×

ফুটবল

যুদ্ধ-শোক পেরিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে ইরাকের ‘আবু তুবার’

Icon

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৩:৪৮ পিএম

যুদ্ধ-শোক পেরিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে ইরাকের ‘আবু তুবার’

ফাইল ছবি

ইরাকের বিশ্বকাপ ইতিহাসে আইমেন হুসেইনের নাম এখন আলাদা করেই লেখা থাকবে। শুধু গোলের জন্য নয়, সেই গোলের পেছনের জীবনের জন্যও। বলিভিয়ার বিপক্ষে তার জয়সূচক গোল ইরাককে ফিরিয়েছে বিশ্বকাপে। ৪০ বছরের অপেক্ষা শেষে আবার ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে উঠেছে ‘লায়ন্স অব মেসোপটেমিয়া’। আর সেই পথচলার কেন্দ্রে আছেন এমন এক ফরোয়ার্ড, যার জীবনযুদ্ধ, মৃত্যু, নিখোঁজ স্বজন, অভাব আর অবিশ্বাস্য জেদের গল্প।

আইমেন হুসেইনের জন্ম ১৯৯৬ সালে, ইরাকের উত্তর-মধ্যাঞ্চলের আল-হাওয়িজা জেলার আল-সাফরা গ্রামে। তার পরিবার জীবিকা চালাত কৃষিকাজ ও ভেড়া পালনের মাধ্যমে। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল ছিল তার আশ্রয়। কিন্তু ১২ বছর বয়সে সেই শৈশব ভেঙে যায় ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে।

২০০৮ সালে নিহত হন তার বাবা, যিনি ইরাকি সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন। পরিবারের জন্য নতুন বাড়ি বানানোর সামগ্রী কিনতে গিয়েছিলেন তিনি। কয়েক ঘণ্টা পর খবর আসে, তাকে হত্যা করা হয়েছে; মরদেহ আছে হাসপাতালে। গুলিটি লেগেছিল হৃদয়ে। হুসেইন পরে বলেছেন, প্রথমে তারা বিশ্বাসই করতে পারেননি। হাসপাতালে গিয়ে বাবার নিথর দেহ দেখার পর সব বদলে যায়।

বাবাকে হারানোর পর হুসেইন ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। পরিবারের দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার মা তাকে থামান। মায়ের কথা ছিল পরিষ্কার, এটাই তোমার স্বপ্ন, তোমাকে তা পূরণ করতেই হবে। সেই কথাই হুসেইনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

কয়েক বছর পর আরেক আঘাত আসে পরিবারে। বাবার মৃত্যুর পর তার বড় ভাই ইরাকি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। আইএসের নিয়ন্ত্রণের সময় ওই অঞ্চলে তাকে অপহরণ করা হয়। এরপর আর তার কোনো খোঁজ মেলেনি। হুসেইনের জীবনে এই দুই ক্ষত, বাবার মৃত্যু ও ভাইয়ের নিখোঁজ হওয়া, কখনো মুছে যায়নি।

তবু ফুটবল থামেনি। বরং শোকের ভেতর থেকেই ফুটবল হয়ে ওঠে তার বেঁচে থাকার পথ। ২০১২ সালে দোহুক ক্লাবে সুযোগ পাওয়াটা ছিল তার ক্যারিয়ারের বড় বাঁক। ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের ক্লাবটিতে চুক্তি করেন তিনি। তখন তার কাছে সেটি ছিল স্বপ্নপূরণের মতো। হুসেইন নিজেই বলেছেন, জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে একই দলে খেলার সুযোগ পেয়ে তিনি বিনা পারিশ্রমিকেও খেলতে প্রস্তুত ছিলেন।

এরপর ধীরে ধীরে ইরাকের ক্লাব ফুটবলে উঠে আসেন তিনি। আল-শোরতা, আল-তালাবা, আল-জাওরা, আল-কুয়া আল-জাওইয়া—দেশের বড় ক্লাবগুলোর জার্সিতে গোল করেছেন, হয়েছেন লিগের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড। পরে কাতার, আমিরাত ও মরক্কো ঘুরে দেশে ফিরে আল-কারমায় যোগ দেন।

কিন্তু তার কাছে সাফল্যের প্রতিটি মুহূর্তেই ফিরে আসে অনুপস্থিতির বেদনা। তিনি বহুবার বলেছেন, বাবা ও ভাই যদি বেঁচে থাকতেন, তার অর্জনগুলো দেখতেন, সেটিই হতো সবচেয়ে বড় আনন্দ।

সেই অর্জনের তালিকা ছোট নয়। ২০১৬ সালে এএফসি অনূর্ধ্ব-২৩ এশিয়ান কাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে কাতারের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে গোল করে ইরাককে রিও অলিম্পিকে তোলেন তিনি। ২০২৩ সালে আরবিয়ান গালফ কাপে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের একজন হন, তার গোলেই ইরাক শিরোপা জেতে। ২০২৪ সালেও ইরাকের অলিম্পিক অভিযানে ছিলেন তিনি। জাতীয় দলের জার্সিতে বড় মুহূর্তে গোল করার অভ্যাস তার নতুন নয়।

তবে সবচেয়ে বড় মুহূর্ত আসে ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে। বলিভিয়ার বিপক্ষে আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফ ফাইনালে ইরাকের জয়সূচক গোল করেন হুসেইন। সেই গোল শুধু একটি ম্যাচ জেতায়নি; একটি প্রজন্মের অপেক্ষা শেষ করেছে। ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে ফিরেছে ইরাক।

ইরাক জাতীয় দলের ডাকনাম ‘লায়ন্স অব মেসোপটেমিয়া’। সেই সিংহদের গর্জন ফেরাতে হুসেইনের গোল এখন দেশটির ফুটবল স্মৃতির অংশ। ইরাকের গোলরক্ষক ও সহঅধিনায়ক জালাল হাসান তাকে দেখেন এমন এক স্ট্রাইকার হিসেবে, যার পারফরম্যান্স শুধু ইরাকে নয়, পুরো অঞ্চলেই আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে। সাবেক অধিনায়ক ও কিংবদন্তি হুসেইন সাঈদও আশা করছেন, হুসেইনের প্রভাব ইরাককে গ্রুপ পর্ব পেরোনোর স্বপ্ন দেখাতে পারে।

কাজটা সহজ নয়। বিশ্বকাপে ইরাক পড়েছে কঠিন গ্রুপে। প্রতিপক্ষ ফ্রান্স, সেনেগাল ও নরওয়ে। কাগজে-কলমে ইরাকের সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। কিন্তু তাদের কাছে বিশ্বকাপে পৌঁছানোই এক বিশাল বার্তা, দেশটি এখনও স্বপ্ন দেখে, লড়াই করে, ফুটবলের মাধ্যমে আনন্দ খোঁজে।

হুসেইনের নিজের গল্পও তাই ইরাকের গল্পের প্রতিচ্ছবি। সহিংসতার ভেতর বেড়ে ওঠা, পরিবার হারানো, ঘরবাড়ি হারানোর স্মৃতি, তবু স্বপ্ন না ছাড়ার জেদ—সব মিলিয়ে তিনি শুধু একজন গোলদাতা নন। তিনি এমন এক ফুটবলার, যার প্রতিটি গোলের ভেতরে আছে ব্যক্তিগত শোক ও জাতীয় গর্বের মিশ্রণ।

বিশ্বকাপে তার সামনে এখন নতুন পরীক্ষা। বড় ডিফেন্ডার, বড় দল, বড় মঞ্চ। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষগুলোর সঙ্গে লড়াই করে যিনি এখানে এসেছেন, ফুটবল মাঠের চাপ তার কাছে নতুন কিছু নয়।

আইমেন হুসেইন হয়তো বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত তারকাদের একজন নন। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে ইরাকের জার্সিতে তিনি যে গল্প নিয়ে নামবেন, তা অনেক বড় নামের গল্পের চেয়েও বেশি শক্তিশালী। বাবার স্বপ্ন, ভাইয়ের অনুপস্থিতি, মায়ের সাহস আর নিজের জেদ—সব নিয়েই বিশ্বকাপে পা রাখছেন ইরাকের গোলনায়ক। ইরাকের জন্য তিনি শুধু স্ট্রাইকার নন। তিনি ৪০ বছরের অপেক্ষা ভাঙা মানুষ।


সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

কাউনিয়ায় আলোর বাহ‌নের বৃক্ষ‌রোপণ কর্মসূ‌চি

কাউনিয়ায় আলোর বাহ‌নের বৃক্ষ‌রোপণ কর্মসূ‌চি

শরিফুলের ফাইফারে লড়াই জমিয়ে হারল বাংলাদেশ

শরিফুলের ফাইফারে লড়াই জমিয়ে হারল বাংলাদেশ

লেবাননে ফের বিমান হামলা, ইসরায়েলকে উপযুক্ত জবাব দেবে ইরান

লেবাননে ফের বিমান হামলা, ইসরায়েলকে উপযুক্ত জবাব দেবে ইরান

সরকারের একক নিয়ন্ত্রণে স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত হয়নি, হবেও না

গোলাম পরওয়ার সরকারের একক নিয়ন্ত্রণে স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত হয়নি, হবেও না

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App