আওয়ামী লীগের বিচার-দল হিসেবে নিষিদ্ধ করার প্রশ্নে চ্যালেঞ্জ কোথায়?
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কাগজ ডেস্ক
ছাত্র আন্দোলনে ক্ষমতা হারিয়ে ভারতে চলে যাওয়ার দুই বছরের মাথায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা যখন আবার দেশে ফেরার কথা বলছেন, ঠিক এই সময়েই দেশে দলটির বিচারের তৎপরতা চলছে। তবে বিচারে সরকারের কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি বাংলা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ঠিক দুই বছর যেদিন পূর্ণ হয়, সেদিন গত ৫ অগাস্ট দিল্লিতে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি প্রশ্নোত্তরে অংশ নিয়ে ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার কথাটি জোর দিয়ে বলেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি বাংলাদেশের আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। আবার বাংলাদেশে তার দল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা তো রয়েছেই, এখন রাজনৈতিক দল হিসেবে সংগঠনটির বিচারের তৎপরতাও শুরু হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইন সংশোধন করে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের পথ তৈরি করেছে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। অভ্যুত্থানের পক্ষের দলগুলোর দাবির মুখে নির্বাহী আদেশে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেছিল তারা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, একটি দলের অভিযোগের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের বিচারের লক্ষ্যে এখন তদন্ত চলমান আছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩, রোম স্ট্যাটিউট, সন্ত্রাস দমন আইন মাথায় রেখে আমরা ইনভেস্টিগেশন করছি। এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে চব্বিশের ৫ অগাস্ট পর্যন্ত সমস্ত কার্যক্রম ইনভেস্টিগেশনের স্বার্থে বিচার-বিশ্লেষণ করা হবে। সেখানে যদি সংগঠন হিসেবে কোনো মানবতাবিরোধী অপরাধের সংশ্লিষ্টতা এ দলের থাকে, কিংবা কোনো সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ভূমিকা থেকে থাকে, সেক্ষেত্রে এ সংগঠনকে বিচারের সম্মুখীন করা হবে।
দল নিষিদ্ধ ইস্যুতে ভিন্নমত : বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাইব্যুনালে বিচারের আওতায় এনে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যাচ্ছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপিসহ জুলাই অভ্যুত্থানের নেপথ্যের দলগুলোকে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মো. রাশেদ খাঁন, যিনি ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে গণঅধিকার পরিষদের নেতা ছিলেন, তিনি
বলেন, আমি মনে করি বাংলাদেশের যে বাস্তবতা, এই বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের রাজনীতি আর সম্ভবপর নয় এবং আওয়ামী লীগ আর ফিরে আসতে পারবে না। দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে বিচার করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলছে।
ট্রাইব্যুনালে দলের বিচারের তৎপরতা নজিরবিহীন, কারণ বাংলাদেশে আদালতের বিচারের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক দলের বিচার ও নিষিদ্ধ করার নজির এখনো নেই। অবশ্য নির্বাহী আদেশে রাজনৈতিক সংগঠন দল বা সংগঠন নিষিদ্ধ করার দৃষ্টান্ত রয়েছে। সবশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগমুহূর্তে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অবাধ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের স্বার্থে যেকোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিরোধিতা করে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। সম্প্রতি ট্রাইব্যুনালের বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এ অবস্থায় ট্রাইব্যুনালে রাজনৈতিক দলের বিচার দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্য করার একটা চ্যালেঞ্জ থাকবে।
সাবেক বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মো. মনসুরুল হক চৌধুরী বলেন, দলের বিচারের আইন তো আগে ছিল না, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এটা নতুন করে সংশোধন করা হয়েছে। টোয়েন্টি বি একটা নতুন সেকশন নিয়ে আসা হয়েছে এবং আমার মতে এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিয়ে আসা হয়েছে। আইন সংশোধন করে ট্রাইব্যুনালে রাজনৈতিক দলের বিচারের এখতিয়ার দেয়া হয়েছে।
মনসুরুল হক বলেন, দলগতভাবে যদি সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে দলীয়ভাবে এটা হতে হবে। দলীয় সিদ্ধান্তে প্রেক্ষিতে যদি কোনো ক্রাইম অ্যাগেইনস্ট হিউম্যানিটি (মানবতাবিরোধী অপরাধ) হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে অবশ্যই ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতা যেটা দেয়া আছে, সেটা আরোপ করা যেতে পারে। এটা এখনো তদন্ত পর্যায়ে আছে। এটা নিয়ে খুব বেশি বলা যৌক্তিক হবে না।
দল হিসেবে বিচার ও নিষিদ্ধ হলে আইনগত বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করতে হবে বলে মনে করেন মনসুরুল হক। তিনি বলেন, আমি মনে করি সরকারে যারা আছেন তারা চিন্তা করবেন এটা কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ হবে; এটাতে যাওয়াটা কী আদৌ সমীচীন হবে কি না। কারণ জনসমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। এত বড় একটা দলকে আপনি নিষিদ্ধ করবেন, রাজনীতি করতে পারবে না; সেটা অবশ্যই সমর্থকরা মেনে নেবে কি না এটা জানি না। ভবিষ্যৎই এটা নির্ধারণ করবে।
ট্রাইব্যুনাল আইন বা সন্ত্রাসবিরোধী আইনে বিচারের জন্য দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে অপরাধ করেছে এর প্রমাণ লাগবে। এটা প্রমাণ করা কঠিন হবে বলেও মনে করেন মনসুরুল হক চৌধুরী। নীতিগতভাবে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের পক্ষে নন বলেও জানান মনসুরুল।
তার মতে, ব্যক্তির অপরাধের বিচার অবশ্যই হতে পারে, তবে বিশাল একটি দলকে রাজনীতি করার সুযোগ না দিলে সেটা গণতন্ত্রের পরিপন্থি হবে, সংবিধানেরও পরিপন্থি হবে।
রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারে আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রসঙ্গে জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, যেটা ইনভেস্টিগেশন করছে সেটা যদি যথার্থ তথ্য-উপাত্ত দিয়ে ভালোভাবে তুলে ধরে, তাহলে এটার বিপক্ষে কোনো নৈতিক যুক্তি হাজির করা খুব ডিফিকাল্ট হবে। তদন্তটা নিশ্চিদ্র তদন্ত হতে হবে। তার মধ্যে কোনো রকম পক্ষপাতিত্ব থাকতে পারবে না। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, তদন্ত যে সত্য, তার ফাইন্ডিংসগুলো যে সত্য সেইটা প্রমাণ করার জন্য যে সমস্ত সাক্ষ্য-প্রমাণাদি দরকার সেগুলো ভালোভাবে উল্লেখ করতে হবে। তার ওপর, এটার পক্ষে একটা বিশ্ব জনমত তৈরি করতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের পর নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করেছিল। ফলে গত ফেব্রুয়ারিতে হওয়া ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে পারেনি। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশটিতে কিছু সংশোধনী এনে ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ হিসেবে জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছে।
এটি পাশের সময় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, বিলটি হলো একটি গণত্যাকারী সন্ত্রাসী সংগঠনের নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত সংশোধনী। আগের যে আইন ছিল সেটা সংশোধনের জন্য। ওনারা (জামায়াত) ও এনসিপির বন্ধুরা সবাই মিলে একটা আন্দোলন করেছিলেন। সে প্রেক্ষিতে মোটামুটি একটা জনমত সৃষ্টি হয়েছিল। সে প্রেক্ষিতে তাদের (আওয়ামী লীগ) কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে। এর ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশনে তাদের রেজিস্ট্রেশন স্থগিত হয়ে আছে। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইসিটি অ্যাক্টে সংগঠনটির বিচারের জন্য সে আইনও সংশোধন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
