ভুল আসছে সিবিসি রিপোর্ট, ঝুঁকিতে ডেঙ্গু রোগীরা
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪২ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ডেঙ্গু রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (সিবিসি) পরীক্ষা। গত কয়েক বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদেরও নমুনা পরীক্ষায় রিপোর্ট নেগেটিভ আসছে।
সম্প্রতি ৩১ বছর বয়সী এক নারী জ্বরে আক্রান্ত হলে চিকিৎসক ঝুঁকি এড়াতে তাকে সিবিসি পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন। প্রথম পরীক্ষার ফলাফল চিকিৎসকের প্রত্যাশিত না হওয়ায় পুনরায় পরীক্ষা করানো হয়। পরবর্তীতে অধিকতর নিশ্চিত হতে রোগী নিজেই তৃতীয়বার সিবিসি পরীক্ষা করান। তিনটি পরীক্ষার ফলাফলে রক্তের বিভিন্ন উপাদানের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়।
তিনটি সিবিসি রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ওই রোগীর শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৭.১৫, ৬.৬৩ ও ৬.৮৪; লোহিত রক্তকণিকা ৩.১৪, ৩.৩৪ ও ৩.১২; হিমোগ্লোবিন ৮.৬, ৯.০ ও ৮.৩। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পার্থক্য দেখা যায় প্লেটিলেটের হিসাবে- যথাক্রমে ৭, ১৫ ও ৭। প্লেটিলেট ভলিউমের ফলাফলও ছিল যথাক্রমে ০, ৮.৪ ও ১৪.৪। অর্থাৎ প্রতিটি রিপোর্টের ফলাফলই আলাদা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন রোগীর ক্ষেত্রে পরপর করা সিবিসি পরীক্ষায় এমন অস্বাভাবিক পার্থক্য দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ডেঙ্গুর মতো রোগে প্লেটিলেট কাউন্ট চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ভুল রিপোর্ট রোগী ও চিকিৎসক উভয়ের জন্যই সমস্যার কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রক্তের নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহন থেকে শুরু করে পরীক্ষা করার প্রক্রিয়া এবং যন্ত্রের ত্রুটি- যেকোনো পর্যায়ে সমস্যা হলে ভুল ফলাফল আসতে পারে। বিশেষ করে প্লেটিলেটের সংখ্যা ভুলভাবে কম দেখালে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা নিয়ে তৈরি হতে পারে বিভ্রান্তি এবং রোগী পড়তে পারেন মৃত্যু ঝুঁকিতে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিবিসি পরীক্ষার ফলাফল রোগীর চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। ফলে ফলাফলে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে সেটি যাচাই না করে রিপোর্ট প্রকাশ করা উচিত নয়। চিকিৎসকের সন্দেহ হলে নমুনা ও পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি আছে কি না, তা খুঁজে বের করতে হবে।
সঠিক সময়ে নমুনা পরীক্ষার পরামর্শ
চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গুর ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর অর্থাৎ জ্বর হওয়ার ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে এনএস-১ পরীক্ষা করলে পজিটিভ হতে পারে। এরপর অর্থাৎ ৫-৬ দিন পর পরীক্ষা করলে নেগেটিভ আসে। ৭ম দিনে আইজিএম পরীক্ষা করলে রিপোর্ট পজিটিভ আসবে। এর দুই দিন পর পরীক্ষা করলে নেগেটিভ আসবে। তখন আইজিজি পরীক্ষা করতে হবে।
সবার সক্ষমতা এক নয়। তাই শরীরে ভাইরাস ঢুকলেও জ্বর পরে আসে। জ্বরের ৪, ৫ ও ৬ -এই দিনগুলোকে বলা হয় ‘উইন্ডো পিরিয়ড’। এই সময়টাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে রিপোর্ট নেগেটিভ হলেও ডেঙ্গুর লক্ষণ ও উপসর্গ থাকলে অবশ্যই চিকিৎসাসেবা নিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ডা. হুমায়রা বিনতে আসাদ বলেন, সিবিসি পরীক্ষায় রক্তের নমুনা সংগ্রহে ইডিটিএ টিউব ব্যবহার করা হয়। এই টিউবে রক্ত সঠিকভাবে মিশ্রিত করে এক ঘণ্টার মধ্যে অ্যানালাইজারে দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে যান্ত্রিক ত্রুটি থাকতে পারে। মেশিন ক্যালিব্রেশন করা না থাকলেও রিপোর্টে ভুল আসতে পারে। রোগীর কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করেন নার্স বা টেকনোলজিস্ট এবং পরীক্ষার প্রাথমিক ধাপগুলো সম্পন্ন করেন টেকনোলজিস্ট। তারা যথাযথ প্রশিক্ষিত না হলে পরীক্ষার ফলাফল সঠিক নাও হতে পারে।
অধ্যাপক হুমায়রা বিনতে আসাদ বলেন, এটি একটি চেইন অব প্রসেস। এক্ষেত্রে কোনো একটি জায়গায় ত্রুটি হলেই রিপোর্টে সঠিক তথ্য নাও আসতে পারে।
নমুনা সংগ্রহেও হতে পারে ত্রুটি
সিবিসি সাধারণত ইডিটিএ (ইথিলিনডায়ামিনটেট্রাঅ্যাসেটিক অ্যাসিড) যুক্ত টিউবে রক্ত সংগ্রহ করে করা হয়। রক্ত নেওয়ার পর টিউবটি যথাযথভাবে মিশ্রিত না হলে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। বিশেষ করে প্লেটিলেট জমাট বাঁধলে স্বয়ংক্রিয় অ্যানালাইজার প্লেটিলেটের প্রকৃত সংখ্যা সঠিকভাবে গণনা করতে পারে না। ফলে প্লেটিলেটের সংখ্যা ভুলভাবে কম দেখাতে পারে। এ অবস্থাকে সিউডোথ্রম্বোসাইটোপেনিয়া বলা হয়।
আবার টিউবটি খুব জোরে ঝাঁকালে হিমোলাইসিসের ঝুঁকি থাকে। এছাড়া কঠিনভাবে রক্ত সংগ্রহ করা, সিরিঞ্জ থেকে জোর করে রক্ত টিউবে ঢোকানো, প্রয়োজনের তুলনায় কম রক্ত নেওয়া, দীর্ঘ সময় টর্নিকেট লাগিয়ে রাখা, আইভি ফ্লুইড চলমান হাত বা তার কাছাকাছি স্থান থেকে নমুনা নেওয়া এবং নমুনা সংগ্রহের পর দ্রুত ল্যাবরেটরিতে না পাঠানো- এসব কারণেও পরীক্ষার ফলাফল প্রভাবিত হতে পারে।
অর্থাৎ অ্যানালাইজার যত আধুনিকই হোক, নমুনা ত্রুটিপূর্ণ হলে রিপোর্টও নির্ভরযোগ্য নাও হতে পারে।
সময়ের সঙ্গেও বদলায় নমুনার বৈশিষ্ট্য
ইডিটিএ টিউবে রক্ত সংগ্রহ করার পর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রক্তকণিকার বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হতে থাকে। তাই সিবিসির ক্ষেত্রে শুধু নমুনা সংগ্রহের তারিখ জানাই যথেষ্ট নয়; রক্ত কখন সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কখন অ্যানালাইজারে পরীক্ষা করা হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘ সময় পড়ে থাকা নমুনায় বিশেষ করে কোষের গঠনগত বৈশিষ্ট্য বা মর্ফলজিতে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। পুরোনো নমুনা থেকে ভালো মানের পেরিফেরাল ব্লাড ফিল্ম তৈরি করাও কঠিন হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এক জায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে দীর্ঘ সময় পর অন্য জায়গায় নিয়ে পরীক্ষা করা হলে নমুনা সংগ্রহ থেকে পরীক্ষা পর্যন্ত পুরো সময়ের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ডেঙ্গুতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্লেটিলেট
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে সিবিসি পরীক্ষার সবচেয়ে আলোচিত বিষয় প্লেটিলেট কাউন্ট। ধরা যাক, অ্যানালাইজারে কোনো রোগীর প্লেটিলেট ৮ হাজার/মাইক্রোলিটার এসেছে। এই একটি সংখ্যা দেখেই রোগী ও স্বজন আতঙ্কিত হয়ে পড়তে পারেন। চিকিৎসকের ওপরও প্লেটিলেট পরিসঞ্চালনের জন্য চাপ তৈরি হতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- ৮ হাজার সংখ্যাটি কি সত্যিই রোগীর প্রকৃত প্লেটিলেট কাউন্ট, নাকি নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ বা পরীক্ষার পদ্ধতিগত কোনো ত্রুটির কারণে এমন ফল এসেছে?
ইডিটিএর উপস্থিতিতে কিছু মানুষের প্লেটিলেট পরস্পরের সঙ্গে জমাট বেঁধে প্লেটিলেট ক্লাম্প তৈরি করতে পারে। স্বয়ংক্রিয় অ্যানালাইজার এসব ক্লাম্পকে সঠিকভাবে প্লেটিলেট হিসেবে গণনা করতে না পারায় প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় অনেক কম প্লেটিলেট দেখাতে পারে। এই অবস্থাই সিউডোথ্রম্বোসাইটোপেনিয়া।
তাই অপ্রত্যাশিত প্লেটিলেট কাউন্ট পাওয়া গেলে শুধু সংখ্যাটির ওপর নির্ভর না করে পরীক্ষার ফলাফল যাচাই করা প্রয়োজন।
অস্বাভাবিক ফল যাচাই জরুরি
আধুনিক হেমাটোলজি অ্যানালাইজার শুধু রক্তকণিকার সংখ্যা দেয় না। নমুনায় অস্বাভাবিকতা বা অস্বাভাবিক সেল পপুলেশন পাওয়া গেলে বিভিন্ন ধরনের ফ্ল্যাগ, হিস্টোগ্রাম ও স্ক্যাটারগ্রামের মাধ্যমে সতর্ক সংকেতও দিতে পারে।
এ ধরনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে পেরিফেরাল ব্লাড স্মিয়ার পরীক্ষা করা যেতে পারে। এতে কাঁচের স্লাইডে রক্তের পাতলা স্তর তৈরি করে মাইক্রোস্কোপের নিচে লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা ও প্লেটিলেটের আকার, আকৃতি এবং সংখ্যা পরীক্ষা করা হয়।
সন্দেহ থাকলে নতুন নমুনা সংগ্রহ করে পুনরায় পরীক্ষা করা অথবা প্রয়োজনে বিকল্প অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট ব্যবহার করেও পরীক্ষা করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যানালাইজারের অস্বাভাবিক ফ্ল্যাগ, আগের সিবিসি রিপোর্টের সঙ্গে বড় ধরনের অমিল, ক্লিনিক্যালি অসম্ভব বা অবাস্তব ফলাফল কিংবা প্লেটিলেটের অস্বাভাবিক ফলাফল যথাযথভাবে যাচাই না করে সরাসরি রিপোর্ট প্রকাশ করা মানসম্মত ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
শুধু রিপোর্টে স্বাক্ষর করাই ভ্যালিডেশন নয়। একজন বিশেষজ্ঞ বা ল্যাবরেটরি তত্ত্বাবধায়কের স্বাক্ষর কেবল প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা হওয়া উচিত নয়।
এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গুর মতো রোগে যেখানে একটি পরীক্ষার ফলাফল চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে, সেখানে সিবিসি রিপোর্টের নির্ভুলতা শুধু একটি ল্যাবরেটরি বিষয় নয়- এটি সরাসরি রোগীর নিরাপত্তার বিষয়। তবে চিকিৎসককে রোগীর লক্ষণের ওপরও গুরুত্বারোপ করতে হবে।
