×

শেষের পাতা

চোখবিহীন আনারস, ছড়ায় ২৪০ কলা

টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারায় রেকর্ড ফলন

Icon

হরলাল রায় সাগর

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

চোখবিহীন আনারস, ছড়ায় ২৪০ কলা

ছবি: সংগৃহীত

একটি ছড়া বা কাঁদিতে কলা ধরছে ১৬০টি থেকে ২৪০টির মতো। এই কলা রোগমুক্ত, পুষ্টিগুণেও ভরা। উদ্ভাবিত এই কলার নাম জি-৯। সাধারণভাবে উৎপাদিত কলা একটা ছড়ায় এত হয় না। চারা করার পর প্রায় এক বছরের মধ্যেই কলা পাওয়া যায়। পাশাপাশি উদ্ভাবন করা হয়েছে চোখবিহীন আনারস। এ জাতের আনারস পুষ্টিগুণে ভরপুর, রসালো ও স্বাদে অনন্য। দুটি জাতই রোগমুক্ত, মানসম্মত এবং অধিক ফলনশীল ও সুস্বাদুও। সম্ভাবনাময় এই কলা ও আনারসের জাত উদ্ভাবন করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার সেন্টার। আধুনিক টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে জাত দুটির উন্নতমানের মাতৃগাছের চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে একই বৈশিষ্ট্যের বিপুল সংখ্যক চারা অল্প সময়ে উৎপাদন করা সম্ভব।

ছোট্ট একটি কাচের বয়ামের মধ্যে জমাট বাঁধা স্বচ্ছ জেলির মতো এক ধরনের পদার্থ। তার ওপর কোনো মাটি ছাড়াই রাখা হয় কলা গাছ ও আনারসের অতি ক্ষুদ্র একটি টিস্যু; যা খালি চোখে দেখা যায় না। সেই টিস্যু থেকেই জন্ম নিচ্ছে হাজার হাজার চারা। এই চারা খুবই কম দামে বিক্রি করা হচ্ছে কৃষক কিংবা উদ্যোক্তাদের কাছে। ফলন ভালো হওয়ায় চাহিদাও বাড়ছে। এ পদ্ধতি ফলের গুণগত মান, স্বাদ ও আকৃতি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষি খাতের এই নতুন সম্ভাবনা তৈরিতে নিবেদিত রয়েছেন কৃষিবিদ ও কৃষিবিজ্ঞানীরা।

মাদারীপুর জেলার মোস্তফাপুরে অবস্থিত হর্টিকালচার সেন্টারে টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরিতে শুধু কলা ও আনারসই নয়, অন্তত সাত ধরনের ফল, ফুল ও উদ্যান ফসলের চারা উৎপাদিত হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে ল্যাবটি পরিচালিত হয়। এ ল্যাবে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত পরিবেশে নিয়ন্ত্রিত আর্দ্রতা-তাপমাত্রার মধ্যে উন্নতমানের গাছের চারা উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এই ল্যাব কৃষির রূপান্তর কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।

সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, ল্যাবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত আলোতে কয়েক হাজার কাচের বয়ামের মধ্যে টিস্যু রাখা হয়েছে। যেগুলো স্তরে স্তরে সাজানো। এই টিস্যুগুলো থেকে নিয়ন্ত্রিত আলো ও আবহাওয়ায় গাছের জন্ম নেয়, যা পরে মাঠে বা জমিতে লাগানো হয়। সাধারণত একটি কলা গাছের

কন্দ থেকে একটি গাছের জন্ম হয়। কিন্তু টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে একটি কন্দ থেকে কয়েকশ চারা উৎপাদন করা সম্ভব। ল্যাবে উৎপাদিত চারাগুলো সম্পূর্ণভাবে রোগমুক্ত এবং স্বাস্থ্যকর হয়ে থাকে। তাই এগুলো থেকে ভালো মানের ফলন নিশ্চিত করা যায় বলে জানান দায়িত্বরত কৃষিবিদরা।

টিস্যু কালচার কী : উদ্ভিদের টিস্যু কালচার হলো একটি অত্যাধুনিক ও বৈজ্ঞানিক বংশবিস্তার পদ্ধতি। যেখানে উদ্ভিদের যেকোনো জীবন্ত অংশ, যেমন- পাতা, কাণ্ড, মূল বা ভ্রƒণ সম্পূর্ণরূপে জীবাণুমুক্ত পরিবেশে কৃত্রিম পুষ্টির মাধ্যমে ল্যাবরেটরিতে দ্রুত নতুন চারা উৎপাদন করা হয়। এই পদ্ধতিতে মূলত পাঁচটি প্রধান ধাপে চারা তৈরি করা হয়। এক্সপ্ল্যান্ট, জীবাণুমুক্তকরণ, পুষ্টি মিডিয়াম, ক্যালাস ও চারা গঠন এবং হার্ডেনিং বা খাপ খাওয়ানো।

এই পদ্ধতিতে বছরের যেকোনো সময়ে, যেকোনো ঋতুতে ল্যাবের ভেতরে চারা উৎপাদন করা যায়। যেসব উদ্ভিদের বীজ থেকে সহজে চারা হয় না, সেগুলোকে এই পদ্ধতিতে টিকিয়ে রাখা যায়। এছাড়া চারাগুলো অবিকল তাদের মাতৃউদ্ভিদের মতো উচ্চ ফলনশীল ও গুণসম্পন্ন হয়। একটিমাত্র উদ্ভিদের ক্ষুদ্র অংশ থেকে খুব কম সময়ে লাখ লাখ চারা তৈরি করা সম্ভব। এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারাগুলো শতভাগ ভাইরাস ও রোগমুক্ত হয়।

পদ্ধতি : ল্যাব কর্মকর্তারা জানান, কলা কিংবা আনারসের একটি মাতৃগাছ থেকে শুট টিপ বা টিস্যু সংগ্রহ করে প্রথমে জীবাণুমুক্ত করা হয়। তারপর সেটিকে পুষ্টিসমৃদ্ধ কৃত্রিম মিডিয়ার মধ্যে রাখা হয়। সেখানে থাকে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ হরমোন, যা কোষ বিভাজনকে ত্বরান্বিত করে। এই কোষগুলো ধীরে ধীরে বিভাজিত হয়ে তৈরি করে ছোট ছোট মাইক্রো-শুট। এরপর আরেক ধাপে হরমোন ব্যবহার করে তৈরি করা হয় শিকড়। তখন এটি ল্যাবের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের মধ্যে গড়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ চারা। এখানেই শেষ নয়। ল্যাবের ভেতরে তৈরি হওয়া চারাগুলো সরাসরি মাঠের আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না। তাই এগুলোকে পলি হাউসে কোকোপিটের ট্রেতে নিয়ন্ত্রিত আর্দ্রতায় রেখে ধাপে ধাপে বাইরের পরিবেশে অভ্যস্ত করা হয়। যখন গাছগুলো শক্ত হয়, তখনই সেগুলো কৃষকের হাতে তুলে দেয়া হয়।

কলা : হর্টিকালচার সেন্টার সূত্র জানায়, গত এক বছরে মোস্তফাপুরে টিস্যু কালচার ল্যাব থেকে ৪ হাজার জি-৯ কলা গাছের চারা উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার চারা কৃষক পর্যায়ে দেয়া হয়েছে। বাকি চারা হর্টিকালচারের ফিল্ডে রয়েছে। এ বছর ৩০ হাজার চারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে একটি চারা ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এ বিষয়ে টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের সহকারী টিস্যু কালচারিস্ট কৃষিবিদ মো. এনামুল ইসলাম বলেন, তারা ল্যাবে মাতৃগাছের ক্লোন তৈরি করেন। ফলে প্রতিটি গাছ একই মানের, একই বৈশিষ্ট্যের হয়। ল্যাবে উৎপাদিত চারাগুলো সম্পূর্ণ রোগমুক্ত। ফলে মাঠে গিয়ে এগুলো দ্রুত বাড়ে এবং ফলনও বেশি দেয়। তিনি আরো বলেন, এই জাতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো কলার অনেক বড় ছড়া হয়। একটা কাঁদিতে অনেক ১৬০ থেকে ২৪০টি পর্যন্ত কলা ধরে। এটা খুবই ব্যবসা সফল কলা।

আনারস : দেশে দীর্ঘদিন ধরে কৃষকরা মূলত সাকার, স্লিপ বা ক্রাউন থেকে আনারসের চারা উৎপাদন করে আসছেন। কিন্তু টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে চারার বয়স ও গুণগত মানে ব্যাপক তারতম্য থাকে। সাধারণ পদ্ধতিতে একই সঙ্গে একটি গাছ থেকে সীমিত সংখ্যক চারা পাওয়া যায় এবং ভাইরাস, ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগও সহজে ছড়িয়ে পড়ে। বিপরীতে টিস্যু কালচারে অল্প সময়েই একই মাতৃগাছ থেকে হাজার হাজার রোগমুক্ত চারা উৎপাদন সম্ভব হয়। তাই এগুলো থেকে ভালো মানের ফলন নিশ্চিত করা যায়।

হর্টিকালচার সেন্টার সূত্র জানায়, গত এক বছরে এই ল্যাব থেকে ৬ হাজার নতুন জাতের এ আনারসের চারা কৃষক পর্যায়ে দেয়া হয়েছে। এ বছর ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার চারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে একটি চারা ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এ বিষয়ে টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প সমন্বয়কারী কৃষিবিদ মো. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, এ আনারসটি খুবই সুস্বাদু এবং সহজেই অনেক বড় হয়। এর পুষ্টিগুণ অনেক বেশি। যেমন এসিড সবচেয়ে কম এবং এটি মসৃণ হওয়ার জন্য খোসা ছাড়ানো সহজ এবং এর গায়ে চোখ থাকে না। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে অন্য আনারস খাওয়ার সময় মুখের চামড়া উঠে যায় কিংবা চুলকায়। এই আনারসে তেমনটি হয় না। তাছাড়া এর ফলনও অন্য আনারসের তুলনায় অনেক বেশি। এ জাতের আনারস চাষে কৃষি খাতের নতুন সম্ভাবনা রয়েছে।

মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক কৃষিবিদ আশুতোষ কুমার বিশ্বাস বলেন, দেশে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির বিস্তার ঘটলে উচ্চমূল্যের ফল, ফুল ও উদ্যান ফসলের উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এতে বিদেশ থেকে চারা আমদানির ব্যয় কমবে, কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে ও রপ্তানিমুখী উদ্যান খাত আরো শক্তিশালী হবে। বিদেশ থেকে ব্যয়বহুল চারা আমদানির পরিবর্তে দেশেই যদি জীবাণুমুক্ত ও মানসম্মত চারা উৎপাদন সম্ভব হয়, তা হলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

মানবতাবিরোধী মামলায় ট্রাইব্যুনালে হাজির জিয়া হত্যা মামলার আসামি

মানবতাবিরোধী মামলায় ট্রাইব্যুনালে হাজির জিয়া হত্যা মামলার আসামি

মারাত্মক খাদ্য ঝুঁকিতে বাংলাদেশ, জাতিসংঘের সতর্কতা

মারাত্মক খাদ্য ঝুঁকিতে বাংলাদেশ, জাতিসংঘের সতর্কতা

দিল্লিতে সিজেপি'র বিক্ষোভে ১৬ মেট্রো স্টেশন বন্ধ

দিল্লিতে সিজেপি'র বিক্ষোভে ১৬ মেট্রো স্টেশন বন্ধ

প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে ফাস্ট ট্র্যাক আদালত গঠনের ঘোষণা মোদীর

প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে ফাস্ট ট্র্যাক আদালত গঠনের ঘোষণা মোদীর

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App