×

খুলনা

বেনাপোল কাস্টমসে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা

Icon

শেখ কাজিম উদ্দিন, বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৬ পিএম

বেনাপোল কাস্টমসে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা

ছবি : সংগৃহীত

দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল কাস্টমস হাউসে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে। সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। কিন্তু অর্থবছর শেষে আদায় হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায় কমেছে প্রায় ৪৭০ কোটি টাকা।

রাজস্ব আদায়ের এই বড় ঘাটতির পেছনে আমদানি কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতি ও শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে এলেও সাম্প্রতিক সময়ে ওজনস্কেলে কারসাজির অভিযোগ, ঘোষণা বহির্ভূত উচ্চ শুল্কের পণ্য উদ্ধার, শেড থেকে কোটি টাকার পণ্য আত্মসাৎ, ভুয়া এন্ট্রি পাস ব্যবহার, সিসিটিভিতে ধরা পড়া পণ্য সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা এবং সংঘবদ্ধ শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ব্যবসায়ী ও রাজস্ব-সংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি, এসব অনিয়ম কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারত।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ ২ হাজার ১৪৪ মেট্রিক টন পণ্য। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০৯ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি কমেছে প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার মেট্রিক টন। একই সঙ্গে এনবিআরের তথ্য বলছে, ফল, শাড়ি, থ্রি-পিসসহ উচ্চ শুল্কের আওতাভুক্ত বিভিন্ন পণ্যের আমদানিও কমেছে।

তবে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও একাধিক সূত্রের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র মিথ্যা ঘোষণা, ওজন পরিবর্তন, ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আমদানি এবং সাফটা সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ তৈরি করছে।

বেনাপোল স্থলবন্দরের তথ্য অনুযায়ী, সাফটা সুবিধার আওতায় আমদানিকৃত পণ্যের শুল্কহার গত তিন অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে শুল্কহার ছিল ৭ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ১১ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। শুল্কহার বাড়ার পর থেকেই উচ্চ শুল্কের পণ্য কম শুল্কে খালাসের প্রবণতা বেড়েছে বলে অভিযোগ করছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে কম শুল্কের পণ্যের ঘোষণার আড়ালে উচ্চ শুল্কের পণ্য এনে রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়।

সম্প্রতি বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার অটল গোস্বামী স্বাক্ষরিত একটি দাপ্তরিক চিঠি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ১৪ জুন বন্দরের ৫ নম্বর ডিজিটাল ওজনযন্ত্রে একই ভারতীয় খালি ট্রাকের (এইচআর-৩৮-একে-৪০১৮) জন্য একই সময়ে দুই ধরনের ওজন রেকর্ড করা হয়। একটি পণ্যতালিকায় ট্রাকটির খালি ওজন দেখানো হয় ৪ হাজার ৮৮০ কেজি, অন্যটিতে ৪ হাজার ৯২০ কেজি।

একই ট্রাকের ক্ষেত্রে একই সময়ে দুই ধরনের ওজন কীভাবে দেখানো হলো-সে বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে তিন কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা চেয়েছে কাস্টমস। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, চালানটি ছিল সাইকেলের যন্ত্রাংশের। পরে কাস্টমস চালানটি আটক করে তদন্ত শুরু করে।

গত ১২ মার্চ ৩৭ নম্বর শেডে বেকিং পাউডারের ঘোষণার আড়ালে আনা প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের ভারতীয় শাড়ি ও থ্রি-পিস আত্মসাতের ঘটনা উদ্ঘাটিত হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ১০ জুন কাস্টমস ওই ঘটনায় ১৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে।

এর মাত্র পাঁচ দিন পর ২৬ নম্বর শেডে ইরেজার ও পেনসিল ঘোষণার আড়ালে আনা প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের উচ্চ শুল্কের পণ্য জব্দ করা হয়।

২৫ এপ্রিল রোকেয়া ট্রেডার্সের আমদানি করা আঙুরবোঝাই একটি ট্রাকের ক্ষেত্রেও ওজনের গরমিল ধরা পড়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, ট্রাকটির প্রকৃত খালি ওজনের সঙ্গে ওজনস্লিপের তথ্যের পার্থক্য ছিল। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হলেও সংশ্লিষ্টরা যন্ত্রের কারিগরি ত্রুটির কথা বলেন।

গত ২১ জুন বিজিবির অভিযানে প্রায় আড়াই কোটি টাকা মূল্যের ভারতীয় শাড়ি ও কসমেটিক্সবোঝাই একটি ট্রাক জব্দের ঘটনায় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী আটক হন। পরবর্তীতে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম চৌধুরী, কাস্টমস সিপাহী মোহাম্মদ সাগরসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

সবশেষে ২৫ জুন কেমিক্যাল জোনে ভারতীয় একটি ট্রাক থেকে বাংলাদেশি ট্রাকে ৪০টি প্যাকেট স্থানান্তরের দৃশ্য সিসিটিভিতে ধরা পড়ে। পরে কাস্টমসের ইনভেন্টরিতে ২ হাজার ৭৮৪ কেজি পণ্যের গরমিল পাওয়া যায়।

এ ঘটনায় বন্দর কর্তৃপক্ষ আনসার সদস্য, বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী, ট্রাকচালক-হেলপার এবং দায়িত্বরত কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ভুয়া এন্ট্রি পাস ব্যবহার করে নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের মাধ্যমে বন্দরের ভেতর থেকেই পণ্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত শুল্ক ফাঁকি, পণ্য আত্মসাৎ ও নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে চারটি পৃথক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামাসহ ৫৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। একই সময়ে ৯টি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী, আরিফুল ইসলাম চৌধুরী, কাস্টমস সিপাহী মোহাম্মদ সাগরসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে আলোচিত ঘটনাগুলোর বেশির ভাগ মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।

বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সভাপতি মতিয়ার রহমান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, শেডের ভেতরে পণ্য আত্মসাৎ বা শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ঘটলে দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টদের ভূমিকাও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত না করলে একই ধরনের অনিয়ম বন্ধ হবে না।

সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বন্দর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান হবি বলেন, একটি ডিজিটাল ওজনযন্ত্রে সামান্য কারসাজিও সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই পুরো ওজন ব্যবস্থা প্রযুক্তিনির্ভর সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় আনা জরুরি।

বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামীম হোসেন বলেন, ওজনযন্ত্রে কারচুপি বা অন্য কোনো অনিয়মের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কাস্টমসের চিঠি পাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মোঃ ফাইজুর রহমান বলেন, সরকারের এক টাকার রাজস্বও যাতে ফাঁকি না যায়, সে বিষয়ে কাস্টমস সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। ওজনস্কেলে কারচুপি, মিথ্যা ঘোষণা কিংবা শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে একাধিক ঘটনায় মামলা হয়েছে, তদন্ত চলছে। তদন্তে কাস্টমস কর্মকর্তা, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, আমদানিকারক বা অন্য কোনো ব্যক্তি জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি ফৌজদারি ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বেনাপোল দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর এবং জাতীয় রাজস্ব আহরণের অন্যতম প্রধান উৎস। এই বন্দরে ধারাবাহিকভাবে ওজন নিয়ে অসঙ্গতির অভিযোগ, উচ্চ শুল্কের পণ্য উদ্ধার, পণ্য আত্মসাৎ, শুল্ক ফাঁকি, মামলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ঘটনা সামনে আসায় রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে রাজস্ব সুরক্ষার পাশাপাশি বন্দরের প্রতি ব্যবসায়ীদের আস্থাও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে বহনকারী ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি, জরুরি অবতরণ

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে বহনকারী ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি, জরুরি অবতরণ

খুন-গুম করে কেউ ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না

প্রতিমন্ত্রী টুকু খুন-গুম করে কেউ ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না

‘গণমাধ্যমের আয়না নিখুঁত না হলে রাষ্ট্র ও সমাজে ভুল প্রতিবিম্ব তৈরি হয়’

‘গণমাধ্যমের আয়না নিখুঁত না হলে রাষ্ট্র ও সমাজে ভুল প্রতিবিম্ব তৈরি হয়’

ঝিকরগাছায় ১৬ দলীয় ফুটবল টুর্নামেন্ট উদ্বোধন

ঝিকরগাছায় ১৬ দলীয় ফুটবল টুর্নামেন্ট উদ্বোধন

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App