পাসপোর্ট একটি ‘ভ্রমণ নথি’, নাগরিকত্বের সনদ নয় : ভারত
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ০৩:১১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
পাসপোর্টকে নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়েছে, পাসপোর্ট মূলত একটি ভ্রমণ নথি, নাগরিকত্বের সনদ নয়।
সম্প্রতি ভারতের পাসপোর্ট ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক চলাচল এবং বিদেশে কর্মসংস্থানসংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে এ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পাসপোর্ট সেবা সহজ করা, নিরাপত্তা জোরদার করা এবং আরো বেশি মানুষের কাছে এ সেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়।
কর্মকর্তারা জানান, পাসপোর্টের প্রধান উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সহজ করা এবং বিদেশে একজন ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করা। আধার কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন নথি নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যায় কি না, তা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতেই সরকারের এই অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে।
আরো পড়ুন : ভেনিজুয়েলার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেন মোদী
ভারত সরকার জানিয়েছে, গত কয়েক বছরে পাসপোর্ট সেবায় উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে মাত্র পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যেই আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে। পাসপোর্ট সেবাকেন্দ্রগুলোতে আবেদনকারীদের গড়ে ৪৫ মিনিটেরও কম সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়া সহজ করার ফলে এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।
ব্রিফিংয়ে ই-পাসপোর্ট চালুর বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সরকার জানায়, গত বছরের মে মাস থেকে নতুন ইস্যু করা সব পাসপোর্টে বিশেষ ইলেকট্রনিক চিপ সংযোজন করা হচ্ছে। এতে আবেদনকারীর বায়োমেট্রিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকে।
কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার মান অনুযায়ী তৈরি এই প্রযুক্তি পাসপোর্ট জালিয়াতি কমাবে, নিরাপত্তা বাড়াবে এবং বিমানবন্দর ও সীমান্তে যাচাই প্রক্রিয়া আরো সহজ করবে।
ভারতের পাসপোর্ট সেবা নেটওয়ার্কও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে দেশজুড়ে ৫৪৫টি পাসপোর্ট সেবাকেন্দ্র চালু রয়েছে, যা এক দশক আগের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি। চলতি বছর আরো ২০টি নতুন কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, ২০২৭ সালের মধ্যে প্রতিটি লোকসভা আসনে অন্তত একটি পাসপোর্ট সেবাকেন্দ্র স্থাপন করা।
কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে মাত্র প্রায় ৩০টি জেলায় স্থায়ী কেন্দ্র নেই। এসব এলাকায় ভ্রাম্যমাণ পাসপোর্ট দল পাঠিয়ে সেবা দেওয়া হচ্ছে। গত বছর বিশেষ ক্যাম্পের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রায় তিন লাখ মানুষকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে।
এত উন্নয়ন সত্ত্বেও ভারতে এখনো পাসপোর্টধারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মাত্র ১০ শতাংশ মানুষের কাছে পাসপোর্ট রয়েছে। শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের গুরুত্ব বাড়ায় আরো বেশি মানুষের হাতে পাসপোর্ট পৌঁছে দেওয়াকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভারত বর্তমানে ২৫টি দেশের সঙ্গে ২৭টি চলাচল চুক্তি করেছে। এসব দেশের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ রয়েছে। এসব চুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থী, গবেষক, পেশাজীবী ও ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীদের আন্তর্জাতিক চলাচল সহজ করা হচ্ছে।
বর্তমানে ২৭টি দেশ ভারতীয় নাগরিকদের ভিসামুক্ত প্রবেশের সুযোগ দেয়। এছাড়া ৪৭টি দেশে পৌঁছানোর পর ভিসা এবং ৬৬টি দেশে ই-ভিসা সুবিধা পাওয়া যায়। বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উন্নত সংস্করণের ই-মাইগ্রেট ২.০ প্ল্যাটফর্ম চালুর ফলে অভিবাসন ছাড়পত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে। ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় সাত লাখ ভারতীয় কর্মী এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পেয়েছেন।
এ ছাড়া ১৭টি পাসপোর্ট অফিসে স্বয়ংক্রিয় ও দৈবচয়নভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যা স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও আবেদন নিষ্পত্তির সময় কমাতে সহায়তা করছে।
সরকার কর্মীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণেও গুরুত্ব দিচ্ছে। বিদেশে যাওয়ার আগে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গন্তব্য দেশের সংস্কৃতি, আইন এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশ ও সিঙ্গাপুরে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য আইনি সহায়তা এবং মানসিক পরামর্শ সেবাও চালু করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো পাসপোর্টকে সীমিতসংখ্যক মানুষের নথি না রেখে সাধারণ মানুষের জন্য আরো সহজলভ্য করে তোলা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পাসপোর্ট ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক, নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য করে গড়ে তোলার কাজ অব্যাহত থাকবে।
