একজনের অপরাধে অন্যেজনের ফাঁসি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩৪ এএম
ছবি : সংগৃহীত
কক্সবাজারে ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া এক আসামিকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ‘সোনা মিয়া’ নামে যে ব্যক্তিকে ওই মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, কারাগারে থাকা সেই ব্যক্তি দাবি করেছেন, তিনি মামলার প্রকৃত আসামি নন।
পুলিশের তদন্তেও উঠে এসেছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ‘সোনা মিয়া’ এবং ২০২৬ সালে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন। মঙ্গলবার রাতে কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী এ তথ্য জানিয়েছেন।
আদালতের নির্দেশে পুলিশের দাখিল করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান। তিনি অন্য এক ব্যক্তির জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে মামলায় তাকেই সোনা মিয়া হিসেবে আসামি করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালের ২ মার্চ। ওই দিন কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। মামলার এজাহারে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে ‘সোনা মিয়া’, পিতা নজির আহমদ, কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া এবং রামু উপজেলার গর্জনিয়াকে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি। কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশের মাধ্যমে অনুসন্ধান চালিয়েও তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন: বোমা বিস্ফোরণে দগ্ধ হনুফার ৯ দিনের লড়াই শেষ
এরপরও ওই পরিচয়ে মামলার বিচার কার্যক্রম চলতে থাকে। নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ জুন ‘সোনা মিয়া’ কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে জামিন পান। জামিনে বের হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান।
পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত মামলার পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। রায়ের পর গত ২৩ জুন ‘সোনা মিয়াকে’ গ্রেপ্তার করে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
কারাগারে থাকা সোনা মিয়া জেল সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করে দাবি করেন, তিনি ওই মামলার আসামি নন। বিষয়টি পরে জেল সুপার কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতকে জানান। আদালত ঘটনার সত্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন দিতে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন।
নির্দেশ অনুযায়ী ২ জুলাই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে সদর থানা পুলিশ। প্রতিবেদনে ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এবং বর্তমানে কারাগারে থাকা সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন বলে তথ্য উঠে আসে।
সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের দাবি, তাঁর স্বামী কখনো কোনো মামলায় জড়িত ছিলেন না এবং কারাগারেও যাননি। হঠাৎ র্যাব তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর পর তাঁরা জানতে পারেন, ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় তাঁর স্বামীর মৃত্যুদণ্ড হয়েছে।
আরও পড়ুন: হাসপাতাল নিজেই ভুগছে নানা রোগে
তিনি আরও দাবি করেন, তাঁর স্বামী রোহিঙ্গা নন, তিনি রামুর বাসিন্দা। কুতুবদিয়াপাড়ায় থাকার সময় রমজান নামের এক রোহিঙ্গার সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল। ওই রমজানই ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলে তাঁরা জানতেন। কিন্তু পরে ওই মামলায় তাঁর স্বামীকে আসামি করা হয়েছে।
ঘটনার পর তদন্ত ও জামিন প্রক্রিয়া নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রেই উল্লেখ করেছিলেন যে মামলার দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি। এরপরও কীভাবে ওই পরিচয়ে থাকা ব্যক্তি আদালত থেকে জামিন পেলেন এবং পরবর্তী সময়ে একই পরিচয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের আওতায় এলেন তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তার চরম গাফিলতি হয়েছে। কোনো ব্যক্তি অন্যের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে পরিচয় দিলে তা যাচাই করে প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব। তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত না করেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
