সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী শিপ ইয়ার্ডে ঝরে গেল ৮ তরতাজা জীবন
চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ভাটিয়ারী সমুদ্র উপকূলে একটি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে একটি অয়েল ট্যাংকার থেকে বিষাক্ত গ্যাস লিকেজ ও বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্ততপক্ষে ৮ জন নিহত ও ১৫ জন আহত হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার সকাল আনুমানিক সাড়ে আটটা থেকে নয়টার মধ্যে ভাটিয়ারী স্টেশন রোডসংলগ্ন ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের একটি স্ক্র্যাপ জাহাজে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। ওই জাহাজটি এলএনজি (লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস) বহনকারি ট্যাংকার ছিল।
ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা, জাহাজের ভেতরে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে এ দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে ঠিক কোন গ্যাসের কারণে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। কুমিরা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ আল মামুন এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অপর কয়েকজনকে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম আশেক বলেন, দুপুর ১২টার পর ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ডের ঘটনায় আহত ছয়জনকে চমেক হাসপাতালে আনা হয়। পরে চিকিৎসকেরা তাদের মধ্যে পাঁচজনকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৬ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭) এবং দুই সহোদর মনসুর আলী (৪০), নাসির উদ্দিন (৩৮) এবং মোহাম্মদ হাবিব। তারা সবাই ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা। এ ছাড়া গাইবান্ধা এলাকার রানা নামের এক যুবক যিনি ওই ইয়ার্ডের শ্রমিক ছিলেন তিনিও মারা গেছেন।
ইয়ার্ডের ম্যানেজার মোহাম্মদ ইউসুফ দাবি করেন, শুক্রবার ইয়ার্ডের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। সকালে স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজের একটি ট্যাংকে লিকেজ দেখা দেয়। বিষয়টি দেখতে স্থানীয় ও বহিরাগত কয়েকজন সেখানে গেলে তারা গ্যাসে আক্রান্ত হন। এতে কয়েকজনের মৃত্যু হয় এবং কয়েকজন আহত হন। স্থানীয়রা
জানান, হঠাৎ কারখানার ভেতর থেকে মানুষের চিৎকার শুরু হয়। তারা কারখানা এলাকায় গিয়ে দেখেন, অসুস্থ কয়েকজনকে গাড়িতে করে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে। পরে জাহাজের ভেতরে কয়েকজনের মৃতদেহ পড়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে কারখানার ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুক্রবার কারখানাটি বন্ধ থাকার কথা থাকলেও শ্রমিকদের দিয়ে ইয়ার্ডে কাজ করানো হচ্ছিল। কাজ চলার সময় সেফটি টিমের সদস্যরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন না বলে তারা দাবি করেন। তাদের অভিযোগ, জাহাজের ভেতরে জমে থাকা তরল বর্জ্য বা গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা না করেই শ্রমিকদের সেখানে প্রবেশের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। তাদের দাবি, এটি মালিকপক্ষের গাফিলতি। বন্ধের দিনও সেখানে কাজ চলছিল। বিষয়গুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ইয়ার্ডে ওই জাহাজে কাজ করার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। তবে ঘটনার দুই ঘণ্টারও বেশি সময় পর সকাল ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে ফায়ার সার্ভিসকে বিষয়টি জানানো হয়। স্থানীয় জেলেরা বলেন, ইয়ার্ড থেকে বের হওয়া গ্যাসের গন্ধ এতটাই তীব্র ছিল যে সাগরে ইলিশ ধরতে যাওয়া জেলেরা ইয়ার্ডের পাশের খালে ঢুকতে পারেননি। পরে তারা প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে নৌকা ভেড়ান।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, জাহাজে বিষাক্ত গ্যাস নির্গমনের ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। গ্যাস নির্গমনের কারণ এবং ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, খবর পাওয়ার পর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে এবং ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।
তবে দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের সঙ্গে অন্যদের বক্তব্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদ জানিয়েছেন, স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় গ্যাস লিকেজ ও বিস্ফোরণ ঘটে। তবে কীভাবে হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি।’
