ব্যবসায়ীদের বের করে মার্কেটের দোকান ‘ভাগ করে নিল’ বিএনপি নেতাকর্মীরা
কাগজ প্রতিবেদক, কুয়াকাটা ও কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৩৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে আওয়ামী লীগ নেতার তত্ত্বাবধানে থাকা একটি মার্কেট দখলে নিয়ে ব্যবসায়ীদের নামিয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় পৌর বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। গতকাল রোববার এ ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন বেরীবাধের বাইরে সৈকতে অবস্থিত ওই মার্কেটে ২০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০টি দোকানই বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলসহ অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের মাঝে বন্টন করে দেয়া দেয়া হয়েছে এমন অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। দখল নেওয়া দোকান গুলোতে শুঁটকি, আচারসহ পর্যটকদের প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করা হতো। এ ঘটনার পর সমুদ্র সৈকত এলাকার ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা বিরাজ করছে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কুয়াকাটা পৌর বিএনপির সভাপতি আজিজ মুসুল্লি ও তাঁর ছেলে রিয়াজ মুসুল্লির নেতৃত্বে কুয়াকাটা পৌর যুবদলের সহ-সভাপতি নুরে আলম শেখ, পৌর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মিলন মিয়া, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক রেদোয়ানুল ইসলাম রাসেলসহ প্রায় দেড় থেকে দুই 'শতাধিক ব্যক্তি এ দখল প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। এ সময় ব্যবসায়ীদের মারধর করার পাশাপাশি মালামাল লুটপাটেরও অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা।
আরও পড়ুন: উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ৯ শিক্ষকের পদত্যা
ব্যবসায়ীরা জানান, তাঁরা পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আঃ বারেক মোল্লার ভাতিজা বেল্লাল মোল্লার কাছ থেকে দোকান গুলো ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জমির মালিকানা দাবীতে একই ব্যক্তিরা দোকান গুলো দখলের পাঁয়তারা করে আসছেন এবং তালা লাগান। পরে কলাপাড়া উপজেলা বিএনপি ও স্থানীয় প্রশাসন জমির কাগজপত্র দেখে বেল্লাল মোল্লাকে মালিক হিসেবে গণ্য করেন।

ব্যবসায়ীরা আরো বলেন, স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা দোকান দখল নিতে গেলে তাঁদের মধ্যে কেউ ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে আইনি সহায়তা চান। পরে মহিপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। কিন্তু পুলিশকে খবর দেওয়ার অভিযোগ তুলে দোকানিদের মারধর করেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রেদোয়ানুল ইসলাম রাসেলসহ অন্যরা।
শুঁটকির দোকানি রুবেল মৃধার অভিযোগ,২০১৮ সাল থেকে তিনি স্থানীয় বেল্লাল মোল্লার কাছ থেকে স্টল ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করে আসছেন। আজ সকালে প্রায় দেড় থেকে দুই শ ব্যক্তি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তাঁর ও অন্যান্য দোকানের মালামাল বাইরে ফেলে দিয়ে তাঁদের চলে যেতে বলেন। এ সময় তাঁরা প্রতিবাদ করলে দখলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা তাঁদের মারধর করে দোকান থেকে জোরপূর্বক বের করে দেন।
রুবেল মৃধা বলেন, দখলের সময় তিনি নিরুপায় হয়ে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে মহিপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি খারাপ দেখে ব্যবসায়ীদের মালামাল নিয়ে সেখান থেকে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
আচার ব্যবসায়ী মনির হোসেন বলেন, আজ সকালে স্থানীয় বিএনপির লোকজন তাঁর ও অন্যান্য দোকান দখলে নেন। এ সময় তিনি প্রতিবাদ করলে এবং পুলিশকে খবর দেওয়ার অভিযোগ তুলে তাঁকে মারধর করা হয়। মনির বলেন, ২০১৮ সাল থেকে স্থানীয় বেল্লাল মোল্লার কাছ থেকে স্টল ভাড়া নিয়ে কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট এলাকায় ব্যবসা করছেন। পরে নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি মালামাল নিয়ে সরে যান।
আচার ব্যবসায়ী মো. মহিবুল্লাহ বলেন, স্থানীয় বেল্লাল মোল্লার কাছ থেকে ২০১৮ সালে দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করে আসছেন। আজ স্থানীয় কিছু লোকজন তাঁদের জমি দাবি করে দোকান থেকে মালামাল বের করে দিয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন। এ সময় মারধরের আশঙ্কায় তিনি সরে যাওয়ার পর তাঁর দোকানের কর্মচারী মালামাল গুলো সরিয়ে নেন।
৯৯৯ নম্বরে ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন মহিপুর থানার উপপরিদর্শক মো. জাকির হোসেন। তিনি বলেন, ‘ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে লিখিত ভাবে অভিযোগ দিতে বলেন। কিন্তু তাঁরা লিখিত অভিযোগ দিতে অনাগ্রহী হওয়ায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।’
ব্যবসায়ীদের মারধরের বিষয়ে তিনি বলেন,‘৯৯৯ নম্বরে ফোন করার পর পুলিশের একজন সদস্য সেখানে গিয়ে ভুক্তভোগীকে খোঁজার চেষ্টা করেন। কিন্তু ফোন করা ব্যক্তি ফোন না ধরায় স্থানীয় এক ব্যক্তি অ্যাপের মাধ্যমে মনির নামের একজনকে শনাক্ত করেন। এ সময় ক্ষিপ্ত হয়ে হয়তো মনিরকে কিছু বলা হয়ে থাকতে পারে। তবে তখন তাঁরা সেখানে ছিলেন না।’
জমির ও মার্কেটের মালিক দাবীদার বেল্লাল মোল্লার অভিযোগ,‘উল্লেখিত জমি নিয়ে পটুয়াখালীর একটি আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। তবে একই ব্যক্তিরা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সব দোকান দখলে নিয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা বিএনপির হস্তক্ষেপে দোকান গুলো মুক্ত করা হয়। এ ছাড়া স্থানীয় সেনাক্যাম্প, উপজেলা ভূমি অফিস ও মহিপুর থানা-পুলিশের কাছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দেওয়া হলে তাঁরা উভয় পক্ষকে স্থিতিশীল থাকার পরামর্শ দেন। অথচ এসব সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তাঁর জমিতে থাকা ২০টি দোকানের মালামাল বাইরে ফেলে দিয়ে দোকান গুলোতে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ নেতার ভাতিজা হবার অপরাধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার তিনি এমন অভিযোগ তার।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কুয়াকাটা পৌর বিএনপির সভাপতি আজিজ মুসুল্লির মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তবে এর আগে তিনি কুয়াকাটা প্রেসক্লাবে এসে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, কাগজপত্রে তিনি জমির মালিক হলেও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল বারেক মোল্লা জোর জবরদস্তি দখল করে মার্কেট নির্মাণ করে। তারা দখল পেতে স্থানীয় সাংসদ, উপজেলা বিএনপি সহ প্রশাসনের দ্বারস্থ হলেও তারা কোন ফয়সালা না করায় আমাদের জমি আমরা উদ্ধার করেছি।
পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া -রাঙ্গাবালী) আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন,‘ওই এলাকায় উভয় পক্ষের জমি ছিল। সাগরে জমি বিলীন হওয়ার সময় একাধিক ব্যক্তি জমির মালিকানা দাবি করায় আজকের এই ঘটনা ঘটেছে। সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন,‘যেহেতু সেখানে জমি নেই, তাই বিষয়টির সমাধান জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে দলীয় কোনো পরিচয় নয়, মালিকানা নিয়ে বিরোধের কারণেই ঝামেলা হয়েছে বলে তার দাবী।
