যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পেতে যা যা করা যাবে না
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা, পরিবার নিয়ে বসবাস কিংবা ভ্রমণের জন্য ভিসা আবেদনকারীদের শুধু পাসপোর্ট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, চাকরি ও শিক্ষাগত যোগ্যতার নথিই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য নিয়েও সতর্ক থাকতে হবে। কারণ ভিসা যাচাইয়ের সময় আবেদনকারীর অনলাইন উপস্থিতির তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স বা লিংকডইনে দেওয়া তথ্য যদি ভিসা আবেদনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে তা আবেদনকারীর জন্য জটিলতা তৈরি করতে পারে। একইভাবে সন্ত্রাসবাদ, সহিংসতা বা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এমন অনলাইন কর্মকাণ্ডও যাচাইয়ের আওতায় আসতে পারে।
পাঁচ বছরের সামাজিকমাধ্যমের তথ্য
মার্কিন ভিসা আবেদনে নির্ধারিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে গত পাঁচ বছরে ব্যবহৃত পরিচয় বা ‘সোশ্যাল মিডিয়া আইডেন্টিফায়ার’ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। এর মধ্যে ব্যবহারকারীর নাম, ইউজারনেম, হ্যান্ডেল বা প্রোফাইলের পরিচয় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
তবে সামাজিকমাধ্যমের হ্যান্ডেল চাওয়ার অর্থ পাসওয়ার্ড চাওয়া নয়। ভিসা আবেদনকারীদের নির্ধারিত প্ল্যাটফর্মে ব্যবহৃত পরিচয় বা হ্যান্ডেল দিতে হয়।
কোন কোন তথ্য গুরুত্বপূর্ণ
ভিসা যাচাইয়ের সময় সামাজিকমাধ্যমের তথ্যের বিভিন্ন দিক বিবেচনায় আসতে পারে। বিশেষ করে—
পরিচয়: আবেদনপত্রে দেওয়া নাম ও অন্যান্য পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে প্রকাশ্য অনলাইন তথ্যের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না দেখা হতে পারে।
চাকরি ও পেশা: DS-160-এ এক প্রতিষ্ঠানে চাকরির তথ্য দেওয়া হলেও সামাজিকমাধ্যমে সম্পূর্ণ ভিন্ন কর্মস্থলের তথ্য থাকলে সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
শিক্ষাগত তথ্য: আবেদনপত্রে উল্লেখ করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ডিগ্রি বা সময়কালের সঙ্গে প্রকাশ্য অনলাইন তথ্যের বড় ধরনের পার্থক্য থাকলে তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন হতে পারে।
ভ্রমণের উদ্দেশ্য: আবেদন করা ভিসার উদ্দেশ্যের সঙ্গে অনলাইনে প্রকাশ করা তথ্যের গুরুতর অসামঞ্জস্য থাকলে তা যাচাইয়ের বিষয় হতে পারে।
নিরাপত্তা: সন্ত্রাসবাদ, সহিংসতা, উগ্রবাদ বা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকিসংক্রান্ত তথ্য থাকলে তা বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
রাজনৈতিক পোস্ট করলেই কি ভিসা বাতিল?
সামাজিকমাধ্যমে রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করলেই যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বাতিল হবে—এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নথিতেও রাজনৈতিক বক্তব্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা প্রত্যাখ্যানের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
তবে কোনো পোস্টে সহিংসতার আহ্বান, সন্ত্রাসবাদে সমর্থন বা আইন অনুযায়ী ভিসার অযোগ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় থাকলে সেটি আলাদাভাবে বিবেচিত হতে পারে।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের সমালোচনা করা এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করা—দুটি বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
পার্টি বা অ্যালকোহলের ছবি থাকলে কী হবে
সামাজিকমাধ্যমে পার্টির ছবি, বৈধভাবে অ্যালকোহল গ্রহণ বা ধূমপানের ছবি থাকলেই ভিসা বাতিল হবে—এমন কোনো সাধারণ সরকারি নিয়ম নেই।
তবে কোনো প্রকাশ্য কনটেন্ট যদি মাদকসংক্রান্ত অপরাধ বা ভিসার অযোগ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য কোনো তথ্য প্রকাশ করে, তাহলে সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
‘আমেরিকায় গিয়ে স্থায়ী হব’ এমন পোস্ট কি সমস্যা
এ বিষয়টি ভিসার ধরন ও আবেদনকারীর প্রকৃত উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য ইমিগ্রেশন ভিসার ব্যবস্থা রয়েছে। আবার নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও আইনি শর্ত রয়েছে।
তাই শুধু ‘আমেরিকায় স্থায়ী হব’ ধরনের কোনো পোস্ট থাকলেই সব ধরনের ভিসা আবেদন বাতিল হবে—এমন দাবি সঠিক নয়। মূল বিষয় হলো আবেদনকারীর প্রকৃত উদ্দেশ্য ও আবেদন করা ভিসার শর্তের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা।
পুরোনো পোস্ট মুছে ফেললে কী হবে
ভিসা আবেদনের আগে পুরোনো রাজনৈতিক পোস্ট, ছবি বা মতামত মুছে ফেললেই সন্দেহ বাড়বে—এমন কোনো সাধারণ সরকারি নিয়ম নেই।
তবে আবেদনপত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন করা বা মিথ্যা তথ্য দেওয়া গুরুতর বিষয় হতে পারে। তাই আতঙ্কিত হয়ে সামাজিকমাধ্যমের পুরোনো পোস্ট মুছে ফেলার চেয়ে DS-160-এ সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এআই দিয়ে কি সব পোস্ট স্ক্যান করা হয়
ভিসা যাচাইয়ে প্রযুক্তি, ডেটাবেস ও বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা যাচাই ব্যবস্থার ব্যবহার থাকতে পারে। তবে প্রত্যেক আবেদনকারীর প্রতিটি ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা এক্স পোস্ট নির্দিষ্ট কোনো এআই সফটওয়্যার দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্ক্যান করা হয়—এমন বিস্তারিত প্রক্রিয়া মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশ্য নির্দেশনায় নিশ্চিত করা হয়নি।
সরকারি অবস্থান হলো, ভিসা যাচাইয়ের সময় কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা প্রাসঙ্গিক তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।
সামাজিকমাধ্যম যাচাই কবে থেকে
যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সালের ৩১ মে থেকে অধিকাংশ অভিবাসী ও অ-অভিবাসী ভিসা আবেদনকারীর কাছ থেকে নির্দিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত পরিচয় বা হ্যান্ডেল সংগ্রহ শুরু করে। এর আগে ২০১৭ সালে বর্ধিত স্ক্রিনিং ও যাচাইয়ের বিষয়ে নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট ভিসা শ্রেণির জন্য অনলাইন উপস্থিতি যাচাই আরও বিস্তৃত করা হয়।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে H-1B ও H-4 আবেদনকারীদের অনলাইন উপস্থিতি পর্যালোচনার আওতায় আনা হয়। এর আগে F, M ও J শ্রেণির শিক্ষার্থী ও এক্সচেঞ্জ ভিজিটরদের ক্ষেত্রেও এ ধরনের বর্ধিত যাচাই চালু ছিল।
২০২৬ সালের ৩০ মার্চ থেকে আরও কয়েকটি নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা শ্রেণির আবেদনকারীদের জন্য অনলাইন উপস্থিতি পর্যালোচনার পরিধি বাড়ানোর ঘোষণা দেয় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
কোন ভিসায় বাড়তি নজরদারি
বর্ধিত অনলাইন যাচাইয়ের আওতায় থাকা ভিসা শ্রেণির মধ্যে H-1B, সংশ্লিষ্ট H-4, F, M ও J ছাড়াও A-3, C-3, G-5, H-3, K-1, K-2, K-3, Q, R-1, R-2, S, T ও U ভিসা রয়েছে।
এ ধরনের যাচাইয়ের আওতায় থাকা আবেদনকারীদের সামাজিকমাধ্যম প্রোফাইলের প্রাইভেসি সেটিংস পাবলিক বা ওপেন রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারের ব্যক্তিগত চ্যাট কি দেখা হয়
DS-160-এ সামাজিকমাধ্যমের পরিচয় বা হ্যান্ডেল চাওয়া এবং ব্যক্তিগত মেসেজ পড়া এক বিষয় নয়। সরকারি সামাজিকমাধ্যম তথ্য সংগ্রহের নিয়মে মূলত নির্ধারিত প্ল্যাটফর্মের পরিচয় বা হ্যান্ডেলের কথা বলা হয়েছে।
তাই ভিসা আবেদন করলেই কনস্যুলার কর্মকর্তা আবেদনকারীর ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জার কথোপকথন নিয়মিত পড়বেন—এমন দাবির পক্ষে সরকারি নির্দেশনায় স্পষ্ট ভিত্তি নেই।
আবেদনকারীদের কী করা উচিত
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা আবেদনকারীদের কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকা উচিত—
১. DS-160 সঠিকভাবে পূরণ করুন।
২. গত পাঁচ বছরে ব্যবহৃত নির্ধারিত সামাজিকমাধ্যমের তথ্য সঠিকভাবে দিন।
৩. চাকরি, শিক্ষা ও ব্যক্তিগত তথ্যের সঙ্গে অনলাইন প্রোফাইলের সামঞ্জস্য রাখুন।
৪. ভিসা আবেদনের জন্য মিথ্যা বা কৃত্রিম অনলাইন পরিচয় তৈরি করবেন না।
৫. ভিসার ধরন ও সফরের উদ্দেশ্যের সঙ্গে প্রকাশ্য অনলাইন তথ্যের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করুন।
৬. সন্ত্রাসবাদ, সহিংসতা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সমর্থনসূচক কনটেন্ট থেকে সতর্ক থাকুন।
৭. বর্ধিত অনলাইন যাচাইয়ের আওতায় থাকলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সর্বশেষ প্রাইভেসি নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামাজিকমাধ্যম যাচাইকে শুধু ‘চরিত্র পরীক্ষা’ হিসেবে না দেখে পরিচয়, যোগ্যতা, নিরাপত্তা এবং মার্কিন অভিবাসন আইনের আওতায় আবেদন যাচাইয়ের একটি অংশ হিসেবে দেখা। ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনপত্রে দেওয়া তথ্যের সত্যতা ও সামঞ্জস্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভিসা ও কনস্যুলারবিষয়ক নির্দেশনা, Travel.State.Gov এবং U.S. Federal Register।
