ছায়ানটের অনলাইন সংগীত প্রশিক্ষণ
প্রবাসী ও ঢাকার বাইরের সংগীতানুরাগীদের জন্য উদ্যোগ
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছায়ানটের বাঙালি-সংস্কৃতি সাধনা ও প্রসারের মূল কেন্দ্র ধানমণ্ডির সংস্কৃতি-ভবন। এবারে সে সাধনা ঢাকার বাইরে এবং গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাঙালির ঘরে পৌঁছে দেবার উদ্যোগ নিয়েছে ছায়ানট। সেই লক্ষ্যে প্রবাসী বাংলাভাষী এবং ঢাকার বাইরের সংগীতানুরাগীদের অনলাইন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু করছে ‘ছায়ানট’। প্রথম ধাপে, ছায়ানট থেকে পরিচালিত গানের প্রাথমিক পাঠের অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে।
গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় ‘সংগীত-পরিচয়’ শিরোনামের গানের প্রাথমিক পাঠের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অনলাইন ক্লাস শুরু হয়। এরপর ২০ সেপ্টেম্বর থেকে অগ্রসর গাইয়েদের জন্য শুরু হবে বিশেষ ধাপ ‘নিবিড় শিক্ষণ’।
গতকাল বিকালে ছায়ানটের সংস্কৃতি-ভবনের রমেশচন্দ্র দত্ত স্মৃতি মিলনকেন্দ্রে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই প্রসারিত আয়োজনের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। পুরো বিষয় নিয়ে আলোকপাত করেন ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী এবং সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসা। উপস্থিত ছিলেন ছায়ানট সঙ্গীবিদ্যায়তনের নবনিযুক্ত অধ্যক্ষ
সেলিনা মালেক চৌধুরী এবং চার প্রশিক্ষক, সংগীতশিল্পী শারমিন সাথী ইসলাম, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, মোস্তাফিজুর রহমান তূর্য ও টিংকু কুমার শীল। পাশাপাশি দেশ ও প্রবাসী শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাশেদ জামিল- আমেরিকা, প্রিয়াংকা সাহা- অস্ট্রেলিয়া, হাসিব মাহমুদ- জার্মানি, ইসরাত বিনতে ওয়াহিদ- লন্ডন, অর্পিতা দাশগুপ্ত- সিলেট, হামীম উর রহমান খান- লালমনিরহাট থেকে অনলাইনে যুক্ত হয়ে তাদের অনুভূতি জানিয়েছেন।
ছায়ানটের নাগাল বাড়ানোর নবউদ্যোগে ‘সংগীত-পরিচয়’ শিরোনামে শেখানো হচ্ছে লোকসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত ও সরগম। প্রথম ক্লাস গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত ৯টা। পাঠ দেয়া হয়, বয়সভেদে, শিশু-কিশোর এবং সাধারণ শাখায়। দুই শাখা মিলিয়ে ভর্তি হয়েছেন ১২১ জন। এর মধ্যে আছেন উত্তর আমেরিকার ১২ জন, ইউরোপের ৭ জন, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও ভারতের ৯ জন এবং দেশের ৯৩ জন।
অনলাইন পাঠের পরের ধাপ, ‘নিবিড় শিক্ষণ’-এ যুক্ত হবেন অগ্রসর গাইয়েরা। গান শেখাবেন ৩ গুণী শিল্পী ও শিক্ষক কিরন চন্দ্র রায় (লোকসংগীত), খায়রুল আনাম শাকিল (নজরুলসংগীত) এবং লাইসা আহমদ লিসা (রবীন্দ্রসংগীত)। ক্লাস শুরু হবে ২০ সেম্প্টেম্বর ২০২৬। প্রতি রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে সোয়া ৭টা। চলছে শিক্ষার্থী নির্বাচনের সাক্ষাৎকার।
ছায়ানটের দূরশিক্ষণের উদ্যোগ এই প্রথম নয়। সন্?জীদা খাতুনের তত্ত্বাবধানে, ২০২০ সালে ইউটিউবে শুরু হয়েছিল ধ্বনিমুদ্রিত (রেকর্ডেড) দূরশিক্ষণের প্রকাশ, ‘গানের নিবিড় পাঠ’। একই সঙ্গে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত ও লোকসংগীত নিয়ে কথা এবং গানের পাঠের প্রশিক্ষক ছিলেন সন্?জীদা খাতুন, খায়রুল আনাম শাকিল এবং চন্দনা মজুমদার। খায়রুল আনাম শাকিল এবং চন্দনা মজুমদারের তত্ত্বাবধানে এখনো সে আয়োজন চলছে ইউটিউব ও ফেইসবুকে।
তবে, সাড়ম্বরে ছায়ানটের সোশাল মিডিয়ায় আত্মপ্রকাশ ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর। উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে হাজার হাজার দেশভক্তের গাওয়া প্রাণের জাতীয়সংগীত দিয়ে। সে দিন থেকে, বিরামহীনভাবে দৈনিক ও সাপ্তাহিক ছোট-বড়ো নানান পরিবেশনায়, দেশ-বিদেশের মানুষকে সংস্কৃতির ছোঁয়া দিয়ে চলেছে ছায়ানট।
সংগীত-সংস্কৃতির মাধ্যমে আজন্মই মানুষের সুকুমারবৃত্তি সজাগ রাখার কাজ করে চলেছে ছায়ানট। পাকিস্তানি শোষণ ও দুঃশাসনের আমলে যা ছিল স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলনের অংশ। এখন নিজেকে চিনে-জেনে বিশ্বমানব হবার প্রত্যয়। জনমানসকে সম্পৃক্ত করতে, শুরু থেকেই উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে আয়োজিত হয়েছে শরৎ ও বসন্তের অনুষ্ঠান এবং মিলনায়তন বা গৃহে শ্রোতার আসর, বর্ষাবরণ, রবীন্দ্র-নজরুল জন্মজয়ন্তী। আপন সংস্কৃতিতে বাঁচবার আকাক্সক্ষা বলবান-বেগবান হবার সঙ্গে সঙ্গে যোগ হয়েছে, উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে বাঙালির সর্ববৃহৎ সার্বজনীন উৎসব বর্ষবরণ, দেশঘরের গান, বিজয়-উৎসব; ঘরের নিয়মিত আয়োজন সকল জাতীয় দিবস, লোক গীতিকবিদের স্মরণ, রবীন্দ্র-নজরুল প্রয়াণবার্ষিকী। জন্মাবধিই ছায়ানট কিছু অনুষ্ঠান এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে ছুটে গেছে দেশের নানা প্রান্তে। দাঁড়িয়েছে দুর্গত মানুষের পাশে; স্বস্তির প্রলেপ যুগিয়েছে সংস্কৃতি বুভুক্ষু জনপদে। ফলে আপামর জনতার সঙ্গে কখনোই বিচ্ছিন্ন ছিল না ছায়ানট। তবে ক্রমান্বয়ে সংগঠন থেকে প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত এই গোষ্ঠীর সব নিয়মিত আয়োজনই ঢাকা বা রাজধানীকেন্দ্রিক। সোশাল মিডিয়ায় আত্মপ্রকাশের পর এখন দূরের মানুষ হয়ে উঠছেন নিত্যসঙ্গী। সেই প্রেরণা থেকেই ছায়ানটের নবোদ্যম, অনলাইন ক্লাস।
