যে কারণে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়াই অনশন ভাঙলেন সোনম ওয়াংচুক
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ০১:০৫ পিএম
ভারতের সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। ছবি : সংগৃহীত
ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ছাড়াই ২৬ দিনের অনশন ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছেন, তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা।
৫৯ বছর বয়সী ওয়াংচুক গত ২৮ জুন থেকে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়ম, শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান নেওয়া ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে তিনি এই অনশন করেন। খবর এনডিটির।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) মধ্যরাতের কিছুক্ষণ পর তিনি অনশন ভাঙেন। তার আগে কেন্দ্র সরকার লিখিতভাবে আশ্বাস দেয় যে, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হবে না, সংসদে পরীক্ষা সংস্কার ও প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে এবং নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
তবে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ নিশ্চিত না করেই অনশন ভাঙায় সমালোচনার মুখে পড়েন ওয়াংচুক। শুক্রবার গভীর রাতে ইউটিউবে প্রকাশিত ২৪ মিনিটের এক ভিডিওতে হাসপাতালের শয্যা থেকে তিনি বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, কিন্তু আলোচনার সময় তিনি সেটিকে প্রধান দাবি হিসেবে তোলেননি। কারণ তার কাছে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মামলা ও দমন-পীড়ন ঠেকানোই ছিল সবচেয়ে জরুরি।
সোনম বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ব্যক্তিগতভাবে নিশ্চিত করাকে আমি আমার অপরিহার্য দায়িত্ব মনে করিনি। তার ভাষায়, পদত্যাগ সরকারের জন্য খুবই তুচ্ছ একটি বিষয়। কিন্তু পদত্যাগ না করিয়ে তারা নিজেরাই বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। সারা দেশে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে।
ওয়াংচুক জানান, আলোচনার সময় কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ নিয়েও কথা হয়েছে। তবে তারা আরো সময় চেয়েছেন এবং তখনই কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি হননি।
আরো পড়ুন : ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ছাড়া আলোচনার অর্থ নেই: ককরোচ মুখপাত্র
ওয়াংচুক বলেন, আমার বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতেই হবে। আমি জানতাম, সরকার দীর্ঘদিন এভাবে টিকে থাকতে পারবে না। তাই বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করিনি।
তিনি বলেন, আমার লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের যেন কোনো ক্ষতি না হয়। তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর বা আইনি ব্যবস্থা ঠেকানোই ছিল আমার প্রধান উদ্বেগ। আন্দোলন অবশ্যই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি অব্যাহত রাখবে।
‘সরকারের সঙ্গে সমঝোতা’ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান
সরকারের সঙ্গে গোপন সমঝোতা করে অনশন ভেঙেছেন- এমন অভিযোগও নাকচ করে দেন ওয়াংচুক। তিনি বলেন, মধ্যরাতে আমাকে জানানো হয়, মন্ত্রীরা লিখিত আশ্বাস দিতে রাজি হয়েছেন। তখন দিল্লির পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। বড় ধরনের দমন-পীড়নের আশঙ্কা ছিল। ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর লাদাখে পুলিশ ও সিআরপিএফের গুলিতে তরুণদের ওপর হামলার ঘটনা আমার মনে পড়ে যায়। আমি ভয় পেয়েছিলাম, এখানে একই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। তাই অনশন ভেঙে শান্তির আহ্বান জানালে পরিস্থিতি শান্ত হতে পারে বলে মনে করেছি।
ইউনিয়ন মন্ত্রী জে.পি. নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংয়ের উপস্থিতিতে অনশন ভাঙার সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, সমালোচনাকারীরা তখনকার বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত নন। তিনি বলেন, যদি আমার সমঝোতা করারই ইচ্ছা থাকত, তাহলে কি আমি ২৬ দিন অনশন করতাম? দিল্লির প্রচণ্ড গরমে অনশন না করে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসেই তো সমঝোতা করতে পারতাম।
কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কেন্দ্র
ওয়াংচুক জানান, গুরগাঁওয়ের মেদান্তা হাসপাতালে নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং তার সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে তারা নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিয়ে সংসদে আলোচনা করার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার আশ্বাস দেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না—এমন লিখিত নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত তিনি অনশন ভাঙতে রাজি হননি।
ওয়াংচুক বলেন, প্রথমে তারা ক্ষতিপূরণ ও সংসদে আলোচনার ব্যাপারে সম্মত হয়েছিলেন। কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা না করার বিষয়ে শুধু মৌখিক আশ্বাস দিতে চেয়েছিলেন। আমি লিখিত নিশ্চয়তার দাবি জানাই এবং সেটি না পাওয়া পর্যন্ত অনশন ভাঙিনি।
অপূর্ণ রয়ে গেল একটি আক্ষেপ
ওয়াংচুক বলেন, তার আশা ছিল সংসদ সদস্য, ককরোচ জনতা পার্টির সদস্য এবং লাদাখ থেকে আসা প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে তিনি অনশন ভাঙবেন। কিন্তু মন্ত্রীরা গভীর রাতে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগে তাদের অনেককেই তার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো, আমার সহকর্মী, আন্দোলনরত শিক্ষার্থী এবং আমাকে সমর্থন জানাতে আসা সংসদ সদস্যরা আমার অনশন ভাঙার সময় পাশে থাকতে পারেননি।
