পশুর হাটের ইজারায় আ.লীগ ও বিএনপি নেতাদের ‘ভাগাভাগি’
মো. নাঈম হাসান ঈমন, ঝালকাঠি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬, ০৫:২২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে জমজমাট হয়ে উঠেছে ঝালকাঠির পশুর হাটগুলো। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে পশু কেনাবেচার ব্যস্ততা। তবে জেলার অধিকাংশ পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। পাশাপাশি প্রতিযোগিতার দৌড়ে রয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ইসলামি আন্দোলনের নেতাকর্মীরাও।
ঝালকাঠি জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার ৪টি উপজেলায় স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে মোট ৪০টি পশুর হাট রয়েছে। এর মধ্যে অস্থায়ী হাটের সংখ্যাই বেশি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জেলার রাজাপুর উপজেলার দুইটি হাটের ইজারা নিয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দুই নেতা। অন্যদিকে কাঁঠালিয়া উপজেলার একটি হাট ইজারা নিয়েছেন ইসলামি আন্দোলনের নেতা রায়হান হাওলাদার। এছাড়া জেলার অস্থায়ী ২৭টি হাটের মধ্যে ২৪টির ইজারাদারের রাজনৈতিক পরিচয় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী।
ঝালকাঠি সদর উপজেলায় ৬টি অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন যারা— ঝালকাঠি বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিম পাশে কৃষ্ণকাঠি গুরুধাম হাট ৭ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন যুবদল নেতা মনিরুজ্জামান হিরু। বিকনা স্টেডিয়াম মাঠের হাট ১ লাখ ২১ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন যুবদল নেতা ইয়াসিন আরাফাত। বিনয়কাঠি ইউনিয়নের দক্ষিণ মানপাশা হাট ৫ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন ইউনিয়ন শ্রমিকদলের সাধারণ সম্পাদক মো. সাইদুল ইসলাম। পোনাবালিয়া ইউনিয়নের হাজরাগাতি হাট ২ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি মোকছেদ হাওলাদার। গাবখান ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের গাবখান বাজার ৫ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন ঝালকাঠি জেলা যুবদলের সদস্য মো. মিজানুর রহমান। শেখের হাট ইউনিয়নের পুলিশ ফাঁড়ি সংলগ্ন টেম্পু স্ট্যান্ড বালুর মাঠ ৫ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন শেখের হাট ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ফয়েজ আহম্মেদ খান।
নলছিটি উপজেলায় ৪টি অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন যারা— নলছিটি পৌরসভার চায়না মাঠে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৩৭ টাকায় ইজারা নিয়েছেন পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আজমল হোসেন। নাচনমহল ইউনিয়নের আরজি গোবিন্দপুর মুখিয়া বাজার ২৪ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন এশিয়ান টিভির জেলা প্রতিনিধি মো. ইব্রাহিম খান শাকিল। কুলকাঠি ইউনিয়নের শিমুলতলা বাজার ৮ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন ইউনিয়ন যুবদল নেতা মো. মাহবুব হোসেন। মোল্লারহাট ইউনিয়নের বৈশাখিয়া চৌমাথা বাজার ২ লাখ ৪৪ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন ইউনিয়ন যুবদল নেতা জি কে সাইফুল ইসলাম।
রাজাপুর উপজেলার ৯টি অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন যারা— মিলবাড়ি হাট ৩ হাজার ৫০০ টাকায় ইজারা নিয়েছেন উপজেলা বিএনপির সদস্য কামরুল ইসলাম চুন্নু। বড় কৈবর্তখালি ক্লাব হাট ২০ হাজার ১০০ টাকায় ইজারা নিয়েছেন সদর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সজিব হোসেন বাপ্পি। কাঠিপাড়া তালুকদার হাট ১ হাজার ২০০ টাকায় ইজারা নিয়েছেন শুক্তাগড় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বাবুল তালুকদার। তুলাতলা হাট ৩১ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন উপজেলা বিএনপি নেতা মো. জাকির হোসেন। বড়ইয়া উত্তমপুর হাট ৫ হাজার ৭০০ টাকায় ইজারা নিয়েছেন বড়ইয়া ইউনিয়ন যুবদল নেতা শহিদুল ইসলাম খান। নিজামিয়া হাট ৬ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন ওয়ার্ড বিএনপির নেতা বেলায়েত হোসেন। পুটিয়াখালী জালোবাড়ি হাট ১ লাখ ৫ হাজার ৩০০ টাকায় ইজারা নিয়েছেন উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব রফিক মৃধা। সাতুরিয়া আমতলা হাট ৫ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন সাতুরিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তাফিজুর রহমান বাচ্চু। গালুয়া বাজার ৩ হাজার ৩৫০ টাকায় ইজারা নিয়েছেন গালুয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি এস এম ইয়াসিন আল আরাফাত।
অপরদিকে, কাঁঠালিয়া উপজেলার ৭টি অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন যারা— আমুয়া পশ্চিমপাড়া বাজার ১ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন আমুয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. এনায়েত ফরাজী। কাঁঠালিয়া সদর ইউনিয়নের বটতলা বাজার ১২ টাকায় ইজারা পেয়েছেন বিএনপি নেতা ও কাঁঠালিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মো. মঈন উদ্দীন। শৌলজালিয়া ইউনিয়নের বীণাপাণি বাজার ১ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন কাঁঠালিয়া উপজেলা কৃষক দলের সাবেক সদস্য সচিব মো. শহীদুল ইসলাম। একই ইউনিয়নের বান্দাঘাটা বাজার ৭৫০ টাকায় ইজারা পেয়েছেন কাঁঠালিয়া উপজেলা যুবদলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. ফরিদ। কচুয়া বাজার ৩ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন শৌলজালিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি আব্দুল খালেক। আওরাবুনিয়া ইউনিয়নের আকনের হাট ১২ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের নেতা রায়হান হাওলাদার। পাটিখালঘাটা ইউনিয়নের জোড়খালী নতুন হাট ৩ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান মল্লিক।
ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিন বলেন, “ঝালকাঠি জেলার সব কোরবানির পশুর হাট যথাযথ সময়ে ইজারা দেওয়া হয়েছে। আলাদা করে কোনো হাট ইজারা দেওয়া হয়নি। ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে ইউএনওরা ইজারা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। সেখানে কোনো দল বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়নি।”
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এবার ঝালকাঠি জেলায় ২ হাজার ১৩৬ জন খামারি ৩০ হাজার ২৩৪টি পশু প্রস্তুত করেছেন। জেলার চাহিদাও ৩০ হাজার ২৩৪টি পশু। তবে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত ৩৫৪টি পশু খামারে রয়েছে। এছাড়া অনেক পরিবার নিজ উদ্যোগে ১-২টি গরু পালন করেছেন। এবার হাটে গিয়ে পশু কেনার পাশাপাশি অনলাইনেও ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন খামারিরা। অনেকে নিজস্ব খামার থেকেই সরাসরি পশু বিক্রি করছেন। দেশি ও শংকর জাতের পশুর চাহিদা বেশি থাকায় বৈজ্ঞানিক উপায়ে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পশু মোটাতাজাকরণ করা হয়েছে।
রাজাপুরের মঠবাড়ি এলাকার খামারি সুমন খান বলেন, “পশুখাদ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় এবার লালন-পালনের খরচ গতবারের চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে। ভারতীয় গরুর অনুপ্রবেশ ঠেকানো গেলে খামারিরা ন্যায্য দাম পাবেন।”ঝালকাঠি সদর ও কাঁঠালিয়া উপজেলার কয়েকজন খামারি জানান, তারা ইতোমধ্যে পশু বিক্রি শুরু করেছেন এবং পুরোদমে হাটগুলোতে পশু তোলা হচ্ছে।
ঝালকাঠি জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নিরোধ বরণ জয়ধর বলেন, “খামারিরা যাতে সঠিক মূল্য পান এবং নির্বিঘ্নে পশু বিক্রি করতে পারেন, সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। জেলার ৪০টি স্থায়ী ও অস্থায়ী পশুর হাটে মেডিকেল টিম কাজ করছে, যাতে কোনো অসুস্থ পশু হাটে বিক্রি করতে না পারে।”
ঝালকাঠি জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, “প্রতিটি হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া জাল টাকা শনাক্তে বিশেষ মেশিনও রাখা হয়েছে।”
