×

শেষের পাতা

মূল্যস্ফীতি-বিনিয়োগ-কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। পরিস্থিতি উত্তরণে শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন তারা।

গতকাল শনিবার ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বি-বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি : প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে এই দাবি জানানো হয়।

এর প্রেক্ষিতে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকার প্রত্যেকটি এনার্জি সেক্টরে ৩ মাসের রিজার্ভ নিশ্চিতে কাজ করছে। দায়িত্ব নেয়ার সময় দেশের কোনো কোনো এনার্জি খাতে ১৫ দিন বা ১৭ দিনের রিজার্ভও ছিল না। বর্তমানে সেই রিজার্ভ এক মাসে উন্নীত করা সম্ভব হয়েছে। এখন এটিকে ৩ মাসে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত এই সেমিনার রাজধানীর মতিঝিলে সংগঠনের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ স্বাগত বক্তব্য ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। সেমিনারের প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, ট্রান্সকম লিমিটেডের গ্রুপ সিইও সিমিন রহমান, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক এবং সেন্ট্রাল ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান।

অর্থমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি খাতের বিদ্যমান সমস্যা এক মাসে সমাধান করা সম্ভব নয়। সরকার যে পরিস্থিতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, সেখান থেকে দ্রুত উত্তরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নিয়ে আলোচনা

চলছে। একই সঙ্গে স্থলভিত্তিক গ্যাসের উৎস অনুসন্ধান এবং পাইপলাইন স¤প্রসারণ নিয়েও কাজ শুরু হয়েছে।

বিনিয়োগ ছাড়া অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে না

অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা না গেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও ফিরবে না। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অতীতে মূলত বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করে হয়েছে। সরকারের লক্ষ্যও বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। বেসরকারি খাত অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করবে এবং সরকারের দায়িত্ব হবে ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ, সহায়তা ও সুযোগ তৈরি করা।

ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সহজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, শুধু নতুন নীতিমালা ঘোষণা করলেই হবে না, সেগুলোর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসায়ীরা কোথায় বাধার মুখে পড়ছেন, তা জানানোর জন্য একটি ওয়েবসাইট চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

কাস্টমস, বন্দর ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে ব্যবসার খরচ কমানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটি বৈঠকেই প্রায় ৮ থেকে ১০টি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আমদানির পর পণ্য খালাসে কত সময় লাগবে, কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের কোন কাজ কত দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে- এসব বিষয়ে সময়সীমা নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

পুনঃতফসিল ও এককালীন নিষ্পত্তি

শিল্প খাতের খেলাপি ঋণের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে অনেক ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন নিষ্পত্তির সুযোগ দিয়েছে। যেসব উদ্যোক্তা ব্যবসা চালিয়ে যেতে চান, তাদের জন্য পুনঃতফসিলের মাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ও গ্রেস পিরিয়ড পাওয়ার সুযোগ থাকবে। আর যারা ব্যবসা থেকে বের হয়ে যেতে চান, তারা এককালীন নিষ্পত্তির মাধ্যমে ঋণ পরিশোধ করে বের হওয়ার সুযোগ পাবেন। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে এ প্যাকেজ কার্যকর হবে জানিয়ে আমির খসরু বলেন, যোগ্য ব্যবসায়ীরা কোনো ব্যাংকে এ সুবিধা পেতে বাধার মুখে পড়লে সরকারকে বিষয়টি জানাতে হবে। ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে এমন সম্পদ দেখিয়ে লাভ নেই, যেগুলোর অর্থ বাস্তবে আর ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এসব সম্পদ নিষ্পত্তির মাধ্যমে ব্যাংকের ব্যালান্সশিট পরিষ্কার করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের নতুন করে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ দেয়া হয়েছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

আর্থিক খাতে রাজনৈতিক নিয়োগ হবে না

আর্থিক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ রাখা হবে না বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, যোগ্যতা ও নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণকারীরাই আর্থিক খাতে সুযোগ পাবেন। আমরা ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরে কোনো রাজনৈতিক অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেব না। আর্থিক খাতের সংবেদনশীলতার কারণে এখানে রাজনীতির কোনো স্থান থাকা উচিত নয়।

মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান কর্মসংস্থান তৈরিতে দেশের ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ার বিষয়ে কথা বলেন। খেলাপি ঋণ কমাতে কাঠামোগত সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের অগ্রগতি নজরদারির জন্য ‘ইকোনমিক রিফর্ম অ্যাক্সিলারেশন ইউনিট’ গঠনের প্রস্তাবও দেন।

মাহবুবুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় নামেনি। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দীর্ঘদিনের মধ্যে নি¤œ পর্যায়ে রয়েছে এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা রয়েছে। উচ্চ সুদের হার, উৎপাদন ও আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়েছে।

ড. জায়েদি সাত্তার বলেন, নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। রপ্তানি পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি আমদানিতে উচ্চ শুল্কের কারণে স্থানীয় বাজারে পণ্যের দাম বাড়ছে কিনা, তা বিবেচনা করতে হবে। এলডিসি উত্তরণের জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে কর আহরণে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন। চলতি বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা কম। মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় মুদ্রানীতির সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বিদেশি ঋণ নেয়া ও পরিশোধের ক্ষেত্রেও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন।

ড. এ কে এনামুল হক বলেন, রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতির জন্য দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি উদ্বেগের বিষয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে। এ অবস্থায় ব্যাংক খাতে তারল্য বাড়ানোর পাশাপাশি বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সিমিন রহমান বলেন, বাজেটে ব্যবসা সহায়ক নীতি থাকলেও বেসরকারি খাতে প্রত্যাশিত গতি আসেনি। উচ্চ সুদ, মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং আর্থিক খাত থেকে সরকারের বেশি ঋণ নেয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। কাঁচামালের উচ্চমূল্যের কারণে শিল্প উৎপাদন কমছে জানিয়ে বন্দর ও কাস্টমসের লজিস্টিক সেবার দক্ষতা বাড়ানোর দাবি জানান।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মূল্যস্ফীতি, মুদ্রানীতি ও বাজেটের মধ্যে কাঠামোগত সমন্বয় জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। কর ব্যবস্থাপনার ডিজিটালাইজেশন ও দক্ষ জনবল তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, জ্বালানি সরবরাহসহ ব্যবসার সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত না হলে সুদের হার কমলেও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত মাত্রায় আসবে না।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সীমান্তে একদিনে বিপুল ভারতীয় পণ্য জব্দ

সীমান্তে একদিনে বিপুল ভারতীয় পণ্য জব্দ

গাজায় দাফনের জায়গাও ফুরিয়ে যাচ্ছে

গাজায় দাফনের জায়গাও ফুরিয়ে যাচ্ছে

ঈদে মিলাদুন্নবীর ছুটি পাবেন না যারা

ঈদে মিলাদুন্নবীর ছুটি পাবেন না যারা

৩ কোটি টাকার ভারতীয় মালামাল জব্দ করল যৌথবাহিনী

৩ কোটি টাকার ভারতীয় মালামাল জব্দ করল যৌথবাহিনী

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App