চট্টগ্রামে ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানে হামলার দায়ে ১৮ জন গ্রেপ্তার
চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বিদেশে পলাতক কুখ্যাত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত আরেক কুখ্যাত সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন যে নিজেকে ‘ডেভিড ইমন’ নামে পরিচয় দেয়। চট্টগ্রামে নগরীর বাঁকলিয়া এক্সেস রোডে একটি ইন্টারনেট সেবা প্রতিষ্ঠানের কাছে এককালীন দুই কোটি ও মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা চেয়ে না পেয়ে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয় ইমন। তাই তার অনুগত ও বিশ্বস্ত তিন ক্যাডার মাইকেল, সানি ও রাজুকে দায়িত্ব দেয় লোকজন ভাড়া করে সেই প্রতিষ্ঠানে হামলা করার। তবে গ্রেপ্তারের পর মাইকেল র্যাবের কাছে অনেক তথ্যই জানিয়েছে। সন্দেহ এড়িয়ে নিরাপদে পালাতে ব্যবহার করা হয় অ্যাম্বুলেন্সও।
চট্টগ্রামসহ দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা সেই হামলার প্রসঙ্গে র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফট্যানেন্ট কর্নেল মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান রবিবার (১৯ জুলাই) সংবাদ মাধ্যমকে জানালেন, ‘মাইকেল, রাজু ও সানি এই হামলা-তাণ্ডবের মাস্টারমাইন্ড। ডেভিড ইমনের নির্দেশে তারা নগরীর বাঁকলিয়া, চকবাজার, বহদ্দারহাট ও রাউজান উপজেলা থেকে উঠতি বয়সের ৩০-৪০ জন তরুণকে নগরে এনে হামলার ঘটনা ঘটায়। প্রত্যেককে ৫০০ টাকা করে মজুরি দেয়া হয়। অথচ এই তরুণদের অনেকে জানত না কেন এবং কোথায় হামলা করছে।
গত ১৩ জুলাই দুপুরে নগরীর বাঁকলিয়া এক্সেস রোডে ‘ডিজিটাল ডট নেট’ (ডিডিএন) নামের ইন্টারনেট সেবা প্রতিষ্ঠানটিতে হামলার ঘটনা ঘটে। সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন প্রতিষ্ঠানটির মালিক আদিল বিন মামুনকে হামলার দুইদিন আগে একটি বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে কল দিয়ে চাঁদা দাবি করেন। অন্যথায় ব্যবসা বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দেন।
এরই মধ্যে নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে র্যাব-৭ এর টিম এই হামলায় জড়িত মাইকেল রোহেন মিয়াসহ (৩১) মোট ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। বাকিরা হলেন- তুহিন (২২), আকবর হোসেন (৩৮), আব্দুল মুমিন (৩০), মাসাদ মিয়া (২৭), দিদার মিয়া (২২), সানজাত হাসান (১৮), সৈরত হোসেন (১৮) ও সাইফুদ্দিন (৩২)।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে র্যাব-৭ এর কর্মকর্তাদের দেয়া তথ্যমতে, মাইকেলের মোবাইলে থাকা একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা গেছে, ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হামলাকারীরা এক জায়গায় জড়ো হয়। এরপর কীভাবে হামলা করবে, হামলার পর কেমনে নিরাপদে ফিরে আসবে সে বিষয়ে ব্রিফ করেন মাইকেল। এরপর সন্ত্রাসীরা সবাই মিলে ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে হামলা করে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ এবং সেই ভিডিও ক্লিপ দেখে হামলায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে।
র্যাবের অধিনায়ক হাফিজুর রহমান জানান, গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে মাইকেল, সানি ও রাজুকে মূল সংগঠক হিসেবে প্রমাণ পাওয়া গেছে। হামলার পর সেই ঘটনা উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে চকবাজার থানায় মামলা করা হয়। এ পর্যন্ত পুলিশ ৭ জন ও র্যাব ১১ জনসহ মোট ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
লে. কর্নেল হাফিজুর জানালেন, প্রকাশ্যে এমন তাণ্ডবের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও
গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করেন। জড়িতদের গ্রেপ্তারের জন্য মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের সরাসরি নির্দেশনা দেন। এরপর র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা ইউনিট (ডিবি) যৌথভাবে মাঠে নামে।
জানা গেছে, হামলার জন্য ভাড়া করা একটি বাসে করে তরুণরা প্রথমে বহদ্দারহাটে জড়ো হয়। বহদ্দারহাটেই সন্ত্রাসী মাইকেল তাদের কি করতে হবে সে অপারেশনের ব্যাপারে ব্রিফ দেন। এরপর তারা তিন ভাগ হয়ে একাধিক সিএনজি অটোরিকশা ও একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে ঘটনাস্থলে যান। একটি ছোট দলকে বাঁকলিয়া এক্সেস রোডের মুখে রাখা যায়। তাদের পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নজরদারির দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।
র্যাব কর্মকর্তারা জানান, আরেকটি দলকে ইন্টারনেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটির আশপাশের ভবনের নিচে ভাগ করে রাখা হয়। তারা খুব সাধারণ বেশে ছিলেন। হামলাকারীরা আক্রান্ত হলে তাদের ব্যাকআপ টিম হিসেবে ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছিল। মূল দল ভেতরে ঢুকে হামলা-ভাঙচুর করে। এদের সংখ্যা ২০ জনের মতো। হামলা করে ফেরত যাবার পর সানি তাদের প্রত্যেককে ৫০০ টাকা করে দিয়েছে।
র্যাব কর্মকর্তা লে. কর্নেল হাফিজুর রহমান জানালেন, এই হামলায় যারা অংশ নিয়েছে তারা অনেকটাই কিশোর গ্যাং টাইপের, তবে বয়স কিশোরের চেয়ে সামান্য বেশি। নির্দেশ পেয়েই হামলা চালিয়ে এসেছে। বিনিময়ে কিছু টাকা পেয়েছে। এটা যে এত বড় ঘটনা হয়ে যাবে তারা হয়তো বুঝতে পারেনি।
হামলার ঘটনার সঙ্গে বড় সাজ্জাদের কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে কী-না, জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘মোবারক হোসেন ইমন ও রায়হান হচ্ছে এই মুহূর্তে বড় সাজ্জাদের বাহিনী লিড করে। তাদের সঙ্গে বড় সাজ্জাদের যোগাযোগ আছে এমন তথ্য আমরা পেয়েছি। এরপর মাইকেল, সানি, রাজু। এদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে ইমনের। এরা মূলত রায়হান বা ইমনের নির্দেশেই কাজ করে।’
প্রসঙ্গত : নগরীর বাঁকলিয়া এক্সেস রোডে ‘ডিজিটাল ডট নেট’ (ডিডিএন) নামের ইন্টারনেট সেবা প্রতিষ্ঠানটিতে হামলার পর পরই চট্টগ্রাম ও ঢাকায় ইন্টারনেট ব্যবসায়ীরা সময়সীমা বেঁধে দিয়ে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য প্রশাসনকে আল্টিমেটাম দিয়েছিল। না হলে তারা ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করার হুমকি দিয়েছিল। আর এ ধরনের প্রকাশ্য হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনাসহ হুমকির অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। মূলত : এর পরই প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। শুরু হয় তল্লাশি ও গ্রেপ্তার। তবে পালের গোদা এখনো অধরা।
