ও ২৫ লাখ টাকা নগদ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যার মধ্যে ২৯৫ টন চাল ও ২০ লাখ টাকা বিতরণ শেষ হয়েছে। বান্দরবানে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৪০০ টন চাল ও ২০ লাখ টাকা; যার বিপরীতে ৬৮ টন চাল ও নগদ ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
খাগড়াছড়িতে ৪০০ টন চাল ও ২০ লাখ টাকা, মৌলভীবাজারে ২০০ টন চাল ও ১০ লাখ টাকা এবং হবিগঞ্জে ১০০ টন চাল ও ৫ লাখ টাকা নগদ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকেও রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে ২০ লাখ টাকা করে বিশেষ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
