×

শেষের পাতা

সংকট মোকাবিলায় ‘ব্যর্থ’, একের পর এক বন্ধ হচ্ছে শিল্প-কারখানা

Icon

সেবিকা দেবনাথ

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দীর্ঘ দিনের সংকট কাটাতে না পেরে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস লিমিটেড নামে একটি পোশাক কারখানা। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মিরপুর এলাকায় অবস্থিত কারখানাটি বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল হাসান ফয়সাল। তিনি তার প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের উদ্দেশ্যে দেয়া এক চিঠির মাধ্যমে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

সেখানে তিনি লেখেন, ‘প্রিয় সহকর্মীরা, অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমরা প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে নোটিস দিতে যাচ্ছি। আমি নানান উপায়ে চেষ্টা করেছি প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার। কিন্তু সফল হতে পারলাম না। শুধু ব্যবসায়ীক মন্দার জন্যই না, কিছু মানুষের স্বার্থান্বেষী চেষ্টায়ও প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছি। গত দুই বছরে নানান কারণে ফ্যাক্টরির উৎপাদন বন্ধ থেকেছে। তারপরও বলব, আমাদের প্রতিষ্ঠানে অনেক দক্ষ এবং উৎসর্গী, নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলেন যারা আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন, আমাদের খারাপ সময়ে পাশে থেকেছেন, ধৈর্য ধরেছেন। এজন্য প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাছে তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন। তারা যেন নতুন কাজ খুঁজে পান, তারা যেন ভালো থাকেন। তাদের সবার কাছে আমি দোয়া চাই, আমি যেন ফ্যাক্টরির একটা সুব্যবস্থা করে সমস্ত পাওনাদারের পাওনা পরিশোধ করে একটা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারি। আর অন্য কোনো ব?্যবসার মাধ্যমে নিজেকে আবার প্রতিষ্ঠিত করতে পারি এবং আমাদের কিছু পুরনো কর্মী এবং কর্মচারীদের জন্য যেন কোনোভাবে আবার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারি।’ প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার কর্মী। এমন দৃশ্য শুধু ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস লিমিটেডের নয়। সংকটে ধুঁকে গত কয়েক মাসে অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। বেকার হয়েছে লাখ লাখ কর্মী।

এর আগে ৩ আগস্ট গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ডিবিএল গ্রুপের সব পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করার খবর প্রচারিত হয়। ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত ডিবিএল গ্রুপ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম বহুমুখী শিল্পগোষ্ঠী। যার কার্যক্রম পোশাক, বস্ত্র, টেক্সটাইল প্রিন্টিং, ওয়াশিং, গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ, প্যাকেজিং, সিরামিক টাইলস, ঔষধশিল্প, ড্রেজিং, খুচরা ব্যবসা এবং ডিজিটাল রূপান্তর সেবা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই গ্রুপের ইতোমধ্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত একটি কোম্পানি রয়েছে, মতিন স্পিনিং মিলস পিএলসি। তবে পোশাকমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ জানায়, ডিবিএলসহ বিভিন্ন কারখানা বন্ধ নয়, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে ছুটি সমন্বয় হচ্ছে।

বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর কর্তৃপক্ষ এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাড়তি উৎপাদন ব্যয়, অর্থায়ন সংকট, কমে যাওয়া ক্রয়াদেশ এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তার সংকটে পড়ে একের পর এক বন্ধ হচ্ছে পোশাক তৈরির কারখানা। এমন পরিস্থিতিতে আরো অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ২৭টি কারখানা বন্ধ হয়ে ৮ হাজার ৯২০ শ্রমিক চাকরি হারান। ২০২৪ সালে বন্ধ হয় আরো ৬১টি কারখানা। ওই বছর কর্মহীন হন ৩৯ হাজার ৪৭০ শ্রমিক। ২০২৫ সালে আসে আরো বড় ধাক্কা। ওই বছর ১৬৮টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৭৫ শতাংশ বেশি। এসব কারখানায় কর্মরত ১ লাখ ৮ হাজারের বেশি শ্রমিক চাকরি হারান। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত আরো ৩১টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে চাকরি হারিয়েছেন ১৬ হাজার ৭০০ শ্রমিক। অবশ্য একই সময়ে ৪০ উদ্যোক্তা নতুন কারখানা স্থাপন করেছেন বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ।

শিল্প পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই ২ বছরে ৪৫৭টি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে ১৭০টি। বাকি ২৮৭টি পোশাকবহির্ভূত। বন্ধ হওয়ার তালিকায় তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সদস্য কারখানা ১০৮টি, নিট ক্যাটেগরির পণ্য উৎপাদক ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিকেএমইএর কারখানা ৩৫টি, বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর কারখানা ৮টি। বাকি ১৯টি বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ বা বেপজার অধিভুক্ত কারখানা। তথ্যের ঘাটতি থাকলেও দিন দিন যে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের এবং কর্মহীন হয়ে পড়া শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে এটি নিশ্চিত।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, পোশাক খাতের বর্তমান সংকট কাটাতে সক্ষম কিন্তু আর্থিক সমস্যায় পড়া কারখানাগুলোকে পুনরায় অর্থায়নের আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসার ব্যয় কমানোর উদ্যোগও জরুরি। তিনি জানান, আরো শতাধিক কারখানা বন্ধের ঝুঁকিতে রয়েছে। এখন আংশিক সচল সেই কারখানাগুলো যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া না গেলে ঋণ সহায়তা দিয়ে শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েক লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকে এখনো নতুন কাজ পাননি। অবিলম্বে সরকারের উচিত পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া। সরকারকে শ্রমিকদের জন্য আর্থিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

এদিকে বন্ধ কলকারখানা চালু এবং স্থবির অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের অংশ হিসেবে ১৭টি ব্যাংক থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। প্রণোদনা প্যাকেজে অর্থ দিতে সম্মত হওয়া ব্যাংকগুলো হলো- সোনালী, অগ্রণী, রূপালী, ব্র্যাক, সিটি, যমুনা, ডাচ্-বাংলা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, উত্তরা, প্রাইম, ব্যাংক এশিয়া, এনসিসি, পূবালী, ইস্টার্ন, মার্কেন্টাইল, ট্রাস্ট ও সাউথইস্ট ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২৩ মে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কলকারখানা চালু, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং স্থবির অর্থনীতিকে সচল করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে।

সে সময় এক ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, এই প্যাকেজটি মূলত একটি ‘উৎপাদন ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার’ কর্মসূচি। এর মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রণোদনা প্যাকেজের ৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে দেবে। প্যাকেজের সবচেয়ে বড় অংশ হিসেবে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর জন্য। এ তহবিল থেকে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের গড়ে সাড়ে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়া হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধানের চারা নষ্ট করে জমি দখলচেষ্টার অভিযোগ

সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধানের চারা নষ্ট করে জমি দখলচেষ্টার অভিযোগ

বসতঘর পুড়ে ছাই, ঘরহারা ১২ পরিবারের আতঙ্কে বসবাস

বসতঘর পুড়ে ছাই, ঘরহারা ১২ পরিবারের আতঙ্কে বসবাস

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে যা বললেন আইনমন্ত্রী

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে যা বললেন আইনমন্ত্রী

মদ্যপানের পর মারামারি, যুবকের মৃত্যু

রফাদফার অভিযোগ মদ্যপানের পর মারামারি, যুবকের মৃত্যু

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App