মধুমতির ভাঙনে নিঃস্ব লংকারচর, বালু উত্তোলনকে দায়ী করলেন স্থানীয়রা
কামরুল সিকদার, বোয়ালমারী (ফরিদপুর)
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
একসময় যে জমিতে ধান-পাটের সবুজ সমারোহ ছিল, সেখানে এখন শুধু নদীর স্রোত। যে বাড়িতে ছিল সংসারের কোলাহল, ভাঙনের আতঙ্কে সেই বাড়িও ছেড়ে দিতে হয়েছে। বছরের পর বছর মধুমতির ভাঙনে এমনই বদলে গেছে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ঘোষপুর ইউনিয়নের লংকারচর নীচুপাড়ার চিত্র।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, নদীর ভাঙনে ইতোমধ্যে প্রায় পাড়াটির দুই ভাগ জমি বিলীন হয়েছে। অবশিষ্ট পাড়াটাও রয়েছে ভাঙনের মুখে। ফলে অনেকের শেষ সম্বলটুকু রক্ষা হবে কি না, এ উৎকন্ঠায় প্রতিদিন কাটছে নদীপাড়ের মানুষের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শুধু জমি নয়—বছরের পর বছর নদী কেড়ে নিয়েছে বসতভিটা, কৃষিজমি ও জীবিকার অবলম্বন। একাধিক পরিবারকে বাড়িঘর সরিয়ে নিতে হয়েছে। কেউ সড়কের পাশে, কেউ অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে কোনোভাবে টিকে আছেন।
আরও পড়ুন: জামায়াতের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করে আ.লীগ মিছিল করেছে: রাশেদ খান
ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত আরতী গোয়ালী বলেন- প্রায় ৩০ বছর আগে বিয়ের পর থেকে তিনি এই এলাকায় নদীর ভাঙন দেখে আসছেন। তার ভাষ্য, প্রতিবছরই একটু একটু করে তাদের জমি ও বসতভিটা নদীর গর্ভে চলে গেছে। একসময় তাদের পরিবার স্বাবলম্বী ছিল। এখন প্রায় ভূমিহীন। বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে অল্প জমি কিনে ঘর তুলেছেন। নদীর পাড়ের পুরোনো বসতঘরটিও ভাঙনের আশঙ্কায় ছেড়ে দিয়েছেন।

তার অভিযোগ, মধুমতি থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে বর্ষায় নদীর ভাঙন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। চলতি বছরও এলাকায় নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে। যদিও ভাঙন কম, কিন্ত নদীর পানি বাড়ার সাথে সাথে আতঙ্ক থাকে সবাই, না জানি শেষ আশ্রয় টুকুও হারাতে হয়।
সরেজমিনে লংকারচর নীচুপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মধুমতির তীরের কয়েকটি স্থানে নতুন করে ভাঙনের চিহ্ন তৈরি হয়েছে। বর্তমানে ভাঙনের তীব্রতা তুলনামূলক কম হলেও নদীর খুব কাছেই রয়েছে বসতভিটা ও কৃষিজমি। ফলে বর্ষায় পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে শঙ্কায় স্থানীয়রা।
তাদের আশঙ্কা, অবশিষ্ট জমিটুকু নদীতে চলে গেলে অনেক পরিবারই কার্যত ভূমিহীন হয়ে পড়বে। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মধুমতির ভাঙনে আরতী গোয়ালীর বসতভিটা, বিধান বদ্দীর মরিচ ও ঘাসের জমিসহ হরশিত, ননী গোপাল, অচিন্ত গোয়ালী, জীবনানন্দ গোয়ালী, রঘুনাথ মণ্ডল ও আনিতা মণ্ডলসহ প্রায় ৫০-৬০টি পরিবারের বাড়িঘর ও কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
এই পরিবারগুলোর অনেকেরই জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল কৃষিজমি। জমি হারানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের আয় ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। নদীভাঙনের সঙ্গে জীবিকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন আনিতা মণ্ডল। তার কথায় উঠে আসে ভাঙনকবলিত মানুষের আরেক বাস্তবতা।
আনিতা বলেন, নারী-পুরুষ সবাই কাজ করে সংসার চালান। নদী তাদের কৃষিজমি কেড়ে নিয়েছে। সরকারি সহায়তায় পাওয়া ভেড়া পালন করে এখন জীবীকা নির্বাহ করেন তিনি। ভেড়ার খাবারের জন্য নিজেকেই নৌকা চালিয়ে কখন জেগে ওঠা চর বা নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যেতে হয়।
তার প্রশ্ন, ‘‘আগে যে জমিতে ধান-পাটসহ বিভিন্ন ফসল ফলাতাম, সেই জমিই এখন নদীর মধ্যে। নদী এভাবে জমি নিয়ে গেলে আমরা যাব কোথায়?’’
স্থানীয়দের অন্যতম অভিযোগ নদী থেকে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন নিয়ে। তাদের দাবি, নিয়ম না মেনে বালু তোলার কারণে নদীর গতিপথ ও তীরের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে বর্ষায় ভাঙনের মাত্রা বেড়ে যায়।
রঘুনাথ মণ্ডল বলেন, প্রতিবছর বাড়িঘর সরাতে সরাতে তারা নদী থেকে অনেক দূরে সরে গেছেন। কিন্তু তাতেও ভাঙনের আতঙ্ক কাটেনি। তার আশঙ্কা, অবশিষ্ট জায়গাটুকুও নদীতে চলে গেলে তাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকবে না।
তবে বালু উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়ে ঘোষপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইমরান হোসেন নবাব বলেন, "ইউনিয়নের কিছু এলাকায় নদীভাঙন হয়। অপরিকল্পিত ভাবে বালু উত্তোলন অনেকাংশে দায়ী।" নিয়ম মেনে বালু উত্তোলন করা হলে ক্ষতিকর পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন।
বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস. এম. রকিবুল হাসান বলেন, মধুখালী ও আলফাডাঙ্গা উপজেলার অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ড ব্লক স্থাপনের মাধ্যমে নদীশাসনের কাজ চলমান । বোয়ালমারীর অংশে ভাঙন দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
