জনপ্রিয় হচ্ছে টিস্যু কালচার পদ্ধতি
হরলাল রায় সাগর, মোস্তফাপুর, মাদারীপুর থেকে ফিরে
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতায় উদ্ভিদের বংশবিস্তারে এখন টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে দেশে। একটি ক্ষুদ্র উদ্ভিদ টিস্যু থেকেই জন্ম নিচ্ছে লাখ লাখ রোগমুক্ত ও উচ্চ ফলনশীল চারা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তিনটি ল্যাবরেটরিতে এই পদ্ধতিতে জি-৯ কলা, এমডি-২ আনারস, স্ট্রবেরি, জারবেরা, অর্কিড, লিলিয়াম, স্টেভিয়া জাতের ফুল, ফল ও উদ্যান ফসলের চারা উৎপাদিত হচ্ছে। আর তা ইতোমধ্যে সাড়া ফেলেছে কৃষি খাতে। এসব চারা যেমন রোগমুক্ত ও উচ্চ মানসম্মত, তেমনি দামেও কম। এ চারা ব্যবহার করে লাভবান হচ্ছেন কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তারা। টিস্যু কালচার পদ্ধতির প্রয়োগে দেশের উদ্যান খাতের উৎপাদনশীলতা বাড়ছে। পাশাপাশি কমছে আমদানি নির্ভরতা। রপ্তানিযোগ্য মানের কৃষিপণ্য উৎপাদনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কৃষিবিদরা।
টিস্যু কালচার কী : উদ্ভিদের টিস্যু কালচার হলো একটি অত্যাধুনিক ও বৈজ্ঞানিক বংশবিস্তার পদ্ধতি। যেখানে উদ্ভিদের যেকোনো জীবন্ত অংশ, যেমন- পাতা, কাণ্ড, মূল বা ভ্রæণ সম্পূর্ণরূপে জীবাণুমুক্ত পরিবেশে কৃত্রিম পুষ্টির মাধ্যমে ল্যাবরেটরিতে দ্রুত নতুন চারা উৎপাদন করা হয়।
টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে মূলত পাঁচটি প্রধান ধাপে চারা তৈরি করা হয়। এক্সপ্ল্যান্ট, জীবাণুমুক্তকরণ, পুষ্টি মিডিয়াম, ক্যালাস ও চারা গঠন এবং হার্ডেনিং বা খাপ খাওয়ানো।
এই পদ্ধতিতে বছরের যেকোনো সময়ে, যেকোনো ঋতুতে ল্যাবের ভেতরে চারা উৎপাদন করা যায়। যেসব উদ্ভিদের বীজ থেকে সহজে চারা হয় না, সেগুলোকে এই পদ্ধতিতে টিকিয়ে রাখা যায়। এছাড়া চারাগুলো অবিকল তাদের মাতৃউদ্ভিদের মতো উচ্চ ফলনশীল ও গুণসম্পন্ন হয়। একটিমাত্র উদ্ভিদের ক্ষুদ্র অংশ থেকে খুব কম সময়ে লাখ লাখ চারা তৈরি করা সম্ভব। এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারাগুলো শতভাগ ভাইরাস ও রোগমুক্ত হয়।
সরজমিন টিস্যু কালচার ল্যাব : মাদারীপুর জেলার মোস্তফাপুরে গড়ে তোলা হয়েছে মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টার। এই সেন্টারের প্রশাসনিক ভবনের তিন তলায় টিস্যু কালচার ল্যাব। সম্প্রতি সরজমিন ঘুরে ল্যাবের কার্যক্রম দেখা যায়। প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হচ্ছে জীবাণুমুক্ত ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে। সাদা অ্যাপ্রোন পরা গবেষক ও প্রযুক্তিবিদরা ল্যামিনার এয়ারফ্লোর সামনে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্ভিদ টিস্যু স্থানান্তর করছেন এক বয়াম থেকে আরেক বয়ামে।
ল্যাবের দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষিবিদ মো. এনামুল হক জানান, নির্বাচিত মাতৃগাছ থেকে সংগ্রহ করা শুট টিপ প্রথমে জীবাণুমুক্ত করা হয়। এরপর বিশেষ পুষ্টি মাধ্যমে স্থাপন করা হলে উদ্ভিদ হরমোনের প্রভাবে কোষ বিভাজন শুরু হয়। কয়েক দফা সাব-কালচারের মাধ্যমে একটি ক্ষুদ্র টিস্যু থেকেই তৈরি করা যায় হাজার হাজার চারা।
তিনি জানান, ল্যাবে উৎপাদিত চারা সরাসরি মাঠে দেয়া হয় না। প্রথমে পলি হাউস ও হার্ডেনিং জোনে ধাপে ধাপে বাইরের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া হয়। পর্যাপ্ত শক্ত হওয়ার পরই সেগুলো কৃষকের হাতে তুলে দেয়া হয়।
এনামুল হকের ভাষায়, টিস্যু কালচারে উৎপাদিত প্রতিটি চারা মাতৃগাছের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। রোগমুক্ত হওয়ায় এসব চারা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাঠে ভালো ফলন দেয়। একসময় জারবেরা, লিলিয়াম কিংবা এমডি-২ আনারসের মতো উচ্চমূল্যের চারার জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হতো। বর্তমানে সরকারি টিস্যু কালচার ল্যাবেই এসব চারা উৎপাদিত হচ্ছে। ভারত থেকে আমদানি করা একটি জারবেরা চারার দাম যেখানে ৮০ থেকে ১০০ টাকা, সেখানে সরকারি ল্যাবে উৎপাদিত একই মানের চারা পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৩০ টাকায়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মাদারীপুর ল্যাবে প্রথমবারের মতো টিস্যু কালচার প্রযুক্তিতে লিলিয়ামের চারা উৎপাদন শুরু হয়েছে। চলতি বছরে প্রায় আট হাজার চারা উৎপাদিত হয়েছে। আগামী মৌসুমে লক্ষ্য ২০ হাজার চারা উৎপাদনের। স্টেভিয়া নিয়েও পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলছে। বিদেশি চারার দাম যেখানে কয়েকশ টাকা, সেখানে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত চারা স্বল্পমূল্যে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অবশ্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন-বিএডিসিও আগে থেকেই টিস্যু কালচারের মাধ্যমে আলুসহ বিভিন্ন উদ্যান ফসল উৎপাদন করে আসছে।
হর্টিকালচার সেন্টারের কার্যক্রম : জানা গেছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্প’র আওতায় মাদারীপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহ জেলার হর্টিকালচার সেন্টারে তিনটি আধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া বান্দরবানের বালাঘাটা, সাভারের রাজালাখ, কুমিল্লা সদর, ভোলার চরফ্যাশন ও টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে আরো পাঁচটি আধুনিক ল্যাব নির্মাণাধীন। এসব ল্যাব চালু হলে দেশে রোগমুক্ত ও উন্নতমানের চারার উৎপাদন সক্ষমতা আরো বাড়বে এবং টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে বিপ্লব ঘটবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কৃষিবিদরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে তিনটি টিস্যু কালচার ল্যাবে ২ লাখ ১২ হাজার ৩৮৭টি রোগমুক্ত চারা উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৯২ হাজার ৬৩৭টি চারা কৃষক ও উদ্যোক্তাদের কাছে বিক্রি হয়েছে। মাদারীপুরে উৎপাদিত হয়েছে ৯০ হাজার ২৩৭টি চারা, বগুড়ায় ৬২ হাজার ৫০০টি এবং ময়মনসিংহে ৫৯ হাজার ৬৫০টি। সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে জি-৯ কলা, জারবেরা, স্ট্রবেরি ও আলুর চারার। আগামী অর্থবছরে তিনটি ল্যাবের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হয়েছে।
টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, উন্নতমানের রোগমুক্ত চারা সহজলভ্য করা এবং গবেষণাগারের প্রযুক্তি দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেয়াই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। তার মতে, একসময় জি-৯ কলা, এমডি-২ আনারস, জারবেরা কিংবা লিলিয়ামের মতো উচ্চমূল্যের চারার জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন সরকারি ল্যাবেই এসব চারা উৎপাদিত হচ্ছে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমছে, দেশীয় নার্সারি খাত শক্তিশালী হচ্ছে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তা এবং কৃষকের মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি করছে এই প্রকল্প। গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি দ্রুত মাঠে পৌঁছানোর ফলে নতুন জাত ও উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তির সম্প্রসারণ সহজ হচ্ছে।
কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম মনে করেন, আধুনিক কৃষিতে মানসম্মত ও রোগমুক্ত চারা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষক শুরু থেকেই সুস্থ ও অভিন্ন বৈশিষ্ট্যের চারা পাচ্ছেন, যা উৎপাদনশীলতা ও ফসলের গুণগত মান বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। তার মতে, বর্তমানে তিনটি ল্যাবে সফলভাবে চারা উৎপাদন হচ্ছে। নির্মাণাধীন নতুন ল্যাবগুলো চালু হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানসম্মত চারার প্রাপ্যতা আরো বাড়বে। এতে উচ্চমূল্যের উদ্যান ফসলের চাষ সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।
মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক কৃষিবিদ আশুতোষ কুমার বিশ্বাস বলেন, হর্টিকালচার সেন্টারে চারা উৎপাদন ও বিক্রি দুই বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কৃষক ও সৌখিন চাষীরা এখানে আসেন চারা নিতে। তার সেন্টারের চারার দামও অনেক কম, একটি চারা ২০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৮০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। চারা বিক্রি করে গত অর্থ বছরে এই সেন্টার থেকে ২৪ লাখ টাকার রাজস্ব আয় হয়েছে। টিস্যু কালচার প্রযুক্তির উৎকর্ষতার বিস্তারিত তুলে ধরে তিনি বলেন, টিস্যু কালচার চারার উৎপাদন যেমর বাড়ছে, চাহিদাও বাড়ছে। এই প্রযুক্তির বিস্তার ঘটলে উচ্চমূল্যের ফল, ফুল ও উদ্যান ফসলের উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
