×

শেষের পাতা

বিচারপতিরা আয়নাঘরে গিয়ে দেখলেন নির্যাতনের আলামত

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বহুল আলোচিত আয়নাঘর বা র‌্যাব পরিচালিত কথিত গোপন বন্দিশালার বাস্তব চিত্র এবার সরজমিন দেখলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারপতিরা। রাজধানীর উত্তরায় র‌্যাব-১ সদর দপ্তরের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল পরিদর্শন শেষে প্রসিকিউশন একে নির্মম নির্যাতনকেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করলেও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের দাবি, এটি আদৌ কথিত আয়নাঘর কিনা, তা নিয়েই যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বিচারাধীন মামলার প্রেক্ষাপটে এই পরিদর্শনকে মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। গতকাল শনিবার বেলা ১১টার দিকে ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার, সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী টিএফআই সেল পরিদর্শন করেন।

এ সময় প্রধান কৌঁসুলি (চিফ প্রসিকিউটর) মো. আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রসিকিউশন টিম, আসামিপক্ষের আইনজীবী, তদন্ত কর্মকর্তা, মানবাধিকারকর্মী, ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শন শেষে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রচলিত আইন, রোম স্ট্যাটিউট ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যবিধি অনুযায়ী বিচারকদের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সুযোগ রয়েছে। বিচার কেবল সাক্ষ্য ও নথির ওপর নির্ভর করে না; ঘটনাস্থল পরিদর্শনও বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি দাবি করেন, টিএফআই সেলে ছোট-বড় মিলিয়ে ২৯টি কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ কক্ষ রয়েছে, যেখানে একজন মানুষের স্বাভাবিকভাবে শোয়ারও সুযোগ নেই।

তদন্ত ও সাক্ষ্য অনুযায়ী, এসব কক্ষে মানুষকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর চোখ ও হাত বেঁধে আটকে রেখে নির্যাতন করা হতো। চিফ প্রসিকিউটরের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ ও ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান এই সেলে আটক ছিলেন। অনেককে পরে বিভিন্ন মামলায় আদালতে হাজির করা হলেও বহু মানুষকে হত্যা করে গুম করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, ইলিয়াস আলীসহ প্রায় আড়াই শতাধিক গুমের শিকার ব্যক্তির এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তিনি আরো বলেন, আটক ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা বা পরিবারের সদস্যদের অবহিত করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মানা হয়নি। তার মতে, বেআইনি আটক, গুম ও হত্যা মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়ে।

আমিনুল ইসলাম বলেন, অনেকেই আয়নাঘরকে রূপকথা মনে করতে পারেন, কিন্তু এটি বাস্তব। এই স্থাপনাই তৎকালীন রাষ্ট্রব্যবস্থার চরিত্র উন্মোচন করেছে। যাদের কমান্ড দায়িত্ব ছিল, যারা মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়ন করেছেন ও যারা রাজনৈতিকভাবে এসব অপরাধে সহায়তা করেছেন- তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা উচিত। তিনি অভিযোগ করেন, ভবনের ভেতরে দেয়াল তুলে আলামত গোপনের চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে সেই দেয়াল সরানোর পর ২৯টি কক্ষ ও কথিত ডেথ সেলের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। আলামত নষ্ট বা গোপনের সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তবে প্রসিকিউশনের এসব বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। র?্যাবের সাবেক ৭ কর্মকর্তার পক্ষে আইনজীবী তাবারক হোসেন বলেন, টিএফআই কোনো নির্দিষ্ট ভবনের নাম নয়; এটি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত একটি টাস্কফোর্স। তাই টিএফআই বলতে নির্দিষ্ট একটি স্থাপনাকে বোঝানো সঠিক নয়।

তিনি আরো দাবি করেন, অভিযোগপত্র অনুযায়ী আটক ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা আদালতের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। টর্চার সেলের অভিযোগ আদালতেই প্রমাণ করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ভবনের ছোট ছোট কক্ষ প্রসঙ্গে তাবারক হোসেন বলেন, নিরাপত্তা ইউনিটে অস্থায়ীভাবে আটক ব্যক্তিদের রাখার জন্য এ ধরনের সেল থাকা অস্বাভাবিক নয়। ২৪ ঘণ্টার বেশি কাউকে সেখানে রাখা হয়েছিল কিনা, সেটি আদালতেই প্রমাণের বিষয়। এ ছাড়া তিনি দাবি করেন, গুম কমিশনের সদস্যরাও পরিদর্শনের সময় কিছু অসামঞ্জস্যের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তাদের পর্যবেক্ষণে, ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় যে নির্দিষ্ট সময় পরপর বিমান বা ট্রেনের শব্দ শোনার কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে তা মেলেনি। ফলে এটি কথিত আয়নাঘর কিনা, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আসামিপক্ষের অপর এক আইনজীবী এ বি এম হামিদুল মেসবাহ বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কাউকে আদালতে হাজির করতে ব্যর্থ হওয়া বিভাগীয় অপরাধ হতে পারে, কিন্তু সেটিকে মানবতাবিরোধী অপরাধ বলা যায় না। তিনি বলেন, বিচার অবশ্যই হতে হবে, তবে তা হতে হবে নিরপেক্ষ ও ন্যায়সংগত। প্রকৃত অপরাধীকে শাস্তি দিতে হবে, কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন দণ্ডিত না হন। রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেনও পরিদর্শন শেষে বলেন, যে স্থানটি দেখা হয়েছে সেটিই কথিত আয়নাঘর কিনা, সে বিষয়ে তার সন্দেহ রয়েছে। একজন ডিফেন্স আইনজীবী হিসেবে তিনি মনে করেন, এটি পরবর্তীকালে নির্মিত বা পরিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে। জানা গেছে, গত ২১ জুলাই প্রসিকিউশনের আবেদনের পর ট্রাইব্যুনাল বিচারকার্য আরো স্বচ্ছ ও বাস্তবভিত্তিক করতে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের অনুমতি দেয়। আগামী শনিবার ঢাকা সেনানিবাসে ডিজিএফআই কার্যালয়ে থাকা আরেকটি কথিত গোপন বন্দিশালাও পরিদর্শনের কথা রয়েছে।

বর্তমানে টিএফআই সেলে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। মামলাটির বিচার শুরু হয় গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর। মামলার ১০ আসামি বর্তমানে ঢাকা সেনানিবাসের বিশেষ সাব-জেলে রয়েছেন, আর বাকি সাতজন পলাতক। পলাতকদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সাবেক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক র?্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদসহ কয়েকজন সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রয়েছেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

রাজধানীতে আরো ২ মেট্রোরেল, যুক্ত হচ্ছে যেসব এলাকা

রাজধানীতে আরো ২ মেট্রোরেল, যুক্ত হচ্ছে যেসব এলাকা

রিমান্ডে শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন

রিমান্ডে শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন

পেট্রোল ঢেলে সাবেক স্ত্রীকে হত্যা, অভিযুক্ত স্বামী আটক

পেট্রোল ঢেলে সাবেক স্ত্রীকে হত্যা, অভিযুক্ত স্বামী আটক

ম্যাচ চলাকালীন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারকে গুলি করে হত্যা

ম্যাচ চলাকালীন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারকে গুলি করে হত্যা

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App