সিংগাইরে চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত, ১৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা
মাসুম বাদশাহ, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ)
প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৬:৪২ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার জিয়ানগর (বান্দাইল) গ্রামে চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহতের ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ১০০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহত মো. রাজিব হোসেনের (৪১) স্ত্রী সৌরোপা (৩৯) বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
বুধবার (১০ জুন) দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন সিংগাইর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম। তিনি জানান, মঙ্গলবার নিহতের স্ত্রী থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলার অভিযোগ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার দত্তখণ্ড গ্রামের বাসিন্দা রাজিব হোসেন কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। গত ৭ জুন রাত আনুমানিক ১১টার দিকে রাতের খাবার শেষে চা পান করার কথা বলে তিনি বাড়ি থেকে বের হন। এরপর আর বাড়ি ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরা তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
পরদিন সকালে স্থানীয়দের মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে, সিংগাইর উপজেলার সায়েস্তা ইউনিয়নের জিয়ানগর (বান্দাইল) গ্রামের বাসিন্দা হাকিম আলীর বাড়িতে রাজিবকে চোর সন্দেহে আটক করা হয়েছে।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, ৮ জুন রাত আনুমানিক ২টার দিকে স্থানীয় ১০০-১৫০ জন উত্তেজিত ব্যক্তি হাকিম আলীর বাড়িতে জড়ো হয়ে রাজিবের হাত, পা ও চোখ বেঁধে গণপিটুনি দেন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে ঘটনাস্থলেই মারা যান।
নিহতের পরিবারের দাবি, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হলে দাফন সম্পন্ন করা হয়।
এলাকাবাসীর দাবি, ঘটনার রাতে হাকিম আলীর বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, রাজিব হোসেন ঘরের জানালার গ্রিল কেটে ভেতরে প্রবেশ করেন। এ সময় তার কয়েকজন সহযোগী বাড়ির বাইরে অবস্থান করছিলেন। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্যমতে, ঘর থেকে নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার বের করে সহযোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সময় গৃহকর্তা হাকিম আলী বিষয়টি টের পান। বাধা দিতে গেলে তার সঙ্গে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে এবং তিনি গুরুতর আহত হন।
পরে তাকে প্রথমে সিংগাইর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
গৃহকর্তার পরিবারের দাবি, চুরির অভিযোগে আটক হওয়ার পর উত্তেজিত জনতা রাজিবকে মারধর করে। এতে তার মৃত্যু হয়। তারা আরও দাবি করেন, রাজিবের বিরুদ্ধে পূর্বে একাধিক চুরি ও ডাকাতি মামলার অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব দাবির বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
এদিকে নিহতের পরিবারের অভিযোগ, রাজিবকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে না তুলে দিয়ে সংঘবদ্ধভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, যা সরাসরি হত্যাকাণ্ডের শামিল। এ কারণেই তারা অজ্ঞাতনামা বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
এ ব্যাপারে সিংগাইর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, হত্যার অভিযোগে মামলা হয়েছে। ঘটনাটির সবদিক গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
