হুথিদের ওপর বড় হামলার পরিকল্পনা সৌদি আরবের
পাশে তুরস্ক-পাকিস্তানসহ ৩ দেশ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৮ পিএম
গত ১৮ সেপ্টেম্বর ইয়েমেনের সানায় লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে হুথি বাহিনীর অগ্রগতির উদযাপনে সমর্থকরা। ছবি: সংগৃহীত
ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সমন্বিত সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। লোহিত সাগরের কৌশলগত আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপকূলীয় এলাকা মুক্ত করা অথবা একাধিক ফ্রন্টে একসঙ্গে আক্রমণ চালানো—এমন দুটি বিকল্প খতিয়ে দেখছে রিয়াদ। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছয়জন কর্মকর্তার তথ্যমতে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই অভিযান শুরু হতে পারে। সৌদি আরবের তত্ত্বাবধানে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী পদাতিক যুদ্ধের নেতৃত্ব দেবে এবং সৌদি বিমানবাহিনী তাদের সরাসরি বিমান হামলা চালিয়ে সহায়তা করবে। ওয়াশিংটন রিয়াদকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করলেও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কোনো মিত্র দেশ সরাসরি এই যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে না।
২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে রক্ষায় আরব জোটের প্রধান হিসেবে ইয়েমেন সংঘাতে জড়িয়েছিল সৌদি আরব। ২০২২ সালের অস্ত্রবিরতি চুক্তির পর কিছুদিন পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও সাম্প্রতিক ইরান সংকটের জের ধরে হুথিরা সৌদির তেল ও পণ্যবাহী অবকাঠামো লক্ষ্য করে নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করলে উত্তেজনা চরমে ওঠে।
পরিকল্পিত এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হলো গত মাসে হুথিদের আকস্মিক অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাব এল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা। রিয়াদের সামনে থাকা দুটি কৌশলের মধ্যে প্রথমটি হলো কেবল বাব এল-মান্দেব ও সংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ আক্রমণ; আর দ্বিতীয়টি হলো আল-বায়দা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফ গভর্নরেটে যুগপৎ বহুমুখী হামলা চালানো। এই অভিযানে এক লাখেরও বেশি ইয়েমেনি সেনাকে মাঠে নামানো হতে পারে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন: পাকিস্তান ৪ কার্গো বিমানবোঝাই অস্ত্র পাঠাল ইয়েমেনে
ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার মধ্যকার বাণিজ্য রুট হিসেবে বাব এল-মান্দেবের গুরুত্ব অপরিসীম। চলতি বছর ইরান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই নৌপথের নিরাপত্তা এখন আরও বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। পশ্চিমা কূটনীতিকদের মতে, হুথিরা এই কৌশলগত প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলে কোনো ধরনের শান্তি আলোচনায় না বসার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে রিয়াদ।
সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি মনে করেন, এবারের অভিযান ২০১৫ সালের সর্বাত্মক হামলার মতো হবে না, বরং এর পরিসর হবে সীমিত। তবে লেবাননে হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়ার পর হুথিরাই এখন ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্রে পরিণত হয়েছে। ফলে এই সামরিক পদক্ষেপ ২০২৩ সালের ৭ ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে আরও বিপজ্জনক এক ধাপে নিয়ে যেতে পারে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি বিমান হামলা চালাতে অস্বীকৃতি জানালেও যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য এবং সামরিক উপদেষ্টা দিয়ে রিয়াদকে সহায়তা করছে। অন্যদিকে গত মাসে স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশ হিসেবে তুরস্ক ও পাকিস্তান রিয়াদকে সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে সাহায্য করছে। পাকিস্তান ইতিমধ্যে চারটি কার্গো বিমানে করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হালকা কামান ও ড্রোন ইয়েমেনের এডেনে পাঠিয়েছে এবং ইয়েমেনি বাহিনীকে সহায়তায় পাকিস্তানি সামরিক উপদেষ্টারাও কাজ করছেন। তবে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সরাসরি কোনো যুদ্ধক্ষম সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত ইসলামাবাদ নেয়নি। পাশাপাশি, সৌদি বন্দরনগরী ইয়ানবুর সুরক্ষায় সেনা ও প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স।
তবে স্থলভাগে ইয়েমেনি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অনৈক্য রিয়াদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। সৌদি ও আমিরাত-সমর্থিত বিভিন্ন উপদলের ওপর ভিত্তি করে এই পদাতিক অভিযান চালাতে হবে। সামরিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলবাশার মনে করেন, হুথিদের মতো সুসংগঠিত বাহিনীকে পিছু হটানোর মতো প্রয়োজনীয় সামরিক সংহতি সরকারপন্থীদের মধ্যে এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। সৌদি বিশ্লেষক আলী শিহাবি সতর্ক করে বলেছেন, এতদিন প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকাটা মূল অগ্রাধিকার হলেও এখন পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ শুরু হতে যাচ্ছে এবং এই অভিযানের পুরো সাফল্য নির্ভর করবে স্থানীয় পদাতিক বাহিনীর দক্ষতার ওপর।
