জি-কে সেচ পাম্প পুনর্বাসনে বিলম্ব
চলতি বছরও সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিতের শঙ্কায় ১৩ উপজেলার কৃষক
কাগজ প্রতিবেদক, কুষ্টিয়া
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২১ পিএম
ফাইল ছবি
দেশের অন্যতম বৃহৎ গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জি-কে) সেচ প্রকল্পের বেহাল দশা কাটিয়ে পুনরুজ্জীবিত করতে ‘জিকে সেচ প্রকল্পের জরুরী মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ’ শীর্ষক ১৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেয়েছে অনেক আগেই। এ প্রকল্পের আওতায় দুটি প্রধান পাম্প পুনর্বাসনের জন্য অনুমোদিত প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১৬ কোটি টাকা।
তবে একনেকে অনুমোদনের পর দীর্ঘ আট মাসেও টেন্ডার না হওয়ায় সরকারের এই কল্যাণমুখী উদ্যোগ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নে বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জি-কে সেচ প্রকল্পের প্রধান তিনটি পাম্পের মধ্যে দুটি অকার্যকর হওয়ায় একটি পাম্প দিয়েই গত কয়েক বছর ধীরে তালে চলছে পানি সরবরাহ।
প্রয়োজনীয় পানি না পাওয়ায় প্রকল্পের আওতায় কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার ১৩টি উপজেলার হাজার হাজার কৃষক সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ্য হচ্ছেন। ১৯৫১ সালে প্রাথমিক জরিপের পর ১৯৫৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার প্রকল্পটি অনুমোদন করে। ১৯৫৪-৫৫ অর্থবছরে কাজ শুরু হয় এবং ১৯৯৩ সালে ব্যাপক সংস্কার শেষে সমাপ্ত হয়। এর পর থেকে কৃষিখাতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে।
আরও পড়ুন: দাবি না মানলে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার পতন: ডা. শফিকুর রহমান
তবে ফারাক্কার প্রভাবে পদ্মার পানির স্তর নেমে গেলে সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় পদ্মার তীরে অবস্থিত পাম্প হাউসের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানি উত্তোলন করে প্রধান ও সংযোগ খালের মাধ্যমে চার জেলার কৃষি জমিতে সরবরাহ করা হয়। প্রকল্প এলাকা ১ লাখ ৯৭ হাজার হেক্টর, সেচযোগ্য এলাকা প্রায় ৯৫ হাজার ৫০ হেক্টর। পলি জমে এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজার হেক্টরে। খাতা- কলমে বর্তমানে মাত্র ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে পানি সরবরাহ হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়ার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. জাহেদুল ইসলাম জানান, গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর একনেকে ১৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন হয়। দুটি প্রধান পাম্প পুনর্বাসনের জন্য আন্তজার্তিক দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে বর্তমানে পরামর্শক নিয়োগের কার্যক্রম চলমান। পুরো প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে আরও ২-৩ মাস সময় লাগবে। এরপর আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন, ঠিকাদার নির্বাচন ও কার্যাদেশ দিতে ৫-৬ মাস প্রয়োজন। ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে নতুন পাম্প চালু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, প্রকল্পের আওতায় প্রধান দুটি পাম্প পুনর্বাসনে ৪১৬ কোটি, সাবসিডিয়ারি পাম্প হাউজ নির্মাণে ১০৯ কোটি, পাম্প মটরসেট সরবরাহ ও স্থাপনে ২৫৫ কোটি ৬৯ লাখ, সংযোগ খাল পুনঃখনন ও লাইনিংয়ে ৩০ কোটি ৩৭ লাখ, সংযোগ সড়ক নির্মাণে ১৫ কোটি ৬০ লাখ, বৈদ্যুতিক পুনর্বাসনে ৩৬ কোটি ৭০ লাখ, অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থায় প্রায় ২ কোটি, সেচখাল সংশ্লিষ্ট পূর্ত কাজে ২৭৭ কোটি ৩৯ লাখ, অবকাঠামো মেরামতে ১৩৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। মোট প্রস্তাবিত ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
ইতিমধ্যে কিছু কাজের টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে জি-কে সেচ প্রকল্প যৌবন ফিরে পাবে এবং চাষিরা উপকৃত হবেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, ভেড়ামারা পাম্প হাউসের ২ নম্বর পাম্প ২০২১ সালের ২১ মে থেকে সম্পূর্ণ অকেজো। প্রায় চার মাস ধরে ৩ নম্বর পাম্পও অকার্যকর। নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান জানান, একটি পাম্পের ওপর নির্ভর করে প্রতিদিন মাত্র ১৩০০ কিউসেক পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। প্রকল্প শেষ হলে পানি উত্তোলন ক্ষমতা বাড়বে।
কৃষকরা জানান, পাম্প বিকল থাকায় সময়মতো ফসল রোপণ করতে পারছেন না। বিকল্প ব্যবস্থায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অতিদ্রুত মেরামত করে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে স্বল্প খরচে ফসল উৎপাদন করে লাভবান হতে পারবেন।
কুষ্টিয়া-০২ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল গফুর বলেন, প্রধান পাম্পগুলো দীর্ঘ সময় অকার্যকর থাকলে একাধিক মৌসুমের কৃষি উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়ে। বিশেষ করে বোরো ও আমন মৌসুমে পর্যাপ্ত সেচ নিশ্চিত না হলে কৃষকদের খরচ বেড়ে যায়। তিনি জাতীয় সংসদে বিষয়টি তুলে ধরে দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন বলে জানান। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে বাজেট ছাড় দিলে দৃশ্যমান কাজ শুরু করা সম্ভব।
পরিবেশ বিজ্ঞানী অ্যাডভোকেট গৌতম কুমার রায় বলেন, শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা দিয়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অক্ষুণ্ন রাখা, লবণাক্ততা দূর এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার মহৎ উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি চালু হয়েছিল। পানির স্বল্পতায় এখন কৃষকের ব্যয় বাড়ছে, উৎপাদন কমছে এবং খাদ্য নিরাপত্তায় ঝুঁকি বাড়ছে। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে পূর্ণ সক্ষমতা ফিরে আসবে। তাই দরপত্র প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে কাজ শুরুর পাশাপাশি অন্তবর্তিকালীন সময়ে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
