বিকল্প বাজারে পোশাক রপ্তানিতে বড় ধস
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান দুই রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্র। দেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই এই দুই বাজারে যায়। তবে বিকল্প হিসেবে সম্ভাবনাময় অপ্রচলিত বাজারগুলোতে বিদায়ী ২০২৫–২৬ অর্থবছরে রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে অপ্রচলিত বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ২৯ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রপ্তানি কমেছে ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ। তবে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেড়েছে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ। সব মিলিয়ে দেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার।
অপ্রচলিত বাজারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় গন্তব্য জাপানে রপ্তানি ১ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি ৮১৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে হয়েছে ৭৩৯ মিলিয়ন ডলার। ভারতে রপ্তানি ৬৪৪ মিলিয়ন ডলার থেকে ৫৭১ মিলিয়ন ডলারে এবং তুরস্কে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার থেকে ৪০১ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
তবে ব্যতিক্রম ছিল ব্রাজিল ও চীন। বিশ্বের বড় দুই পোশাক আমদানিকারক এই দেশ দুটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ১৭ শতাংশ করে বেড়েছে। যদিও এ দুই বাজারে মোট রপ্তানির পরিমাণ এখনো প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, সম্ভাবনাময় হলেও নানা কাঠামোগত সমস্যার কারণে অপ্রচলিত বাজারে প্রত্যাশিত হারে রপ্তানি বাড়ছে না। পাশাপাশি পশ্চিমা অর্থনীতির মন্দার প্রভাব নতুন বাজারগুলোতেও পড়ায় রপ্তানি সম্প্রসারণ কঠিন হয়ে উঠেছে।
আরো পড়ুন : চলতি অর্থবছরে ধীর প্রবৃদ্ধি, থাকবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি
বিজিএমইএ সাবেক পরিচালক বলেন, প্রচলিত বাজারগুলোর মতো নতুন বাজারে বাংলাদেশের শক্তিশালী সোর্সিং নেটওয়ার্ক ও ক্রেতাভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক তৈরি করা কঠিন হচ্ছে।
মহিউদ্দিন রুবেলের ভাষ্য, দেশের পোশাকশিল্প মূলত ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় আকারের অর্ডার পরিচালনায় অভ্যস্ত। কিন্তু অপ্রচলিত বাজারে তুলনামূলক ছোট অর্ডার আসে, যা বড় কারখানার উৎপাদন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে এসব বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, নতুন বাজারগুলোর সঙ্গে ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেনেও জটিলতা রয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ার মতো দেশে ব্যাংকিং চ্যানেলের সীমাবদ্ধতার কারণে লেনদেন পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। তার মতে, বাজারভিত্তিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা, ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেন সহজ করা, শুল্ক বাধা কমানো এবং সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো গেলে অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়বে।
ইপিবির তথ্য বলছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে রপ্তানি কমে ১৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে এ প্রবণতাকে বাজার বৈচিত্র্যকরণের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে দেশের প্রধান কয়েকটি বাজারে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির ২০ দশমিক ১ শতাংশ। যুক্তরাজ্যে রপ্তানি শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার এবং কানাডায় ৩ দশমিক ২০ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির অংশ এখন ৩৫ শতাংশের বেশি, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রভাব আংশিকভাবে সামাল দিয়েছে।
পণ্যের ধরন অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে নিট পোশাক রপ্তানি ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে ওভেন পোশাক রপ্তানি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। এ খাতে রপ্তানি কমেছে মাত্র শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, গত এক বছরের বেশি সময় ধরে বিশ্ববাজারে নিম্নমুখী প্রবণতা বিরাজ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও বৈশ্বিক শুল্কযুদ্ধের প্রভাব, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে এবং বাংলাদেশের পোশাক খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
তিনি বলেন, ইউরোপে অর্থনৈতিক মন্দা অব্যাহত থাকায় সেখানে প্রত্যাশিত হারে রপ্তানি বাড়ছে না। একই সময়ে চীন ও ভারত আরও আগ্রাসী বাণিজ্যিক কৌশল গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে চীন মূল্য প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ইউরোপের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে থাকায় ভবিষ্যতে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এই অনিশ্চয়তার কারণে ইউরোপের অনেক ক্রেতা নতুন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন এবং বিকল্প উৎস থেকেও পণ্য সংগ্রহের কথা ভাবছেন।
মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, নতুন সরকার ব্যবসা সহজীকরণ, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সরলীকরণ এবং ব্যাংকিং সুবিধা সম্প্রসারণের যে উদ্যোগের কথা বলেছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতা দূর করে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, শুল্কযুদ্ধসহ আন্তর্জাতিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ আরো সক্ষম হবে।
