সর্বহারা পরিচয়ে ৬ অধ্যাপকের কাছে চাঁদাদাবি, হত্যার হুমকি
কামরুল সিকদার, বোয়ালমারী (ফরিদপুর)
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে ‘সর্বহারা পার্টির’ সদস্য পরিচয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছয় শিক্ষককে ফোন করে চাঁদাদাবি ও হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পৃথক মুঠোফোন নম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে এসব ফোন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা।
এতে শিক্ষক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। নিরাপত্তা চেয়ে পাঁচ শিক্ষকের পক্ষে বোয়ালমারী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজের সহযোগী অধ্যাপক পরেশ কুমার পাল।
জিডির অভিযোগে পরেশ কুমার পাল বলেন, গত ৩ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টা ৫৭ মিনিটে কলেজে অবস্থানকালে তার মুঠোফোনে অপরিচিত একটি নম্বর থেকে ফোন আসে। ফোনদাতা নিজেকে ‘গৌতম বিশ্বাস’ পরিচয় দিয়ে দাবি করেন, তিনি ‘সর্বহারা পার্টির’ বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা ও মধুখালী উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য। একপর্যায়ে ‘সিরাজ সিকদারের ছোট ভাই মহিউদ্দিন সিকদারের সঙ্গে কথা বলেন’ বলেও দাবি করেন ওই ব্যক্তি।
আরও পড়ুন: ইসলামী ব্যাংকে এস আলমের ৮২ শতাংশ শেয়ার ফ্রিজের নির্দেশ
অভিযোগ অনুযায়ী, ফোনদাতা প্রথমে এক লাখ টাকা এবং সর্বনিম্ন ২৫ হাজার ৫০০ টাকা ‘টোকেন মানি’ হিসেবে দাবি করেন। চাঁদার অর্থ দ্রুত পাঠানোর জন্য চাপ দিয়ে বলা হয়, ‘চা-পানের দোকানিরাও টোকেন মানি দিয়ে সহায়তা করে। আমাদের সহকর্মীদের জেল থেকে মুক্ত করতে টাকা প্রয়োজন।’ টাকা না দিলে পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে বলেও ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগ।
পরেশ কুমার পাল বলেন, সম্প্রতি রংপুরে পরিবারসহ এক শিক্ষক হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে তাকেও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের ফোন ও হুমকি পেয়েছেন কলেজের সহযোগী অধ্যাপক নিলয় কুমার সাহা, সহযোগী অধ্যাপক সজল কান্তি বিশ্বাস, সহযোগী অধ্যাপক প্রদীপ কুমার সাহা ও সহযোগী অধ্যাপক দেবাশীষ রায়। তাদের কাছেও চাঁদা দাবি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সহযোগী অধ্যাপক দেবাশীষ রায় বলেন, তাকে ফোন করে টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অপারগতা জানালে ফোনদাতা তার ছেলের পায়ে গুলি লাগলে যে ভাবে টাকা সংগ্রহ করে চিকিৎসা করবেন সেভাবে পরিচিত জনদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে পাঠাতে বলেন। একই সঙ্গে ‘চরমপন্থা নিতে বাধ্য করবেন না’ বলেও হুমকি দেওয়া হয় বলে তিনি জানান।
সহযোগী অধ্যাপক নিলয় কুমার সাহার ভাষ্য, ফোনদাতারা তাদের ‘সহকর্মীদের’ কারাগার থেকে জামিনে ছাড়াতে অর্থের প্রয়োজনের কথা বলে টাকা দাবি করেন। তাকেও পরিবারসহ প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
এদিকে কলেজটির অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রবীন লস্করও একই ধরনের ফোন পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দুই দিন আগে তাকে ফোন করে চাঁদা দাবি ও হুমকি দেওয়া হয়। আতঙ্কে তিনি ফোনদাতাদের দেওয়া একটি বিকাশ নম্বরে পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন।
একই প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষককে বেছে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে চাঁদাদাবি ও হুমকির ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হুমকিদাতাদের কথিত সংগঠনের পরিচয় সত্য কি না, এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে কি না এবং কেন একই প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষককে লক্ষ্য করা হয়েছে—এসব বিষয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
অভিযোগকারী শিক্ষক পরেশ কুমার পাল বলেন, ‘হুমকির কারণে আমরা ও আমাদের পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। যেকোনো সময় হামলা বা প্রাণনাশের ঘটনা ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কা করছি।’
কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হোসনেয়ারা বেগমকে একাধিক বার ফোন করেও কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয় নাই।
বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে তাদের ধারণা, চরমপন্থী সংগঠনের নাম ব্যবহার করে কোনো প্রতারক চক্র এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। তদন্তের মাধ্যমে হুমকিদাতাদের পরিচয় ও ঘটনার প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে বলে জানান তিনি।
এ ঘটনায় শিক্ষকরা দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
