মেট্রোরেলের খরচ বাড়ছে, বিকল্প গণপরিবহনে নজর চায় আইপিডি
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় মেট্রোরেলের পাশাপাশি বাস, বিআরটি, কমিউটার রেলসহ অন্যান্য পরিবহনব্যবস্থায় সমান গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। একই সঙ্গে মেট্রোরেল প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণের চাপ কমাতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) আইপিডি আয়োজিত অনলাইন আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘মেট্রোরেলের ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিকল্পনায় ন্যায্যতা’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা এবং ঢাকার সামগ্রিক পরিবহন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, মেট্রোরেলের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় ঢাকাকে একটি ‘মেট্রোরেল ট্র্যাপ’-এর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যোগাযোগ ও পরিবহনের অন্যান্য সম্ভাবনাগুলোও এতে পিছিয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, ২০০৫ সালে প্রণীত ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (STP) বাস যোগাযোগ, বিআরটি ও পথচারীবান্ধব অবকাঠামোতে গুরুত্ব দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত এক দশকে বাসব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি এবং বাস রুট রেশনালাইজেশনও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বিআরটি প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগের পরও প্রায় এক হাজার কোটি টাকার কারণে প্রকল্পটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। অথচ পর্যাপ্ত জনসম্পৃক্ততা ও বিকল্প বিশ্লেষণ ছাড়াই প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: শেষ ধাপে নবম পে-স্কেল, গেজেট হচ্ছে কবে?
আইপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়, মেট্রোরেল-১ ও মেট্রোরেল-৫ (উত্তর) প্রকল্পে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ ধরনের ব্যয় বৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক ঋণের চাপ আরও বাড়াবে। তাই মেট্রোরেলসহ যেকোনো বড় পরিবহন প্রকল্প অনুমোদনের আগে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এবং প্রকল্পের উপযোগিতা, ব্যয়-সুবিধা ও লাভ-ক্ষতির যথাযথ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
আইপিডির তথ্য অনুযায়ী, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে নির্মাণাধীন MRT Line-5 (দক্ষিণ)-এ প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে জাইকার অর্থায়নে MRT Line-1-এ প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৩ হাজার ৬৬১ কোটি এবং MRT Line-5 (উত্তর)-এ প্রায় ৪ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে।
আইপিডির মতে, প্রকল্পগুলোর প্রতি কিলোমিটারে ব্যয়ের এই পার্থক্য উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
আলোচনায় বলা হয়, কমলাপুর-এয়ারপোর্ট-জয়দেবপুর রেলপথকে দ্রুতগতির কমিউটার ট্রেন নেটওয়ার্ক হিসেবে কার্যকর করার সুযোগ থাকলেও তা যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি। অথচ একই করিডোরের সমান্তরালে বিপুল অর্থ ব্যয়ে পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কুড়িল-পূর্বাচল করিডোরে তুলনামূলক কম ব্যয়ে বিআরটি চালুর সম্ভাবনাও যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি বলে মত দেন বক্তারা।
পরিবহন পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ মুনতাসীর মামুন বলেন, কোথায়, কখন মেট্রোরেল করা হবে এবং কোথায় গিয়ে এর সম্প্রসারণ থামবে—এসব বিষয় ২০০৫ সালের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনাতেই উল্লেখ ছিল। শহরের প্রয়োজন অনুযায়ী মেট্রোরেল করা যেতে পারে; তবে এটিকে সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
তিনি বলেন, বর্তমানে প্রায় ১ শতাংশ ট্রিপ মেট্রোরেলের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। ভবিষ্যতে সব পরিকল্পিত মেট্রোরেল বাস্তবায়ন হলেও সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ট্রিপ এ ব্যবস্থায় পরিবহন করা সম্ভব হবে। ফলে বাকি ৮৫ শতাংশ বা তারও বেশি যাত্রীর জন্য কার্যকর গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ড. মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বড় প্রকল্পে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, কোনো প্রকল্পে যে ব্যয় অনুমোদন করা হচ্ছে, তা প্রকৃতপক্ষে যৌক্তিক ও ন্যায্য কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ঢাকায় যত বেশি মেগা প্রকল্প ও বিনিয়োগ হবে, শহরটি তত বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে। এর ফলে কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগের জন্য মানুষ ও প্রতিষ্ঠান আরও বেশি ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এতে দেশের অন্যান্য শহরের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আইপিডির রিসার্চ ফেলো ও স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষক কে এম আসিফ ইকবাল আকাশ বলেন, মেট্রোরেলের মতো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যাপক ব্যয় বৃদ্ধি শুধু আর্থিক সমন্বয়ের বিষয় নয়; এটি প্রকল্প পরিকল্পনা, ব্যয় প্রাক্কলন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সাবেক কনসালট্যান্ট স্থপতি শোয়েব হাসান শ্রাবণ বলেন, MRT Line-1-এর পরিকল্পনার পাশাপাশি বিকল্প সম্ভাবনাগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। কমলাপুর থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত বিদ্যমান রেলপথকে কার্যকর ও দ্রুতগতির গণপরিবহন নেটওয়ার্ক হিসেবে উন্নত করা গেলে MRT Line-1-এর প্রয়োজনীয়তা ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করা যেত।
আইপিডির রিসার্চ ফেলো ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরহাদুর রেজা বলেন, বাস, ট্রেন, ফুটপাত, নন-মোটরাইজড ট্রান্সপোর্ট (NMT) ও সাইকেলপথকে সমন্বিত করার কথা পরিবহননীতিতে থাকলেও বাস্তবে ঢাকায় মেট্রোরেল সম্প্রসারণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, শহরের ধারণক্ষমতা ও পরিবহন চাহিদা ব্যবস্থাপনার বিষয়েও যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ফলে যানজট ও নগর ব্যবস্থাপনার সমস্যাগুলো থেকেই যাচ্ছে, পাশাপাশি বড় প্রকল্পের ঋণের বোঝাও বাড়ছে।
আইপিডির সদস্য পরিকল্পনাবিদ ফাহিম আহমেদ মণ্ডল বলেন, বড় প্রকল্প অনুমোদনের সময় সামাজিক ও পরিবেশগত ব্যয় বা ‘হিডেন কস্ট’ যথাযথভাবে হিসাব করা হয় না। একই সঙ্গে প্রকল্পের আর্থিক লাভকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এভাবে ঢাকা ধীরে ধীরে ‘মেগা প্রকল্পের ট্র্যাপে’ আটকে পড়ছে।
পরিকল্পনাবিদ মো. সাজিদ ইকবাল বলেন, মেট্রোরেলের কার্যকারিতা শুধু মূল অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে ফিডার সার্ভিস, পথচারীবান্ধব ব্যবস্থা এবং অন্যান্য গণপরিবহনের সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ সজীব বলেন, পরিবহন অবকাঠামোর সঙ্গে ভূমি ব্যবহারের সমন্বয় জরুরি। মেট্রোরেল নির্মাণের ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত উন্নয়ন চাপ তৈরি হতে পারে। তাই পরিবহন অবকাঠামোর পাশাপাশি গ্রোথ কন্ট্রোল, ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও রিস্ক ম্যানেজমেন্টের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।
আইপিডির সুপারিশ
মেট্রোরেল প্রকল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে কয়েকটি সুপারিশ দিয়েছে আইপিডি।
এর মধ্যে রয়েছে দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতাদের কঠোর শর্ত পুনর্মূল্যায়ন করে বিশ্বব্যাপী উন্মুক্ত দরপত্রের সুযোগ তৈরি করা, দরপত্রের অপ্রয়োজনীয় কঠোর যোগ্যতার শর্ত শিথিল করা এবং দেশীয় প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সাব-কন্ট্রাক্টিং ও সিভিল ওয়ার্কসে যুক্ত করা।
এ ছাড়া প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলন যাচাইয়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে ‘থার্ড-পার্টি কস্ট ভ্যালিডেশন’, ২০ থেকে ৩০ বছরের পরিচালন ব্যয়, ঋণের কিস্তি, ভর্তুকি ও সম্ভাব্য টিকিট মূল্যের হিসাব প্রকাশ এবং প্রতিটি প্যাকেজের দরপত্র ও চুক্তির তথ্য নিয়ে উন্মুক্ত ডাটা ড্যাশবোর্ড চালুর সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
আইপিডি বলেছে, নতুন পরিবহন অবকাঠামো নির্মাণের আগে মেট্রোরেলের পাশাপাশি বিআরটি, লাইট রেল, মনোরেল, কমিউটার রেল, বাস রুট রেশনালাইজেশন ও উন্নত বাস সার্ভিসের মতো বিকল্পগুলোর স্বাধীন লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণ করতে হবে।
সংগঠনটি ঢাকার পরিবহনব্যবস্থায় বিদ্যমান রেলপথের সর্বোচ্চ ব্যবহার, বাস রুট রেশনালাইজেশন ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালু, মেট্রোরেল ও বাস টার্মিনালের সঙ্গে ফুটপাত ও সাইকেলপথের সংযোগ এবং পূর্বাচল, উত্তরা, কেরানীগঞ্জ ও সাভার-ধামরাইয়ের মতো এলাকায় উপ-কেন্দ্রভিত্তিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
একইসঙ্গে সড়ক, রেল ও মেট্রোরেল-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে (DTCA) আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করার সুপারিশ করেছে আইপিডি।
