কোথায় হারিয়ে গেলো আওয়ামীপন্থি শিল্পীরা?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০৫ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
একসময় চলচ্চিত্র, নাটক, টেলিভিশন অনুষ্ঠান, সরকারি আয়োজন ও রাজনৈতিক মঞ্চে যাদের উপস্থিতি ছিল নিয়মিত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের অনেককেই আর সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। কেউ আছেন লোকচক্ষুর আড়ালে, কেউ পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে, আবার কেউ কাজে ফিরতে চাইলেও সুযোগ কমে যাওয়ার অভিযোগ তুলছেন। আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত এসব শিল্পীর বর্তমান অবস্থান ও পেশাগত বাস্তবতা নিয়ে বিনোদন অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ঢাকা-১০ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন অভিনেতা ফেরদৌস আহমেদ। তবে ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তাকে প্রকাশ্যে খুব একটা দেখা যায়নি। অথচ তার অভিনীত একাধিক চলচ্চিত্র এখনও মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন অভিনেতা রিয়াজ আহমেদ। দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা জনপরিসরে তার উপস্থিতি নেই। আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা এবং সাবেক সংসদ সদস্য সংগীতশিল্পী মমতাজও অনেকটাই নীরব। বিভিন্ন সময় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নিপুণ আক্তারও ৫ আগস্টের পর প্রকাশ্যে খুব কমই এসেছেন। অন্যদিকে 'মুজিব: একটি জাতির রূপকার' চলচ্চিত্রে বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে অভিনয় করা আরিফিন শুভ নতুন কোনো দেশীয় চলচ্চিত্রে দেখা না গেলেও তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানে ভারতের একটি ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কাজে ব্যস্ত রয়েছেন।
একই চলচ্চিত্রে অভিনয় করা চঞ্চল চৌধুরীও রাজনৈতিক বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তিনি ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কনটেন্ট ও কয়েকটি নাটকে কাজ করছেন।
কাজ কমেছে, নাকি পুরো ইন্ডাস্ট্রিই সংকটে?
সরকার পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শিল্পীদের অনেকেই দাবি করছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তারা কাজ হারাচ্ছেন। তবে চলচ্চিত্র অঙ্গনের একটি অংশ বলছে, সংকটটি শুধু নির্দিষ্ট শিল্পীদের নয়; পুরো ইন্ডাস্ট্রিতেই কাজের পরিমাণ কমে গেছে।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগর বলেন, বর্তমানে চলচ্চিত্র নির্মাণ অনেকটাই ঈদকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। ফলে সারা বছরই কাজের সুযোগ আগের তুলনায় কম।
'আলো আসবেই' গ্রুপের প্রভাব
জুলাই আন্দোলনের সময় 'আলো আসবেই' নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপকে ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। আন্দোলনের পর গ্রুপটির স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এতে যুক্ত থাকা কয়েকজন শিল্পী সমালোচনার মুখে পড়েন।
গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে পরিচিত কয়েকজন শিল্পীর দাবি, ওই ঘটনার পর তাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক জনমত তৈরি হয়। ফাঁস হওয়া স্ক্রিনশটে ব্যক্তিগত ফোন নম্বর প্রকাশ পাওয়ায় অনেকে হয়রানির শিকার হন এবং ফোন নম্বর পরিবর্তন করতেও বাধ্য হন।
বিদেশে অনেকেই
সরকার পরিবর্তনের পর কয়েকজন শিল্পী বিদেশে অবস্থান করছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অরুণা বিশ্বাস কানাডায় রয়েছেন। অন্যদিকে জায়েদ খান, সায়মন সাদিক ও সাজু খাদেম বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।
জ্যোতিকা জ্যোতির অভিযোগ
অভিনেত্রী জ্যোতিকা জ্যোতি অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাকে একটি চলমান নাটক এবং একটি চলচ্চিত্রের কাজ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, নির্দিষ্ট কিছু শিল্পীর নাম বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে তাদের কাজ না দেওয়ার অনানুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শাহরিয়ার নাজিম জয়ের ভিন্ন মত
উপস্থাপক ও অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয় মনে করেন, কাজ কমার বিষয়টি শুধু আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ শিল্পীদের জন্য নয়। তার ভাষায়, পুরো ইন্ডাস্ট্রিতেই কাজের পরিমাণ কমেছে। তবে যেসব শিল্পী রাজনৈতিকভাবে অতিমাত্রায় সক্রিয় ছিলেন, তাদের নিয়ে নির্মাতারা দ্বিধায় পড়ছেন।
তিনি আরও বলেন, বিতর্কিত শিল্পীরা যদি নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন বা ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমা চান, তাহলে তাদের জন্য কাজের পরিবেশ সহজ হতে পারে।
সাংস্কৃতিক আয়োজনেও বাধার অভিযোগ
সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন শিল্পী বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কনসার্ট ও বাণিজ্যিক আয়োজনে অংশ নিতে গিয়ে বাধার অভিযোগ তুলেছেন। এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন অল্প কয়েকজন।
অভিনেত্রী নুসরাত ফারিয়া সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, শিল্পীদের কাজের সুযোগ সীমিত হয়ে গেলে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তার মতে, মতপার্থক্য থাকলেও শিল্প-সংস্কৃতির স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এক বছর পরও বিনোদন অঙ্গনে সেই পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট। একদিকে কাজের সংকট, অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক সব মিলিয়ে অনেক শিল্পীর ক্যারিয়ার এখন অনিশ্চয়তার মুখে। তবে এটি কতটা রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল আর কতটা পুরো শিল্পের মন্দার প্রভাব, সেই বিতর্ক এখনো চলমান।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
