ছাত্র আন্দোলনে আরও এক দেশের প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৩ এএম
ছবি : সংগৃহীত
ছাত্রদের নেতৃত্বে দীর্ঘদিনের আন্দোলন, দুর্নীতির অভিযোগ এবং সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান জনঅসন্তোষের মধ্যে পদত্যাগ করেছেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দার ভুচিচ। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। তবে পদত্যাগের পরও রাজনীতির বাইরে যাচ্ছেন না ভুচিচ। আসন্ন আগাম সংসদ নির্বাচনে নিজের দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির (এসএনএস) হয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
রাজধানী বেলগ্রেডে প্রেসিডেন্ট ভবনের সামনে সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে ভুচিচ বলেন, তার প্রায় নয় বছরের প্রেসিডেন্ট শাসনে দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় ছিল। এর আগে জুন মাসেই তিনি পদত্যাগের ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হওয়ার সাংবিধানিক সুযোগ না থাকায় তিনি এবার সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন।
ভুচিচের পদত্যাগের পর সংসদের স্পিকার আনা ব্রনাবিচ অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের মেয়াদ নির্ধারিত সময়ের আগে শেষ হলে সর্বোচ্চ তিন মাসের জন্য সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এ সময়ের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।
রেলস্টেশনের ছাদ ধস থেকেই আন্দোলনের শুরু
রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা ভুচিচ সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। তবে ২০২৪ সালের নভেম্বরে নভি সাদ রেলস্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পায়। ওই দুর্ঘটনার পর সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়।
আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, শ্রমিক, কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। সময়ের সঙ্গে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। দেশটির টেনিস তারকা নোভাক জকোভিচও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নভি সাদের রেলস্টেশনের দুর্ঘটনা ছিল ভুচিচের দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির দীর্ঘদিনের শাসনের ব্যর্থতার প্রতিফলন। স্টেশনটির সংস্কারকাজকে ভুচিচ সরকার সার্বিয়ার অগ্রগতির অন্যতম প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছিল।
দুর্ঘটনার পর সরকারের কয়েকজন কর্মকর্তা পদত্যাগ করলেও আন্দোলন থামেনি। গ্রীষ্মজুড়েও বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও আটকের অভিযোগও ওঠে।
আগাম সংসদ নির্বাচন ২৫ অক্টোবর
ভুচিচের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদ আগামী বছর শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে এর আগেই পদত্যাগ করে তিনি নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ৯ সেপ্টেম্বর তিনি সংসদ ভেঙে দিয়ে ২৫ অক্টোবর আগাম সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন।
ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম দাবির মধ্যে আগাম নির্বাচনও ছিল। দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর সেই দাবির প্রেক্ষাপটেই আগাম নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ভুচিচ আগেই জানিয়েছিলেন, তিনি সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির নির্বাচনী তালিকার নেতৃত্ব দেবেন এবং প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হবেন। ফলে প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়লেও দেশটির রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে থাকার চেষ্টা করছেন তিনি।
নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংসদের স্পিকার আনা ব্রনাবিচ রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ডিসেম্বরের মধ্যে আয়োজন করতে হবে বলে ভুচিচ জানিয়েছেন।
পদত্যাগের আগে ৪৯ জনকে ক্ষমা
পদত্যাগের কিছুক্ষণ আগে সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ৪৯ জনকে ক্ষমা করেছেন ভুচিচ। তাদের মধ্যে ২৩ জনের সঙ্গে গত দেড় বছরের আন্দোলন ও সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহের সম্পর্ক রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। ক্ষমাপ্রাপ্তদের মধ্যে শিক্ষার্থী ও তার দলের কয়েকজন সমর্থকও রয়েছেন।
ভুচিচ ওই সময়ের ঘটনাগুলোকে ‘ভয়াবহ ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে তার পদত্যাগের পরও আন্দোলন ও নির্বাচনী রাজনীতিকে ঘিরে সার্বিয়ায় রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
নির্বাচনে মুখোমুখি ছাত্র আন্দোলন ও বিরোধীরা
২৫ অক্টোবরের আগাম সংসদ নির্বাচনে ভুচিচের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির পাশাপাশি ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের প্রতিনিধিরাও অংশ নিচ্ছেন। ‘স্টুডেন্টস উইন’ নামে ছাত্র-সমর্থিত একটি নির্বাচনী তালিকা ইতোমধ্যে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
এ ছাড়া পশ্চিমাপন্থী বিরোধী দলগুলোর একটি জোটও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ফলে দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনে সরকারপন্থী দল, ছাত্র-সমর্থিত শক্তি এবং বিরোধী দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
এক যুগের বেশি সময় ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রে ভুচিচ
সার্বিয়ার রাজনীতিতে এক যুগের বেশি সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন আলেক্সান্দার ভুচিচ। ২০১৪ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর ২০১৭ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ২০২২ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ও পরে মিলিয়ে ২০১৪ সাল থেকে তিনি দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রে রয়েছেন।
ভুচিচ প্রকাশ্যে সার্বিয়ার ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। একই সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন এবং চীনের বিনিয়োগের জন্যও সার্বিয়ার দরজা উন্মুক্ত রেখেছেন।
প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরে দাঁড়ালেও আগামী ২৫ অক্টোবরের নির্বাচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী পদে যাওয়ার পথ তৈরি করেছেন ভুচিচ। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সার্বিয়ার রাজনীতিতে প্রভাবশালী এই নেতার পরবর্তী রাজনৈতিক ভূমিকা এখন নির্বাচনের ফলাফল ও পরবর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।
