×

শেষের পাতা

নারীর প্রতি সহিংসতার প্রকৃত চিত্র খুব ভয়াবহ

মহিলা পরিষদের মানববন্ধন

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

গত সাত মাসে দেশে ১ হাজার ৬৬৭ জন নারী ও শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন এবং ২৯২ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩১টি ঘটনা ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে জমিজমা নিয়ে বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা, পারিবারিক বিরোধসহ বিভিন্ন কারণ। নারীর প্রতি সহিংসতার প্রকৃত চিত্র আরো ভয়াবহ হতে পারে। নারীর মানবাধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বক্তারা।

গতকাল রবিবার সারাদেশে অব্যাহত নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ, হত্যা ও শিশু হত্যার প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন কর্মসূচিতে এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা। বিকালে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি হিসেবে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত এই মানববন্ধন কর্মসূচি পরিষদের সব জেলা শাখায়ও অনুষ্ঠিত হয়েছে। কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। বক্তব্য রাখেন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. মাসুদা রেহানা বেগম; আন্দোলন সম্পাদক রাবেয়া খাতুন শান্তি; ঢাকা মহানগর কমিটির লিগ্যাল এইড সম্পাদক শামীমা আফরোজ আইরীন; সাংগঠনিক সম্পাদক কানিজ ফাতেমা টগর এবং কেন্দ্রীয় কমিটির লিগ্যাল অ্যাডভোকেসি ও লবি পরিচালক অ্যাড. দীপ্তি শিকদার। কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রোগ্রাম অফিসার সিজুল

ইসলাম, ঢাকা ওয়াইডব্লিউ সিএ অব বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তার। আরো উপস্থিত ছিলেন অভিযান ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি। কর্মসূচি পরিচালনা করেন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির নেটওয়ার্কিং ও অ্যাডভোকেসি পরিচালক জনা গোস্বামী।

ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, আমাদের হাতে যে তথ্য-উপাত্ত এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, গত সাত মাসে ৮৩ জন কন্যাশিশু ও ২৫৮ জন নারী হত্যার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩১টি ঘটনা ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে জমিজমা নিয়ে বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা, পারিবারিক বিরোধসহ বিভিন্ন কারণ। কিন্তু এটি শুধু হত্যার সংখ্যা নয়; হত্যার ধরন ও নৃশংসতাও আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে। তিনি বলেন, আমরা যে তথ্য পাচ্ছি, তা মূলত সীমিতসংখ্যক সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত। মাত্র ১৪টি পত্রিকার তথ্যের ভিত্তিতে এই চিত্র পাওয়া গেছে। অথচ দেশে আরো অসংখ্য সংবাদমাধ্যম রয়েছে। সব সংবাদমাধ্যমের তথ্য যদি আমাদের হাতে আসত, তাহলে নারীর প্রতি সহিংসতার প্রকৃত চিত্র আরো ভয়াবহ হতে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশে নারীর নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার কতটা নিশ্চিত?

তিনি আরো বলেন, সমাজে বৈষম্য দূর করতে হলে শুধু বৈষম্য কমেছে কিনা, তা নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না; বৈষম্যের প্রবণতা ও এর কাঠামোগত কারণগুলোও বিবেচনা করতে হবে। নারীসহ সমাজের সব মানুষের মানবাধিকার নিশ্চিত করা এবং বৈষম্য দূর করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি এসময় দৃঢ়ভাবে বলেন, নারীদের ভয় দেখিয়ে ঘরে ফেরানো যাবে না। নারীরা তাদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত থাকবে। নারী হত্যা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে আমরা সোচ্চার থাকব এবং এমন একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য কাজ করব, যেখানে নারীকে হত্যা, ধর্ষণ বা নির্যাতনের শিকার হতে হবে না। তিনি বলেন, মহিলা পরিষদ শুধু বিচার দাবি করবে না; নারী হত্যা ও সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, দ্রুত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং সামাজিকভাবে সহনশীল পরিবেশ তৈরির জন্য ধারাবাহিকভাবে কাজ করবে। নারীর মানবাধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

মালেকা বানু বলেন, বাংলাদেশের নারী ও শিশুরা আজ কোনো জায়গাতেই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। শুধু ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতাই নয়; হত্যা, নির্যাতন ও নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে নারী ও শিশুরা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সহিংসতার প্রবণতা আমরা কমাতে পারছি না। যে শিশুটি এখনো শারীরিক ও মানসিকভাবে পূর্ণ বিকাশ লাভ করেনি, যে শিশু এখনো নিজেকে একজন নারী হিসেবে চিহ্নিত করার বয়সে পৌঁছায়নি, সেই শিশুও যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো অপরাধীরা বিভিন্ন বয়সের মানুষ। শিশু, কিশোরী, তরুণী কিংবা বৃদ্ধা কেউই এই সহিংসতার বাইরে নয়। যদি কেউ মনে করেন, ১৬ কোটি, ১৮ কোটি বা ২০ কোটি মানুষের দেশে কয়েকশ নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতার ঘটনা সংখ্যার বিচারে খুব বেশি নয়, তাহলে আমরা সেই ধারণাকে ধিক্কার জানাই। একটি নারী বা একটি শিশুর জীবনও কোনোভাবেই নগণ্য নয়। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে নারী ও শিশুরা স্বাধীনভাবে, নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে চলাফেরা করতে পারবে। যেখানে পরিবার হবে নিরাপদ, সমাজ হবে সহনশীল এবং রাষ্ট্র হবে তাদের অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দাতা। নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং প্রতিটি নাগরিককে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব নিতে নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি আরো বলেন নারী ও শিশুর চারপাশে একটি শক্তিশালী নিরাপত্তাবলয় তৈরি করতে হবে, যাতে তারা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে তাদের অধিকার ভোগ করতে পারে। একই সঙ্গে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানান। পাশাপাশি বলেন, শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর বিচার করলেই হবে না। কীভাবে এই অপরাধ প্রতিরোধ করা যায়, কীভাবে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সহিংসতার সংস্কৃতি বন্ধ করা যায়- সেদিকেও সমান গুরুত্ব দেয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন।

অন্য বক্তারা বলেন, নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতা আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। বাংলাদেশ আজ ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যেকোনো সহিংসতার ঘটনায় নারীকে প্রধান টার্গেট করা হয়। প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক বৈষম্যমূলক রীতিনীতি নারীকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে না। নারীর প্রতি অব্যাহত সহিংসতা, ধর্ষণ, হত্যা ও শিশু হত্যা প্রতিরোধে ও ভূলুণ্ঠিত মানবাধিকার পুনরুদ্ধারে বক্তারা এসময় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি আইনের সঠিক প্রয়োগ, আইন বাস্তবায়নে মনিটরিং করাসহ রাষ্ট্রপ্রধানকে দেশপ্রেম, মানবতাবোধ ও দায়িত্ববোধ থেকে রাষ্ট্রপরিচালনার আহ্বান জানান।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

পুলিশের তদন্তে সন্তুষ্ট না হলে উচ্চতর তদন্তের দাবি জানাবেন স্বজনরা

সিলেটে ট্রিপল মার্ডার পুলিশের তদন্তে সন্তুষ্ট না হলে উচ্চতর তদন্তের দাবি জানাবেন স্বজনরা

আল-কায়েদা প্রসঙ্গে জাতিসংঘের রিপোর্ট নিয়ে যা বললেন স্বরাষ্টমন্ত্রী

আল-কায়েদা প্রসঙ্গে জাতিসংঘের রিপোর্ট নিয়ে যা বললেন স্বরাষ্টমন্ত্রী

শেরপুরে কারাগার পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন

শেরপুরে কারাগার পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন

হামের দাপটে উদ্বেগ বাড়ছে সিলেটে, হাসপাতালে রোগীর চাপ

হামের দাপটে উদ্বেগ বাড়ছে সিলেটে, হাসপাতালে রোগীর চাপ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App