ক্লাইমেট জাস্টিস
যে সংকট তৈরিতে দায় নেই, সেই সংকটেই নেপালের সর্বনাশ
মীম ওবাইদুল্লাহ
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৫ পিএম
নেপালে ভয়াবহ বন্যায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত জনপদ, নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে অপেক্ষা এবং উদ্ধারকর্মীদের প্রাণপণ চেষ্টা। ছবি: সংগৃহীত
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে নেপালের অবদান নগণ্য। অথচ হিমালয়ের এই দেশটিই জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ অভিঘাতগুলোর অন্যতম বড় শিকার। কয়েক দশক ধরে হিমবাহ গলছে, বাড়ছে হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি, বদলে যাচ্ছে পাহাড়ি জনপদের জীবন ও জীবিকা। এবার হিমবাহ ধসের পর ভয়াবহ বন্যা সেই বাস্তবতাকে আরও নির্মমভাবে সামনে এনেছে। প্রশ্ন উঠছে, যে সংকট তৈরিতে নেপালের ভূমিকা এত সামান্য, সেই সংকটের ক্ষতির বোঝা কেন তাদেরই বহন করতে হবে?
গত ২৬ আগস্ট হিমালয়ের নেপাল-চীন সীমান্ত এলাকায় হিমবাহ ও শিলাখণ্ড ধসে ভয়াবহ পানির স্রোত নেমে আসে। ত্রিশূলীসহ বিভিন্ন নদীর অববাহিকায় সেই স্রোত বন্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করে। কয়েক দিনের মধ্যেই এটি নেপালের সাম্প্রতিক ইতিহাসের ভয়াবহতম দুর্যোগগুলোর একটিতে পরিণত হয়। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ২৫০ ছাড়িয়েছে, নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ২০০-এর বেশি। ধ্বংস হয়েছে অন্তত ৭ হাজার ৫০০ ঘরবাড়ি।
বিপুল ক্ষয়ক্ষতি, পুনর্গঠনে লাগবে শত কোটি ডলার
এবারের বন্যায় নেপালের অর্থনৈতিক ক্ষতির চিত্রও দুর্যোগের ভয়াবহতা স্পষ্ট করে। সরকারি হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫৬ কোটি ডলার। তবে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, মানুষের ঘরবাড়ি পুনর্বাসন এবং যোগাযোগ ও বাণিজ্যব্যবস্থা সচল করতে দেশটির প্রয়োজন হতে পারে আরও ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, পুনর্গঠনের এই ব্যয় নেপালের মোট অর্থনীতির প্রায় এক-দশমাংশের সমান।

বন্যার পানিতে ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও সেতু। এতে শুধু যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হয়নি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাতেও চাপ তৈরি হয়েছে। বহু ঘরবাড়ি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় হাজারো মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সীমান্ত বাণিজ্যের অবকাঠামো, ফলে নেপালের আমদানি-রপ্তানি ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাতেও প্রভাব পড়েছে।
দুর্যোগের এই ক্ষতি শুধু তাৎক্ষণিক নয়। ধ্বংস হওয়া সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বাণিজ্য অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে বড় অঙ্কের অর্থের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে। ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারানো মানুষের পুনর্বাসনের ব্যয় যুক্ত হলে নেপালের মতো সীমিত সম্পদের দেশের ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়বে। ফলে এবারের বন্যা দেশটির জন্য একই সঙ্গে মানবিক, অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করেছে।
দায় কম, ঝুঁকি বেশি
এই বিপর্যয় শুধু একটি পাহাড়ি দেশের দুর্যোগ নয়, এটি জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নটিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে পৃথিবীর সব দেশের দায় ও ক্ষতি সমান নয়। শিল্পোন্নত ও উচ্চ নিঃসরণকারী দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছেড়েছে। বিপরীতে নেপালের মতো স্বল্প নিঃসরণকারী দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সীমিত হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তাদের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ছে।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অংশ মাত্র প্রায় ০.০৫ শতাংশ। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির বোঝা দেশটিকে অসমভাবে বহন করতে হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয় এমন দেশগুলোই এখন এর মূল্য দিচ্ছে।
ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রসঙ্গ
দুর্যোগের পর নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শশীর খানাল বলেছেন, আন্তর্জাতিক সহায়তাকে শুধু ‘দান’ হিসেবে দেখা উচিত নয়; জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর প্রতি বড় নিঃসরণকারী দেশগুলোর নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব রয়েছে।

শুধু তাই নয়, ভারত ও চীন নেপালের প্রতিবেশী এবং একই হিমালয় অঞ্চলের অংশ। ভারতের সিকিম, উত্তরাখণ্ডসহ হিমালয় অঞ্চলেও হিমবাহ-সৃষ্ট বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। ২০২৩ সালে সিকিমে সাউথ লোনাক হিমবাহের হ্রদ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। নেপালের এবারের দুর্যোগের পর সিকিমে ৪০টি উচ্চঝুঁকির হিমবাহ হ্রদ চিহ্নিত করে আগাম সতর্কতা ও ঝুঁকি কমানোর কাজ জোরদার করা হয়েছে।
অর্থাৎ এটি শুধু নেপালের সমস্যা নয়। হিমালয় একটি আন্তঃসীমান্ত পরিবেশগত ব্যবস্থা। এখানে হিমবাহের পরিবর্তন, নদীর প্রবাহ, বন্যা, পানি নিরাপত্তা ও মানুষের জীবিকা এক দেশের সীমানায় আটকে থাকে না।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিমবাহ নিয়ে
নেপালের সংকটের আরেকটি বড় প্রতীক হিমালয়ের হিমবাহ। হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো শুধু নেপালের সম্পদ নয়; এ অঞ্চলের বরফ গলে এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নদীগুলো পানি পায়। কিন্তু উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহের বরফ দ্রুত কমছে।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি) ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০০০ সালের পর হিন্দুকুশ-হিমালয়ের হিমবাহে বরফ হারানোর হার দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৭৫ সালের পর পর্যবেক্ষণ করা ৩৮টি হিমবাহে সর্বোচ্চ ২৭ মিটার পর্যন্ত বরফের পুরুত্ব কমেছে।
কার্যকর পদক্ষেপের দাবি
এদিকে এই ভয়াবহ দুর্যোগকে ‘সাধারণ কোনো ঘটনা নয়’, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এটি ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। তিনি এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেন, ‘রাসুয়ার ভোটেকোশি নদীতে আসা ঢল কোনো সাধারণ বন্যা ছিল না। হিমালয় অঞ্চলে তুষার ও বরফের বিশাল ধসের কারণে এটি ঘটেছে। এটি ছিল এ অঞ্চলের অন্যতম বড় দুর্যোগ।’
বালেন্দ্র শাহ বলেন, ‘এ ঘটনা ইঙ্গিত দেয়, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে হিমালয় অঞ্চলে আমরা যেসব ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছি, সেগুলোও বাড়ছে। তাই এ অঞ্চলকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।’

তাই বলায় যায় যে, নেপালের সামনে এখন দ্বৈত বাস্তবতা। একদিকে নিজেদের অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে হবে, উন্নত করতে হবে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো ও ভূমি ব্যবস্থাপনা। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি সহায়তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতির কার্যকর অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু নেপাল কত টাকা পাবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের দায় ও ক্ষতির বোঝা পৃথিবী কীভাবে ন্যায্যভাবে ভাগ করবে। নেপালের হিমবাহ গলে যে পানি নেমে আসে, তা শুধু একটি দেশের সীমানা ছুঁয়ে থেমে থাকে না। কিন্তু সেই বরফ গলানোর দায়ও নেপালের একার নয়।
হিমালয়ের বরফ যখন গলে যায়, তখন তার সঙ্গে শুধু পানি নামে না, নামে একটি প্রশ্নও—যারা সংকট তৈরিতে সবচেয়ে কম ভূমিকা রেখেছে, তাদের ক্ষতির মূল্য কে দেবে? নেপালের এবারের বন্যা সেই প্রশ্নটিকে আর কূটনৈতিক সম্মেলনের টেবিলে সীমাবদ্ধ রাখেনি; হাজার মানুষের মৃত্যু, নিখোঁজ পরিবার এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া জনপদের মধ্য দিয়ে সেটিকে বাস্তব করে তুলেছে। তাই নেপালের এবারের বন্যা একটি দেশের দুর্যোগের চেয়েও বড় কিছু। এটি দেখিয়ে দিয়েছে জলবায়ু সংকটে দায় ও ক্ষতির মধ্যে কতটা গভীর বৈষম্য তৈরি হয়েছে।
