×

ঢাকা

হাজার কোটি টাকার শিল্পনগরী

বিষাক্ত দুর্গন্ধে দমবন্ধ সিংগাইরের দুই ইউনিয়ন

Icon

মাসুম বাদশাহ, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ)

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১৫ পিএম

বিষাক্ত দুর্গন্ধে দমবন্ধ সিংগাইরের দুই ইউনিয়ন

ছবি : ভোরের কাগজ

সন্ধ্যা নামলেই যেন বদলে যায় পুরো জনপদ। বাতাসে ভেসে আসে অসহনীয় এক বিষাক্ত দুর্গন্ধ। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও রক্ষা নেই। খাবারের টেবিলে বসে বমি চলে আসে, রাতে ঘুমানো দায় হয়ে পড়ে। শিশু কেঁদে ওঠে, শ্বাসকষ্টের রোগীরা হাঁপিয়ে ওঠেন, প্রবীণরা নির্ঘুম রাত কাটান। এ যেন কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা এক নীরব পরিবেশ বিপর্যয়।

এই বাস্তবতার নাম সাভারের হেমায়েতপুর বিসিক চামড়া শিল্পনগরী। আর এই দূষণের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন পাশের মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার ধল্লা ও জামির্ত্তা ইউনিয়নের হাজারো মানুষ।

দেশের অন্যতম বৃহৎ চামড়া শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে ওঠা এই শিল্পনগরী থেকে স্থানীয় মানুষের ভাগ্যে জোটেনি কর্মসংস্থান বা অর্থনৈতিক সুবিধা। বরং তাদের প্রাপ্তি বিষাক্ত দুর্গন্ধ, দূষিত নদী, নষ্ট হয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্য, কৃষিজমির ক্ষতি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুম ও শীতকালে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। দিনের বেলা তুলনামূলক কম থাকলেও সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে ট্যানারি বর্জ্যের তীব্র দুর্গন্ধ। ঘরের ভেতরেও সেই গন্ধ ঢুকে পড়ে। অনেক পরিবার রাতভর ঘুমাতে পারেন না। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত মানুষের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।

বাসিন্দাদের ভাষ্য, এই দুর্গন্ধ এখন শুধু অস্বস্তির কারণ নয়; এটি তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। অনেকের মাথাব্যথা, চোখ জ্বালাপোড়া, শ্বাসকষ্ট ও বমি বমি ভাব দেখা দেয়। খাবার খেতেও কষ্ট হয়। বাড়িতে অতিথি এলে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। বছরের পর বছর এমন দুর্ভোগ সহ্য করলেও কার্যকর কোনো প্রতিকার চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ তাদের।


দুর্গন্ধের চেয়েও ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে বংশী ও ধলেশ্বরী নদীতে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শিল্পনগরীর ডাম্পিং ইয়ার্ড ও অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য দীর্ঘদিন ধরে নদীতে মিশছে। ফলে নদীর পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। একসময় যে নদী ছিল মাছ ও জলজ প্রাণীর নিরাপদ আবাস, আজ সেখানে মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পাশাপাশি জেলেদের জীবিকাও হুমকির মুখে পড়েছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করেছেন।

হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের সময় সরকারের লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবে প্রায় দেড় যুগ পর দেখা যাচ্ছে, পরিবেশ রক্ষার সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি; বরং নতুন করে আরেকটি দূষণের কেন্দ্র গড়ে উঠেছে।

২০০৩ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে। কিন্তু বাস্তবায়ন সম্পন্ন হতে সময় লাগে প্রায় ১৮ বছর ৬ মাস। ২০২১ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৭৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। শেষ পর্যন্ত ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকায়। সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় হয় ৯৩৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় দায়িত্ব পালন করেন ১৭ জন প্রকল্প পরিচালক। এ সময়ে ৪৭টি খাতে প্রায় ৯৯৫ কোটি ৭১ লাখ টাকার অডিট আপত্তিও ওঠে।

পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার মূল ভরসা হিসেবে ৪৭৭ কোটি ৫২ লাখ টাকার কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণ করা হলেও সরকারি সমীক্ষা বলছে, সেটি প্রত্যাশিতভাবে কাজ করতে পারেনি।

পরিকল্পনা কমিশনের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিয়োজিত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রকাশ গণকেন্দ্র (পিজিকে)-এর সমীক্ষায় বলা হয়েছে, সিইটিপি শিল্পবর্জ্য যথাযথভাবে পরিশোধন করতে পারছে না। উৎপন্ন বর্জ্যের পরিমাণ শোধনাগারের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি হওয়ায় পরিবেশগত মান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ডাম্পিং ইয়ার্ড, ক্রোম ব্লক, কঠিন বর্জ্য ও স্লাজ ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি। আধুনিক পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়ায় বিপুল পরিমাণ বর্জ্য খোলা জায়গায় জমা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করছে।

সুদক্ষিরা গ্রামের বাসিন্দা বাদল মোল্লাহ বলেন, "সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্যের দুর্গন্ধে নদীসংলগ্ন এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। শুধু দুর্গন্ধই নয়, বর্জ্য কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশ ও কৃষি উৎপাদনেরও ক্ষতি করছে।"

জামির্ত্তা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল হোসেন মোল্লা বলেন, "ট্যানারি সাভারে হলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন আমার ইউনিয়নের মানুষ। দুর্গন্ধে বসবাস করাই কঠিন হয়ে গেছে।"

ধল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম ভূইয়া বলেন, "রাতের দুর্গন্ধে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ধলেশ্বরী ও বংশী নদী রক্ষায় আন্দোলনে নামতে হবে।"

সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, কবি ও উপন্যাসিক মুহাম্মদ কুদ্দুসুর রহমান বলেন, "শিল্পায়নের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু একটি শিল্পনগরীর কারণে যদি বছরের পর বছর হাজারো মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশ দূষণের শিকার হন, তাহলে পরিবেশবান্ধব সমাধান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।"

বিসিকের চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সিইটিপির উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় ইতালির একটি প্রতিষ্ঠান উন্নয়নকাজ করছে। পাশাপাশি নতুন সিইটিপি নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে দৈনিক ১৫ হাজার ঘনমিটার পানি শোধনের সক্ষমতা ২৫ হাজার ঘনমিটারে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সক্ষম ৩৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব সিইটিপি স্থাপনের জন্যও উৎসাহিত করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শাহীন আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মকসুমুল হাকিম চৌধুরী বলেন, "কমিশন একাধিকবার পরিবেশ অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে লিখিতভাবে জানিয়েছে। তবে বিদ্যমান আইনে কমিশনের ক্ষমতা সীমিত হওয়ায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।"

পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. ইলিয়াস মাহমুদ বলেন, "সিইটিপি যথাযথভাবে কার্যকর না হওয়ায় শিল্পনগরী ও আশপাশের এলাকায় বর্জ্য এবং বিষাক্ত দুর্গন্ধজনিত পরিবেশগত সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে শিল্প মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।"

প্রায় এক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, শত শত কোটি টাকার বর্জ্য শোধনাগার, অসংখ্য প্রতিশ্রুতি- সবকিছুর পরও যদি হাজারো মানুষ বিষাক্ত দুর্গন্ধে দমবন্ধ জীবন কাটান, নদী হারায় তার প্রাণ, আর জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়ে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়- উন্নয়নের এই মূল্য আর কতদিন বহন করবে ধল্লা ও জামির্ত্তার মানুষ? নির্মল বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়া কি তাদের জন্য কেবলই এক অধরা স্বপ্ন?

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

বিলুপ্ত হচ্ছে র‌্যাব, আসছে ‘এসআরবি’

বিলুপ্ত হচ্ছে র‌্যাব, আসছে ‘এসআরবি’

‘আমি লজ্জিত, দুঃখিত, ক্ষমাপ্রার্থী’: সাকিব ইস্যুতে আসিফ আকবর

‘আমি লজ্জিত, দুঃখিত, ক্ষমাপ্রার্থী’: সাকিব ইস্যুতে আসিফ আকবর

মাকসুদ কামাল ও জাফর ইকবালসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল

মাকসুদ কামাল ও জাফর ইকবালসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল

বিমানবন্দর এলাকায় অ্যান্টি ড্রোন সিস্টেম স্থাপনের উদ্যোগ

বিমানবন্দর এলাকায় অ্যান্টি ড্রোন সিস্টেম স্থাপনের উদ্যোগ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App