ভেনেজুয়েলার তেলে মার্কিন আধিপত্য, নজিরবিহীন চুক্তির ঘোষণা ট্রাম্পের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলভাণ্ডারের একটি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার নজিরবিহীন উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে কাজে লাগিয়ে দেশটির ক্ষতিগ্রস্ত তেলশিল্প পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম কমাতে নতুন উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা বলেছেন তিনি।
তবে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়ে হওয়া চুক্তির বিস্তারিত কিছু জানাননি ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেলভাণ্ডারের ৬ হাজার ৫০০ কোটির (৬৫ বিলিয়ন) বেশি ব্যারেলের বেশিরভাগের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। দেশটির নেতাদের মতে, এর ফলে অর্থনীতি সম্প্রসারিত হবে এবং সরকারের রাজস্ব বাড়বে।
ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য হলো ভেনেজুয়েলায় তেল উৎপাদন পুনরায় বাড়ানো এবং মার্কিন পরিশোধনাগারগুলোর জন্য আরও বেশি অপরিশোধিত তেল নিশ্চিত করা। নতুন চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাবে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেলভাণ্ডার রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। তবে দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, অব্যবস্থাপনা ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটি তার সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম তেল উৎপাদন করছে। বর্তমানে দেশটির দৈনিক উৎপাদন প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল।
আরও পড়ুন: ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নিয়ে বাংলাদেশের বক্তব্যে যা বলছে ভারত
ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, তার নির্দেশনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী পিট হেগসেথ ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারত্বে এই চুক্তি করেছেন। এতে মার্কিন করদাতাদের কোনো অর্থ ব্যয় হবে না বলেও দাবি করেন তিনি।
দীর্ঘমেয়াদি প্রবেশাধিকার পাবে মার্কিন কোম্পানি
চুক্তির আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা ও দরকষাকষি চলছিল। এর ফলে মার্কিন কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার একাধিক তেলক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রবেশাধিকার পেতে পারে। এসব ক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত তেলের একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারা আগামী সপ্তাহে কয়েকটি কোম্পানিকে—বিশেষ করে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোকে—নতুন করে তেল অনুসন্ধান ও উত্তোলনের অধিকার দেওয়ার বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
দেশটির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এ ক্ষেত্রে ইজারা মডেল বিবেচনা করা হচ্ছে। এই মডেলে সম্ভাব্য মার্কিন তেল উৎপাদকদের কাছে বিভিন্ন তেলক্ষেত্র নিলামে তোলা হতে পারে। তবে এ উদ্যোগ ভেনেজুয়েলায় আইনি ও সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। দেশটির সংবিধানে তেলশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বিধান রয়েছে।
কোন তেলক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ
চুক্তির কাঠামো, কোন কোন তেলক্ষেত্র বা কোম্পানি এতে যুক্ত এবং কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে—এসব বিষয়ে ট্রাম্প বিস্তারিত কিছু জানাননি।
আরও পড়ুন: বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ রাজার মৃত্যু
তবে রয়টার্সের দেখা একটি তালিকায় ভেনেজুয়েলার অরিনোকো বেল্ট ও মারাকাইবো হ্রদ অঞ্চলের কয়েকটি তেলক্ষেত্রের উল্লেখ রয়েছে।
মার্কো রুবিও এক্সে দেওয়া পোস্টে চুক্তিটিকে দুই দেশের জন্যই ‘জয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র স্থিতিশীল ও কম খরচে তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে এবং দেশটিতে পেট্রোলের দাম কমাতে সহায়তা করবে।
রুবিও আরও বলেছেন, এই চুক্তির ফলে ভেনেজুয়েলায় প্রায় ১০ হাজার কোটি (১০০ বিলিয়ন) ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ আসতে পারে। এর মাধ্যমে হাজার হাজার উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশটির অর্থনীতি পুনর্গঠনে সহায়তা হবে।
রদ্রিগেজের দাবি, বাড়বে রাজস্ব
গত জানুয়ারিতে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করার পর ডেলসি রদ্রিগেজ ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানের দায়িত্ব নেন।
শুক্রবার রদ্রিগেজ বলেন, চুক্তির আওতায় ১৭টি কৌশলগত ক্ষেত্রের উন্নয়ন করা হলে তেল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে দেশটির জন্য মোট ২০ হাজার ৯০০ কোটি (২০৯ বিলিয়ন) ডলার কর রাজস্ব আসতে পারে বলেও দাবি করেন তিনি।
এক বিবৃতিতে রদ্রিগেজ বলেন, এই বিনিয়োগ শুধু ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প পুনরুদ্ধার ও আধুনিকায়নেই ভূমিকা রাখবে না; বরং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পুরো অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায়ও সহায়তা করবে।
